13/04/2026
লোকটা সবে মাত্র প্লেন থেকে নেমেছে। বারো বছর পর!
বারো বছর পর বিদেশে থাকার পর অবশেষে দেশে ফিরেছে। ইমিগ্রেশন শেষ করে যখন বের হলো, তখনই শুরু হলো তার জীবনের করুণ অধ্যায় - যা কেউ কল্পনাও করেনি।
তার জন্য পরিবার থেকে কেউ আসেনি। কেউ তাকে রিসিভ করেনি।
হাতে ছিল বত্রিশ কেজির মালামাল - শুধু নিজের পরিবারের জন্য না, আশেপাশের অনেক মানুষের জন্যও। বিদেশের কষ্টার্জিত সেই উপহারগুলো নিয়ে সে দাঁড়িয়ে ছিল নিজের দেশের মাটিতে।
সিলেট থেকে কিছু মানুষ এসেছিল তাকে দেখতে, তার সাথে দেখা করতে না আসলে, তার মাধ্যমে পাঠানো মালামাল রিসিভ করতে ।
এরপর হঠাৎ করেই সব বদলে গেল।
ইমিগ্রেশন শেষ করার পরপরই তার বুকে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। ইমিগ্রেশন পুলিশ দ্রুত তাকে বাইরে নিয়ে আসে। বারবার অ্যানাউন্স করা হয়—
“অমুকের লোক কেউ থাকলে দ্রুত আসুন, আপনাদের রোগী অসুস্থ হয়ে গিয়েছে।”
কিন্তু কেউ এলো না।
বরং যে লোকগুলো তার মালামাল নিতে এসেছিল, তাদের সাথে একজন পুলিশ মিলে তাকে মেডিকেলে নিয়ে এলো।
রোগী তখন ঘামে ভিজে যাচ্ছিল—সারা শরীর দরদর করে ঘামছে।
হাতে হাত দিলাম—পালস নেই।
অন্য হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে আছে, নিঃশব্দ যন্ত্রণায়।
ইসিজি করালাম।
রিদমটা যেন ছড়িয়ে গেছে, Q R S দূরে দূরে সরে গেছে—একটা ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা।
সাথে সাথেই বুঝলাম, পালসলেস VT.
তৎক্ষণাৎ DC শক দিলাম। কিছুক্ষণের জন্য ইসিজি কিছুটা গুছিয়ে এলো, যেন জীবনের দিকে আবার একটুখানি ফিরে তাকালো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ধ্বংস তখনও চলছিল।
মনিটরে তখন বিশাল অ্যান্টেরিয়র MI।
রোগীর বয়স মাত্র তেত্রিশ বছর।
আঠারো বছর বয়সে দেশ ছেড়েছিল, প্রথমবার দেশে ফিরেছে।
তার সাথে শুধু একটি ব্যাগ - বত্রিশ কেজির মালামাল। একটা পাসপোর্ট। আর কিছুই না। কোনো আত্মীয় নেই, কোনো পরিচিত মুখ নেই।
ইসিজি আবার বিগড়ে বসেছে, রোগীকে আবার DC শক দেওয়া হলো। কিছুটা সময়ের জন্য মনে হলো সে ফিরে আসছে কিন্তু তারপর আবার অ্যারেস্টে।
তার পাশে কোনো ওষুধ কিনতে যাবার মানুষও ছিল না। স্টকের ওষুধ, যেটাকে পুওর ফান্ড বলি আমরা সেটা থেকে যাচ্ছে সব। আমাদের স্যারদের টাকা দিয়ে কেনা এসব ওষুধ৷ অক্সিজেন মাস্ক, এমিওডারন, নরএড, স্যালাইন, এড্রিন....সব।
লোকটার পাশে শুধু আমরা চারজন পুলিশ আর কিছু অচেনা মানুষ, যারা এসেছিল পার্সেল নিতে। আর হয়তো যমদূত।
আবার অ্যারেস্ট।
আবার সিপিআর।
৩০:২—বুক চাপ, শ্বাস।
আবার এড্রিনালিন।
আবার চাপ, আবার শ্বাস।
মিনিটে ১২০ বার বুকের উপর আমাদের হাত নামছে-উঠছে।
কখনো VT হচ্ছে, আবার DC শক।
কখনো ফিরে আসছে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে।
৫ মিনিট… ১০ মিনিট… ১৫ মিনিট… ২০ মিনিট… ২৫ মিনিট… ৩০ মিনিট…
আমরা ঘামছি, রোগীও ঘামছে।
নোরএড্রিনালিন চলছে, সিপিআর চলছে, যুদ্ধ চলছে।
রোগী যেন বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করছে—
কিন্তু প্রতিবারই আবার অ্যারেস্টে হারিয়ে যাচ্ছে।
অবশেষে… সব চেষ্টা, সব পরিশ্রম, সব প্রোটোকল—কিছুই তাকে ধরে রাখতে পারলো না।
সে চলে গেল না ফেরার দেশে।
৩৩ বছরের একজন মানুষ।
যে ১২ বছর বিদেশে খেটে সব টাকা দেশে পাঠিয়েছে,
কিন্তু তার শেষ মুহূর্তে তার পাশে চোখের পানি ফেলার মতোও কেউ ছিল না।
একটা নিঃশব্দ বিদায়।
আমার পাশের কলিগ—ফার্মাকোলজির ট্রেইনি—হয়তো তখনো পুরোটা মেনে নিতে পারছিল না। সে কিছুক্ষণ বসে রইল, একদম নীরব, যেন সব শব্দ থেমে গেছে তার ভেতরে।
কিন্তু আমাদের থেমে থাকার সময় নেই।
এক রোগী শেষ করে, আমরা আবার দৌড়ালাম আরেক রোগীর জন্য।
এটাই আমাদের জীবন। এটাই আমাদের কাজ।
এখানে ইমোশন থাকে, কিন্তু থেমে থাকা যায় না।
মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থেকেই আমাদের প্রতিনিয়ত লড়তে হয় জীবনের জন্য… প্রতিটা মুহূর্তে।
ফেসবুকে ঢুকে জানলাম মন্ত্রী বলেছেন - আমাদের আরও পরিশ্রমী হতে হবে.... হুমম!
লিখেছেন-
Dr.Rakib Adnan
FCPS Trainee (Cardiology)
CMCH