15/04/2026
১লা বৈশাখ সমাচার
আমি তখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। আমাদের একটা দোকান ছিল, যার একদিকে শাড়ি কাপড় এবং আর একদিকে মুদি মালামাল ছিল। আমার ছোট চাচা দোকান দেখাশোনা করতেন। সাথে আব্বাও মাঝেমাঝে সময় দিতো।
আমাদের গ্রামেই একজন মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন শামশের ভাই, সবাই ছামু ভাই বলে ডাকত। গাঞ্জার কলকিতে দম মারাতে ভাইয়ের জুড়ি মেলা ভার ছিল। আশেপাশের গ্রামেও এই ব্যাপারে তার নামডাক ছিল। সপ্তাহে অন্তত ২-৩ দিন ভাইয়ের বাড়িতে গঞ্জিকা সেবনের আসর বসত। উনি নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় দুই একটা গঞ্জিকা গাছের চাষও করতেন।
যাইহোক, ছামু ভাই বেশিরভাগ সময়ই ইলিশ মাছ বিক্রি করতেন। দোকানের শাড়ি লুংগি, গেঞ্জি আর মুদি মালামাল নিয়ে ভাই কখনো নগদ টাকা দিতনা। বাকিতে নিয়ে, ইলিশ মাছ দিয়ে শোধ করে দিতেন। তখন ইলিশের কেজি ছিল ৩০ থেক ৫০ টাকার মধ্যে। গ্রামে যেহেতু বিদ্যুত ছিল না, তাই ইলিশ মাছ সংরক্ষণেরও কোন উপায় ছিল না। এজন্য গ্রামের হাটে মাছের দাম মাঝেমাঝে আরো কম হতো।
যৌথ পরিবার হওয়ায় প্রায় ১৮-২০ জনের রান্না হত প্রতিবেলায়।রান্নাঘরেই খেজুর পাতার বিছানা বিছিয়ে সবাই খেত। ছামু ভাই প্রতিদিন ৩-৪ টা বড় সাইজের ইলিশ বিকালের দিকে বাসায় দিয়ে যেত। ইলিশ মাছ শহর থেকে আনতে হতো বলে দুপুরের আগে দিতে পারতো না। তাই আমাদের রাতে খাবারে নিয়মিত উপস্থিত থাকত ছামু ভাইয়ের ইলিশ মাছ। রাতে খাওয়ার পর বাকি ইলিশগুলো সকালে সবাই খেত পান্তা ভাতের সাথে। ঐ সময়ে গ্রামের সবাই পান্তা ভাতে অভ্যস্ত ছিল, এখনো অনেকে আছে।
স্কুলে যাইতাম, বন্ধুদের কাছে আলাদা প্রেস্টিজ😆😆😆নিয়ে চলা লাগত। পান্তা খেয়েছি একথা বন্ধুদের বল্লে যেন মানসম্মান কাদার সাথে গড়াগড়ি খাইত। তাই সকালে পান্তা ইলিশ আমি কখনই খেতে চাইতাম না বা খেলেও সেকথা কাউকেও বলতাম না। মা বাধ্য হয়ে ভাতে পানি দেওয়ার আগে কিছু ভাত আমার জন্য তুলে রাখত। আর তা না হলে আমি খাবোই না, এতে মা যেন আরো বেশি কষ্ট পেত। এজন্য মা বাধ্য হয়ে আমার জন্য ভাত রেখে দিত। সকালে সেটা খেয়ে স্কুলে চলে যাইতাম।
কিন্তু এখন যেন পান্তা ইলিশ খাওয়াটাই প্রেস্টিজের ব্যাপার, নাখাওয়াটা অপমানের। যে পান্তা ইলিশ খাওয়ানোয় জন্য মা প্রতিদিন সকালে পান্তাভাত আর ইলিশ মাছ নিয়ে আমার পিছে পিছে ঘুরে বেড়াত, সেই পান্তা ইলিশের আয়োজন এখন বছরে একবার করাটাই কষ্টকর হয়ে যায়। সেটা ইলিশের দামের কারনে।
তখন মাঝে মাঝে মোটা আউশ চালের ভাত রান্না করত, যেটা খেতে খুবই মজাদার, কিন্তু চাল দেখতে কালো তাই আমি খেতামনা। আউশ চাল- পান্তা ভাত আর চিড়া তৈরীর জন্য বিখ্যাত ছিল। এগুলো এখন আর পাওয়া যায়না। আব্বাকে মাঝে মাঝেই বলি যে, একটু খুজে দেখিয়েন যে এখন কেউ আউশ ধান চাষ করে কিনা। গত সপ্তাহেও বলেছি আউশ চাল পাওয়া যায় কিনা দেখতে।
তখন নিজেদের জমিতে গম চাষ হতো। আমরা গমের লাল আটার রুটি খেতে চাইতাম না। বাধ্য হয়ে গম বিক্রি করে, সেই টাকা দিয়ে সাদা আটা কিনে রুটি বানিয়ে খেতো। তখন গমের লাল আটার দাম কম ছিল আর সাদা আটার দাম ছিল বেশি। এটা শুধু আমার পরিবারের গল্প না, গ্রামের প্রতিটা পরিবারের গল্প ছিল। এখন আর আমরা সাদা আটা খাই না, লাল আটা খায়। এখন গম কাটার মৌসুম চলছে। কয়দিন আগেও আব্বাকে বলেছি, আমার জন্য একমন গম কিনে দিতে।
আসলে কালের বিবর্তনে সব সস্তাগুলো অনেক দামি হয়ে গেছে আর দামিগুলো সস্তা। এই যেমন ধরুন, টি ভি চ্যানেলের কথা। আগে গ্রামের একমাত্র টিভি চ্যানেল ছিল বিটিভি। তাও ছবি পরিস্কার হত না। ঐ ঝিরিঝিরি চ্যানেল দেখার জন্যই সারাদিন অপেক্ষা করতাম। রাত আটটার খবর প্রচারিত হত পাক্কা আধাঘন্টা। রাত দশটার খবর একঘন্টা। তবুও যেন টিভির পর্দা থেকে চোখ সরতো না। বাশের মাথায় টাঙ্গানো এন্টেনা টা কতবার ঘুরাতাম একটু পরিস্কার ছবি দেখার জন্য। যে জায়গাতে এন্টেনা রাখলে ছবি ভালো হইত সেই জায়গাতে এন্টেনা টা স্থির রাখার জন্য বাশটা শক্ত করে বেধে রাখতাম। ঐ একটা চ্যানেলই সবসময় দেখতাম। ঐ এক চ্যানেলেই যেন মনের টিভি দেখার খায়েশ মিটে যেত।
কিন্তু এখন?? এখন শতাধিক চ্যানেল থাকলেও কোন নির্দিষ্ট চ্যানেলে যেন স্থির হতে পারিনা। একের পর এক চ্যানেল চেঞ্জ হতেই থাকে। এগুলো হয়ত চ্যানেলের আধিক্যেরই প্রভাব। আর আগের সবচেয়ে দামি টিভি চ্যানেল বিটিভি 😃😃😃এখন যেন হাসির পাত্রে পরিনত হয়েছে। এখন যদি কাউকে বলা হয় যে, বিটিভি দেখলে প্রতি ঘন্টায় ৫০ টাকা করে দিবো😛😛😛😛তবুও মনেহয় কাউকে খুজে পাওয়া যাবেনা।
একইভাবে একসময়ের সস্তা ইলিশ এখন অনেক দামি। শুধু দামি না, একেবারে ধরাছোয়ার বাইরে। ঐসময়ে পাঙ্গাস মাছের দাম অনেক বেশি ছিল, কারণ পাঙ্গাস মাছ তখন পাওয়া যেত না। মাঝেমাঝে নদীর বড় পাঙ্গাস বাজারে আসলে, তা উচ্চমুল্যে কেটে বিক্রি হতো। কিন্তু এখন হয়ত পাঙ্গাসই বাজারের সবচেয়ে সস্তা মাছ।