08/05/2024
গাউট রোগ ও ইউরিক এসিডঃ
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহন করুন...
গাউট রোগ কেন হয়?
গাউট বাত প্রচলিত একটি সমস্যা। সাধারণত দেহে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে বিভিন্ন অস্থি-সন্ধি বা জয়েন্টে প্রদাহ হয়, এই ব্যথাকে গাউট বলা হয়।
প্রশ্ন : গাউট একটি প্রচলিত রোগ এবং অনেকেই এ রোগে ভুগে থাকেন। একটু বুঝিয়ে বলবেন কী যে গাউট রোগটি আসলে কী এবং কেন হয়? শরীরের কোন অংশে হয়?
উত্তর : গাউট রোগটি বিশেষ করে মধ্যবয়সী পুরুষদের বেশি হয় এবং এটি যথেষ্ট প্রচলিত একটি রোগ। আমরা যদি সারা বাংলাদেশের লোকেদের বিবেচনায় আনি তাহলে সংখ্যা অনুপাতে খুঁজতে গেলে হয়তো কম হবে। কিন্তু আমরা যখন হাসপাতালগুলোতে দেখি তখন প্রচুর সংখ্যক গাউট রোগী পাই। গাউট রোগীদের সাধারণত বুড়ো আঙ্গুলে প্রথম আক্রমণ হয়। হঠাৎ করে সুস্থ মানুষের তীব্র ব্যথা শুরু হলো। ব্যথার সময় দেখা যায় বুড়ো আঙ্গুলের মাথায় ফুলে গেছে, লাল হয়ে গেছে, প্রচণ্ড ব্যথা করছে। ব্যথার চোটে হয়তো ঘুম ভেঙে যায়। এমনকি বলা হয় যে বিছানার চাদর পর্যন্ত সহ্য হয় না, এমনই ব্যথা করে। আমি যেটা বলছিলাম, মধ্যবয়স্ক পুরুষদের বেশি হয়। আর নারীর যখন মেনোপজ হয়, অর্থাৎ মাসিক যখন একেবারে বন্ধ হয়ে যায়- তার পরের বয়সগুলোতে পুরুষদের মতো তারাও আক্রান্ত হয়। তাহলে আগের বয়সে, আমরা যেটাকে বলি রিপ্রোডাকটিভ বয়স, অর্থাৎ যখন মাসিক চলবে সেই সময় গাউটের আক্রমণ কম হয়। এ সময়টায় নারীর এ সমস্যা কম হলেও পরে নারী এবং পুরুষের প্রায় সমানভাবেই এ রোগ হয়।
তবে আমাদের দেশে আমরা দেখতে পাই, খুব বয়স্ক একটা মেয়ে বাত রোগ নিয়ে ভুগছেন- তখন আমরা ইউরিক এসিড পরীক্ষা করছি। আসলে তখন আর ইউরিক এসিড পরীক্ষা করে কোনো লাভ হয় না। এটা না করাটাই ভালো হবে। কিন্তু পুরুষদের জন্য বিপরীত হবে। পুরুষরা যদি এই ধরনের কোনো উপসর্গ নিয়ে আসে এবং আমার যদি মনে হয় এটা গাউট বাত হতে পারে, তবে আমি ইউরিক এসিড পরীক্ষা করাব।
প্রশ্ন : লক্ষণের মধ্যে একটি বলছিলেন, বুড়ো আঙ্গুল থেকে শুরু হয় এবং তীব্র ব্যথা হয়, ফুলে যায়। এ ছাড়া আর কোন কোন অংশ আক্রান্ত হতে পারে? আর কী ধরনের লক্ষণ দেখা যায়?
উত্তর : শতকরা ৫০ জনের দেখা যায়, বুড়ো আঙ্গুলের মাথা থেকে শুরু হয়। বাকি ৫০ শতাংশের বুড়ো আঙ্গুলের মাথা ছাড়াও হচ্ছে। অর্থাৎ পায়ের পাতার অন্যান্য যে অংশগুলো বা পাতার জয়েন্টগুলো থেকে এই ব্যথার উৎপত্তি হতে পারে। আরো একটু উপরের দিকে, আমরা যেটাকে বলি গোড়ালির জয়েন্ট; সেটা থেকেও হতে পারে। তারপর আরো একটু উপরে হাঁটু পর্যন্ত হতে পারে। এখানে একটি বিষয় মজার, গাউট কিন্তু একটু দূরের জয়েন্টগুলোকে আক্রমণ করতে চায়। একজন যদি মেরুদণ্ড, কোমর বা ব্যাকপেইন নিয়ে আসে আমার প্রথমেই চিন্তুা হবে এটা গাউটের বাত নয়। গাউটের বাত হবে একটু পেরিফেরির দিকে। পায়ের দিকে, হাতেরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ছোট ছোট জয়েন্টগুলো আক্রমণ করতে পারে। তবে হাতে আক্রমণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়।
প্রশ্ন : এই ধরনের ফুলে যাওয়াকে প্রচলিতভাবে অনেকেই বাতের ব্যথা বলতে চায়। এ ক্ষেত্রে রিউমাটোয়েড আরথ্রাইটিসের জন্য বা অন্য কোনো কারণে যদি ব্যথা হয় বা গাউটের জন্য যদি হয়, এটা আলাদা করার উপায় কী?
উত্তর : গিঁট ফুলে গেলে অবশ্যই এটি বাতের রোগ। তারপর আমাদের দায়িত্ব হবে- এই রোগকে কী আমরা গাউট বলব, রিউমাটোয়েড আরথ্রাইটিস বা গিটে বাত বলব, অস্টিওআরথ্রাইটিস বলব, নাকি রিউমেটিক ফিভার বলব। যেমন আমাদের দেশে একটি বিষয় খুব প্রচলিত। যেকোনো ধরনের বাতকে বলি আমরা বাতজ্বর। অনেক রোগীই আসেন, বলেন যে আমার বাতজ্বর হয়েছে! বাতজ্বর অনেক রোগের মধ্যে একটি মাত্র রোগ। বাতজ্বর সবার হয় না। বাতজ্বর ছোট বয়সে হয়, পাঁচ থেকে ১৫ বছরে হয়, ক্ষেত্রে বিশেষে একটু বড়দেরও হতে পারে। কিন্তু সেটার আশঙ্কা কম। বাচ্চাদের জন্যই সেটা প্রযোজ্য। সেই বাতজ্বরের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অল্প দিনের মধ্যে জয়েন্টের ব্যথাগুলো চলে যাবে, থাকবে না। আমরা বলি তিন থেকে ছয় মাসের পর বাতজ্বরের কোনো রোগীর জয়েন্টে ব্যথা থাকবে না। তখন খুঁজতে হবে যে তার হার্টে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না। আর অন্য যে বাতগুলো, এগুলো জয়েন্টগুলোকে আক্রমণ করবে এবং এখানেই থাকতে চাইবে।
তাহলে গাউট বাতটা আমরা কীভাবে বুঝব? আমি প্রথমেই বলছিলাম যে এটি মধ্য বয়স্ক পুরুষদের বেশি হয়। আরো কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন পায়ের গোড়ালির জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, তীব্র ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। মজার বিষয় হলো, আমি যদি গাউট বাতের রোগীকে চিকিৎসা নাও দিই তাহলে দেখা যাবে প্রথম প্রথম তিন থেকে সাত দিন বা দশ দিনের মধ্যে ব্যথাটি চলে যাবে। ফোলাটাও কমে আসবে। কিছু না করলেও কমবে। তবে এত তীব্র ব্যথা হয় যে ব্যথানাশক ওষুধ দিতেই হবে। জয়েন্ট ফুলে থাকলে বেশি ব্যথা করলে ইনজেকশন নিতে হবে।
প্রশ্ন : এই কষ্টদায়ক রোগটি হয় কেন?
উত্তর : আমাদের শরীরের মূল্যবান একটি উপাদান পিউরিন। পিউরিন মেটাবলিজম থেকে এই রোগের উৎপত্তি হয়। পিউরিন যখন ভেঙে যায় এবং ভেঙে গিয়ে যখন সর্বশেষ অবস্থায় পরিণত হয় তখন আমরা এটাকে বলি ইউরিক এসিড। ইউরিক এসিড যখন শরীরে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং জমা হতে থাকে, বিভিন্ন অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ এবং জয়েন্টের মধ্যে তখন এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। খাবারের প্রতিও সতর্ক থাকতে হবে।
প্রশ্ন : ইউরিক এসিড যখন বেড়ে যায় তখন কী খাবে না?
উত্তর : এখানেও আমাদের সমাজের বেশ কিছু ভুল ধারণা আছে। আগে বলা হতো যে গাউটের রোগীর ক্ষেত্রে সব ধরনের শাক-সবজি নিষিদ্ধ। কিন্তু এখন সেটা বলা হয় না। গাউটের রোগীদের ক্ষেত্রে কোমল পানীয় থেকে দূরে থাকতে হবে। আরো কিছু জিনিস আছে তাদের জন্য খারাপ। প্রাণীর কলিজা, মগজ, গিলা–এগুলো বাদ দিতে হবে। গরুর মাংস একেবারে নিষিদ্ধ না, তবে একটু সতর্ক হতে হবে। কম খেতে হবে। সামুদ্রিক মাছও একটু সতর্কতার সাথে খেতে হবে। শাক-সবজির ক্ষেত্রে আগের মতো আর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। নিয়মিত আমরা স্বাস্থ্যসম্মত যা খাই তার সবই খাওয়া যাবে।
======================≠=======
ইউরিক অ্যাসিড বাড়লে সতর্ক হোন
সাধারণ পীড়া দেওয়া ইউরিক অ্যাসিড অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বিষহ করে তোলে জীবনকে। এর কারণ কী। এ থেকে মুক্তি কীভাবে ?
শীত এলেই শরীরে প্রদাহ যেন বাড়ে! কিন্তু যদি রাতে শোওয়ার সময় বাড়ে? সে ফোলা বা ব্যথা যদি পায়ের বুড়ো আঙুলের গোড়ায় অনুভূত হয় বা গোড়ালি, হাঁটুর জয়েন্ট (গাঁট) ফুলে যায়। লাল হয়ে ফুলে ওঠে। তবে সাবধান! জানবেন ‘গাউট’ বা গিঁটে বাত আপনাকে ধরতে পারে।
এই কষ্টদায়ক রোগটি কখনও ইউরিক অ্যাসিড বাড়লেও হতে পারে। আবার অনেকক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসককে ব্যথা কমানোর ওষুধ দিতে হয়। সে সময় ইউরিক কমানোর ওষুধ দিলে উলটে ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। যদি বছরে এধরনের লক্ষণ দু’বার দেখা যায়, তবে নিশ্চিতভাবেই বিলম্ব না করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
ইউরিক অ্যাসিড যখন আমাদের শরীরে অনেক বেশি পরিমাণে চিনির দানার মতো হয়ে, শরীরের জয়েন্টগুলিতে জমে যেতে থাকে, তখন তৈরি হয় ক্রিস্টাল। একে মনোসোডিয়াম ইউরেট বলে। এই ক্রিস্টালগুলি থেকেই গাউট বা গিঁটে বাত হয়। এই গাউট যদি ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) হয়, তাহলে আঙুল বেঁকে যেতে পারে, বিভিন্ন জায়গাতে বড়-বড়, গোল-গোল দানার মতো আঙুলের ওপরে ফুলে উঠতে পারে। এমনকি এই ফুলে যাওয়া কানের লতিতেও হতে পারে। একে টোফাই বলে। এই ধরনের লক্ষণ যদি বছরে দু’বার দেখা যায় তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইউরিক অ্যাসিড কমানোর ওষুধ খেতে হবে।
মনে রাখবেন, এই চিকিৎসা সারা জীবন চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের যেমন সুগার বা প্রেসার হলে ওষুধ নিয়মিত খেতে হয়। তেমনটাই গাউট যদি ক্রনিক হয় তবে ওষুধ বন্ধ করা কখনই চলবে না।
এছাড়া ইউরিক অ্যাসিড বাড়লেই অযথা চিন্তিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। নিশ্চিতভাবেই ইউরিক অ্যাসিড বাড়লে অন্য কোনও কারণ খুঁজতে হবে। কেন বাড়ল? সাধারণ কিছু রোগ যেমন হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, মেটাবলিক সিনড্রম, কোলেস্টেরল কমিয়ে রাখার পাশাপাশি চিকিৎসক দেখবেন অন্য কোনও রোগ আছে কিনা।
ইউরিক অ্যাসিড কী :
প্রোটিন মেটাবলিজমের একটা বাই প্রোডাক্ট হলো ইউরিক অ্যাসিড। মানবদেহের প্রোটিন ভাঙতে-ভাঙতে শেষ অংশ হলো ইউরিক অ্যাসিড। সব প্রোটিন নয়। পিউরিন জাতীয় প্রোটিন। আমাদের শরীর থেকে কিছুটা ইউরিক অ্যাসিড বেরোয় বর্জ্য (মল, মূত্র)-র সাথে। যদি এই অ্যাসিড তৈরি হওয়া বেড়ে যায় বা বেরোনো কমে যায়,তখন আমাদের শরীরে ইউরিক অ্যাসিড জমতে থাকে। ইউরিক বেড়ে যাওয়াকে হাইপারইউরিসেমিয়া বলে। সাধারণত শরীরে ৬.৮ মিলিগ্রাম / ডি এল এর বেশি হলে তবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পুরুষ-মহিলার মধ্যে প্রভেদ আছে। মহিলাদের কিছুটা কম লেবেল ধরা হয়।
কী কী ক্ষেত্রে তা বাড়তে পারে :
পিউরিন জাতীয় খাবার বেশি খেলে এই ইউরিক অ্যাসিড বেশি তৈরি হয়। কিছু রোগ থেকেও শরীরে ইউরিক বাড়তে পারে। জটিল জেনেটিক কিছু রোগ থেকেও বাড়ে। আবার নির্দিষ্ট কিছু কারণে ইউরিক অ্যাসিড আমাদের শরীর থেকে কমও বেরোয়। কিডনির অসুখ, কিডনিতে স্টোন, মোটা হয়ে যাওয়া,ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, মেটাবলিকসিনড্রম। ক্যানসার রোগে কেমোথেরামি চলছে এক্ষেত্রে ইউরিক বেড়ে যেতে পারে।
অনেকক্ষত্রে ইউরিক বাড়লেও কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। তাই কিছু-কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হয়।
যেমন ফ্রুকটোজ জাতীয় খাবার খেলে ইউরিক অ্যাসিড বাড়ে। যে-কোনও ধরনের মিষ্টি, আম, লিচু। যে-কোনও সামুদ্রিক মাছ। রেড মিট (খাঁসির মাংস)। মদ্যপান (রেড ওয়াইন ব্যতীত)। ধূমপান ইউরিক বেরোতে বাধা দেয়। এখন দ্রুত জীবনযাত্রার পরিবর্তন আমাদের অনেক সমস্যা ডেকে এনেছে। এর মধ্যে খাদ্যাভ্যাস অন্যতম। জাঙ্ক ফুড খাওয়া নবীন-প্রবীণ দুই প্রজন্মকেই এই রোগের শিকার করে তুলছে।
ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়া মানুষের কাছে সুখবর হলো একটা মিথ ছিল সবুজ শাকসবজি : পালং বিনস, মুসুর ডাল ইউরিক বেড়ে গেলে খাওয়া যাবে না। কিন্তু আজকের বিজ্ঞানের অগ্রগতি একে নসাৎ করে বলছে, হ্যাঁ এগুলি খেলে ইউরিক কিছুটা বাড়ে তবে যতটা মিষ্টি জাতীয় খাবার বা রেড মিট খেলে বাড়ে ততটা নয়। তাই সব রকম সবুজ ও রঙিন সবজি ‘পরিমিতভাবে’ খাওয়া যেতে পারে।
ভাল থাকার উপায় :
নিয়মিত শরীরচর্চা ভীষণভাবেই আজকের দিনে জরুরি। এর সাথে শসা, আপেল, তরমুজ, পেয়ারা, ন্যাসপাতি, স্কোয়াস জাতীয় ফল খেলে ইউরিক অ্যাসিড কমতে সাহায্য করে। এর সাথে জল বেশি খেলে ইউরিক বেরোতে সাহায্য হয়। দুধ, কফি ইউরিক কমাতে সাহায্য করে (চিনি ছাড়া)।
ইউরিক যখন খুব বেশি বেড়ে যাবে ১২ মিলিগ্রাম/ডিএল এর ওপর যদি চলে যায় নিশ্চিতভাবেই ওষুধ দিতে হবে। বিবর্তনের সাথে-সাথে মানুষের দেহের পরিবর্তন ঘটলেও ব্যাপক খাদ্যভাসের পরিবর্তন ও জীবনশৈলীর পরিবর্তন নতুন বিপদের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছে।
(সংগ্রহীত)