18/03/2026
অতীব জরুরী
হঠাৎ করেই বাংলাদেশে হাম বা মিজেলস (Measles) আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। এটি একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।
হাম একটি ভাইরাসজনিত তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ। একটি সাধারণ ভুল ধারণা আছে যে এটি কেবল একটু জ্বর বা গায়ের র্যাশ। কিন্তু বাস্তবে, হামের সংক্রমণ থেকে ভয়াবহ জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞানের ভাষায় এর সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সরাসরি ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
কীভাবে ছড়ায়?
হাম একটি বায়ুবাহিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কথা বলার মাধ্যমে বাতাসে ভাইরাসের কণা ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাইরাস বাতাসে বা কোনো বস্তুর ওপর প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
হামের লক্ষণ কী?
হামের র্যাশ বা লালচে দানা ওঠার অন্তত ৪ দিন আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি ভাইরাসটি ছড়াতে শুরু করেন। চিকিৎসকদের মতে, র্যাশ ওঠার আগের এই লক্ষণগুলো চিনতে পারা খুব জরুরি:
আমরা 3C দিয়ে মনে রাখি
1. Cough (তীব্র কাশি)
2. Coryza (সর্দি বা নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া)
3. Conjunctivitis (চোখ লাল হওয়া বা চোখ ওঠা
এছাড়াও:G
* তীব্র জ্বর।
* মুখে বা গলায় অস্বস্তি।
* মুখের ভেতর ফোলা অংশের মতো 'কপ্লিক স্পট' (Koplik spots) দেখা দেওয়া।
* ৩-৪ দিন পর মুখমণ্ডল থেকে র্যাশ শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
কী কী জটিলতা হতে পারে?
হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে:
* নিউমোনিয়া: হামে মৃত্যুর প্রধান কারণ।
* অপুষ্টি ও ডায়রিয়া: শিশুদের শরীর মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়।
* অন্ধত্ব: চোখের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
* এনসেফালাইটিস: মস্তিষ্কে সংক্রমণ, যা তাৎক্ষণিক মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব ডেকে আনতে পারে।
* SSPE (Subacute Sclerosing Panencephalitis): এটি হামের অনেক বছর পর হওয়া একটি বিরল কিন্তু অবধারিতভাবে মৃত্যু ঘটানো মস্তিষ্কের জটিল রোগ।
এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথায়। আমাদের করণীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
১. টিকা, টিকা এবং টিকা: হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকরী উপায় হলো সঠিক সময়ে টিকা নেয়া।
বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলা (MR) টিকা দেওয়া হয়। আমাদের পরিচিত কোনো শিশু যেন এই টিকা থেকে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
(মনে রাখবেন, এই টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এর সাথে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।)
২. ভিটামিন-এ (Vitamin A): হাম আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো জরুরি। এটি শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি UNICEF ও WHO-এর প্রটোকল।
৩. আইসোলেশন ও পরিচ্ছন্নতা:
* আক্রান্ত শিশুকে অন্ততপক্ষে র্যাশ ওঠার পর ৫ দিন পর্যন্ত আলাদা ঘরে রাখুন।
* রোগীর সংস্পর্শে এলে মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার বাধ্যতামূলক।
* ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করুন।
৪. ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষা: গর্ভবতী নারী, ক্যানসার আক্রান্ত রোগী, বা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম (ইমিউনোকম্প্রোমাইজড), তাদের হাম আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা আবশ্যক।
হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। মূলত লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসাই প্রধান ভরসা। সর্দি, জ্বর ও কাশির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ নিতে হবে। প্রচুর তরল খাবার, ফলের রস, স্যুপ, সুষম খাবার খাওয়াতে হবে।
বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে অনেক সাফল্য অর্জন করলেও একটি বড় অংশের মানুষ এখনো ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা আসায় এই সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে সতর্ক হই এবং শিশুদের হামের টিকা নিশ্চিত করি। কোনো প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন।
সংক্রামক রোগগুলো আসলে শুধু নিজে নিজে সতর্ক হয়ে প্রতিরোধ করা কঠিন। পুরো কমিউনিটিরই সচেতনতা প্রয়োজন। তাই নিজেদের স্বার্থেই অন্যদের সচেতন করতে হবে।