31/10/2024
জবের সুবাদে কোনো এক ট্রেনিংয়ে মুআজের ( ছদ্মনাম) সাথে আমার প্রথম দেখা।তার আপাদমস্তক সুন্নাতি লেবাস আর শশ্রুমণ্ডিত সফেদ চেহারা আমায় মুগ্ধ ও বিমোহিত করলো। কিন্তু পরক্ষণেই এই বলে মনকে শান্তনা দিলাম, সৃষ্টিকর্তা হয়তো এর চেয়েও ভালো সঙ্গী আমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন।
ওহ, হ্যা বলাই হয়নি। আমরা দুজন সরকারী জব করি। টানা দশ দিন এক সাথে ট্রেনিংয়ে ছিলাম। বাট এক দিনও সে আমার সাথে কোনো কথা বলেনি।
সুরা নুরে আল্লাহ বলেছেন, "হে নবী, মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। … আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে।"
এদিকে আমাকে সে আপাদমস্তক পর্দাবৃতা দেখে তারও নাকি গুমোট হয়ে থাকা হৃদয়ে ঝিরিঝিরি বাতাস বয়েছিল।
ট্রেনিংয়ের তৃতীয় দিন!
গ্রুপিং কাজের ফাঁকে কোনো এক ট্রেইনী বললেন, শাপলা গ্রুপের ঐ যে ম্যাডাম "মোষ্ট ট্যালেন্টেড"।
সেটা শুনে মুআজের ঝিরিঝিরি বাতাসে স্নিগ্ধ হৃদয়টা উতাল সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই মাথা থেকে সব কিছু ঝেড়ে কাজে মন দিল। কেননা
আল্লাহ বলেন,
"তিনিই চক্ষুর অপব্যবহার এবং অন্তরের গোপন বস্তু সম্পর্কেও অবগত”। [সূরা গাফির, আয়াত: ১৯]।
ট্রেনিং শেষ হলো।
দুজনের মনের অনুভূতি গুলো স্মৃতির নোটবুকে রেখে দিলাম।
এক বছর হয়ে গেল!
নোটবুকটি আর খুলে দেখা হয় নি।
প্রায় দেড়বছর পর বিয়ের জন্য কনে খুঁজাখুঁজিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে মুয়াজ।
কিন্তু ধার্মিক কনে খুঁজে পাওয়াতো বড্ড মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কি আর করা যায়!
একদিন তার এক কলিগের সাথে সেটা শেয়ার করলো, বন্ধু, দেখ না তোর জানাশুনা কি কোন ধার্মিক পাত্রী আছে?
কনে তো অনেকই পেলাম। কিন্তু ধার্মিকতার মাপকাঠিতে এরা একেবারেই শূন্যের কোঠায়।
- ইয়েস, ইজমা মিস ইজ( ছদ্মনাম) পারফেক্টলি ফোর ইউ। সে যেমন ধার্মিক, তেমন ট্যালেন্টও। পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও ভালো। তোর সাথে পুরোপুরি মিলবে।
- ইজমা কে?
- তোর সাথে তো ট্রেনিং করছে।
-অহ, মনে পড়ছে। যে মেয়েটা সারাক্ষণ নিকাব পরে থাকতো।
-ইয়েস।
যেই বলা সেই কাজ। প্রস্তাব পাঠানো হলো।
কনে দেখার তারিখ ঠিক করা হলো।
এক দেখাতেই পছন্দ।
শ্যাম বর্ণের এই মেয়েটি এত মায়াবী কেন!
উফ! আমায় পাগল করে দিচ্ছে।
ইস্তেখারা করা হলো। পাত্র পজিটিভ রেজাল্ট পেল। কিন্তু পাত্রী কেন জানি দ্বিধায় পড়ে গেল। বিয়ের কথা মনে হলে তার মধ্যে অজানা এক ভয় কাজ করে। সেটা কি তার ইস্তেখারার নেগেটিভ রেজাল্ট?
নাকি শয়তানের ওয়াসওয়াসা?
সে তো কিংকর্তব্যবিমুঢ়।
কি করবে সে?
নাকচ করে দিবে?
না, লজ্জায় আর সেটা হলো না।
এভাবেই বিয়েটা হয়ে গেল।
আলহামদুলিল্লাহ , আমাদের বিয়ের বয়স আজ চারবছর রানিং। আমার হাজব্যাণ্ড তথা মুয়াজের সাথে জগড়া তো দূরের কথা একদিনও মনোমালিন্য হয়নি। যা হয়েছে অভিমানের সুরে চলে গেছে। মান অভিমান ভাঙতে ভাঙতে আবার ভালোবাসার সূর্য উঠে যায়। এরই মধ্যে আমাদের কোলজুড়ে আরেকটি কলিজার টুকরো আসলো। ভেরি ইন্টারেস্টিং। আমাদের প্রথম এনিভার্সারিতে রাজকুমারের জন্ম হয়।
তাঁর জন্মের পর সাংসারিক কাজ, বাচ্চা সামলানো একা হাতে করা বড্ড মুশকিল হয়ে পড়েছিল।একদিকে নিজের অনভিজ্ঞতা আর অন্যদিকে এত এত কাজ। তারপরও কারও মন পাওয়া যায়না। সবকিছু মিলিয়ে নিজের জীবনটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। নিজের স্বাস্থ্যের যত্নতো দূরের কথা গোসল করারই সময় পেতাম না। এসময় তার কতটা সাপোর্ট পেয়েছি তা বলে শেষ করা যাবেনা। অনেক সময় অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসতো শুধু আমাকে সময় দেয়ার জন্য। বার বার ফোন দিয়ে বলতো,
- গোসল করেছো, ঔষধ খেয়েছো।
- না, গোসল করার সময় পাইনি।
- তাহলে আমি আসছি।
এইতো সে চলে আসলো। বাচ্চার ডায়াপার চেঞ্জ করলো। কোলে নিল। বেসিনের জমানো তালাবাসন ধৌত করলো। আমি গোসল করলাম।
এভাবে একঠানা কাজের চাপে যখন হাঁপিয়ে উঠি, তখন তার একটি কথায় আমার মন প্রশান্তিতে ভরে উঠে।
"এই তুমি ঘুমাও আমি বাসন ধৌত করবো।"
" এই তুমি ঘুমাও, আমি বাচ্চার ফিডার রেডি করবো।
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা একজন অপরজনের উপর সন্তুষ্ট। তবে সংসার জীবনে কোনো ছন্দপতন হয়নি, তা কিন্ত নয়। আমি অনেক সুখী যখন দেখি সুখ- দুঃখ, ভালো -মন্দ মিলে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক
'বোঝাপড়া ' অনেক মজবুত।
অবশেষে দোয়া চাই, অনাগত সুন্দরের পথে হোক আমাদের জিন্দেগীর নিত্য পদক্ষেপ। স্বার্থক সময়ের সিঁড়ি বেয়ে স্বপ্নগুলো স্পর্শ করুক জীবনের চূড়ান্ত সফলতাকে। সেই সাথে লাইফের পুষ্পকানন বিস্তৃত হোক জান্নাতের সবুজ সীমানা জুড়ে।
নোটঃ- ইনবক্স থেকে পাওয়া সত্য সুন্দর গল্প। স্বামী বা স্ত্রীর ভালো গুন,কোনো চমৎকার ঘটনা কিংবা আপনার দাম্পত্য জীবনের কিছু সুখের স্মৃতি পেইজের ইনবক্সে শেয়ার করুন।
সুন্দর লিখাগুলো পেইজে পোস্ট করা হবে এবং বিজয়ীদেরকে লাইভ লটারির মাধ্যমে আকর্ষনীয় পুরস্কার দিবো ইনশাআল্লাহ্।