11/05/2024
একজন সাহাবীর প্রয়োজন মেটানোর জন্য নবিজী (স.) এক ইহুদির কাছ থেকে ঋণ নেন।
ঋণ গ্রহণের সময় বিধান হলো ঋণ ফেরতের তারিখ নির্ধারণ করা। নবিজী( স. ) ইহুদিকে একটি তারিখ বলেন, যে তারিখে তিনি ঋণ ফেরত দিবেন।
একদিন নবিজী (স. ) সাহাবীদেরকে নিয়ে একটি জানাযা থেকে ফিরছেন। তাঁর সাথে ছিলেন আবু বকর, উমরের (রা. ) মতো মহান কিছু সাহাবী।
ঠিক সেই সময় ঐ ইহুদি লোকটি নবিজীর (স.) গলার চাদরে ধরে রাগী স্বরে, অভদ্র ভাষায় বললো-
“ও মুহাম্মদ! আমার কাছ থেকে যে ঋণ নিয়েছিলে, সেই অর্থ কোথায়? আমি তো তোমার পরিবারকে চিনি। ঋণ নিলে তোমাদের আর কোনো খবর থাকে না!”
নবিজী (স.) সেসময় মদীনা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর কথায় সাহাবীরা নিজেদের জীবন দিয়ে দিতে পারেন। তিনি যদি সাহাবীদেরকে একটু ইশারা দেন, তাহলে সাহাবীরা তার (ইহুদির) গর্দান উড়িয়ে ফেলবেন। তাঁকে সবার সামনে এতো বড়ো অপমান করা হলো? অথচ ঋণ পরিশোধের যে তারিখ ধার্য করা ছিলো, সেটা এখনো বাকি আছে। সময়ের আগেই সুন্দরভাবে না চেয়ে এভাবে অভদ্র ভাষায় দাবি করতে হবে?
উমর (রা.) সহ্য করতে পারলেন না। তিনি তাঁর স্বভাবজাত সেই বিখ্যাত উক্তিটি বললেন-
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, তার গলা থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি?”
নবিজীর (স.) এর যেমন ক্ষমতা ছিলো, তেমনি তিনি ন্যায়সঙ্গত ছিলেন (কারণ, ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ইহুদি লোকটি তাঁর চাদর ধরে অপমান করেছে)। ইহুদির অমার্জিত আচরণের কারনে তিনি শাস্তি দিতে পারেন। ইহুদিরা তাঁকে নবী বলে স্বীকৃতি না দিক, তারা তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান, চিফ জাস্টিস হিসেবে তো স্বীকৃতি দেয় (মদীনা সনদের আলোকে)। নবিজী (স.) ইহুদিকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেবার অধিকার রাখেন।
কিন্তু, তিনি উল্টো উমর ইবনুল খাত্তাবকে (রা.) বললেন:
“উমর, তোমার কাছ থেকে তো উত্তম ব্যবহার আশা করা যায়। তুমি এভাবে না বলে বরং আমাকে বলতে পারতে- ‘আপনি তাঁর ঋণ পরিশোধ করুন’। কিংবা তাকে বলতে পারতে- আপনি সুন্দরভাবে ঋণের কথা বলতে পারতেন।”
অসুন্দরের জবাব সুন্দর দ্বারা, অনুত্তমের জবাব কিভাবে উত্তম দ্বারা দিতে হয় সেটা নবিজী (স.) উমর (রা.) সহ সাথে উপস্থিত সাহাবীদেরকে শেখালেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স. ) উমরকে (রা.) নির্দেশ দিলেন-
“উমর, যাও তার সাথে এবং তাকে তার ঋণ পরিশোধ করার পর আরো বিশ সা’ খেজুর দিও। কারণ, তুমি তাকে ভয় দেখিয়েছো।”
উমর (র.) ইহুদিকে সাথে নিয়ে গেলেন। তাকে তার প্রাপ্য ঋণ প্রদান করলেন এবং সাথে আরো ৩২ কেজির মতো খেজুর দিলেন। ইহুদি তো অবাক! সে একে তো সময়ের আগেই পাওনা দাবী করেছে, তার
উপর সবার সামনে নবিজীকে (স.) অপমান করেছে; তবুও নবিজী (স.) তাকে পাওনা দিয়ে দিলেন, সাথে দিচ্ছেন আরো ৩২ কেজি খেজুর!?
সে জিজ্ঞেস করলো, “অতিরিক্ত এগুলো কেনো?”
উমর (রা.) বললেন, “কারণ, আমি তোমাকে হুমকি দিয়েছি। সেটার কাফফারা হিসেবে নবিজী (স.) এগুলো দিতে বললেন।”
এটা শুনে ইহুদি বললো, “উমর, তুমি কি জানো আমি কে?”
উমর (রা.) বললেন, “না, আমি জানি না। তুমি কে?”
ইহুদি বললো, “আমি যায়িদ ইবনে সু’নাহ।”
তার নাম শুনে উমরের (রা.) চক্ষু চড়কগাছ!
যায়িদ ইবনে সু’নাহ? মদীনার সেই বিখ্যাত ইহুদি রাবাই (ইহুদিদের আলেম)? উমর (রা.) তার নাম জানতেন, কিন্তু তিনিই যে ঐ ব্যক্তি, সেটা তিনি জানতেন না।
যায়িদ ইবনে সু’নাহ বললেন, “হ্যাঁ, আমিই সেই ইহুদি রাবাই। আমাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী মুহাম্মদের (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবী হবার প্রমাণের যতো ভবিষ্যৎবাণী পাওয়া যায়, সবগুলোই আমি তাঁর মধ্যে পেয়েছি। শুধু দুটো বিষয় পরীক্ষা করা বাকি ছিলো।”
সেই দুটো ছিলো:
১. তাঁকে কেউ রাগালে তিনি সহনশীলতা দেখাবেন।
২. কোনো মূর্খ তাঁর কাছে এসে মূর্খের মতো আচরণ করলে তিনি বরং সেই মূর্খের সাথে ভালো আচরণ করবেন। অর্থাৎ তিনি মন্দের জবাব ভালোর মাধ্যমে দিবেন, অনুত্তমের জবাব উত্তমের মাধ্যমে।
যায়িদ ইবনে সু’নাহ নবিজীর (স. ) মধ্যে সেই দুটো গুণও এবার দেখতে পান। তিনি নবিজীকে (স.) রাগানো সত্ত্বেও নবিজী (স.) তাঁর সাথে রাগ করেননি; উল্টো তার পাওনা অর্থের বেশি তাকে দিয়েছেন।
এবার যায়িদ ইবনে সু’নাহ বললেন:
“ও উমর, তুমি সাক্ষী থাকো- আমি আল্লাহকে আমার রব হিসেবে, ইসলামকে আমার ধর্ম হিসেবে এবং মুহাম্মদকে (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নবী হিসেবে মেনে নিলাম। আমার অনেক সম্পদ আছে। আমি আমার অর্ধেক সম্পদ ইসলামের তরে দান করে দিলাম।”
তথ্যসূত্র:
সহীহ ইবনে হিব্বান: ২৮৮, আল-বায়হাকী: ১১০৬৬, মুস্তাদারক হাকিম: ৬৫৪৭। ইমাম হাকিম (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলেছেন।
----
আরিফুল ইসলাম
২১ জুলাই ২০২১