10/05/2026
চাপাবাজ মা
ছোটবেলায় আমরা মাকে “চাপাবাজ” বলে ডাকতাম।
আমরা ছিলাম ছয় ভাই, দুই বোন—আর মা-বাবা মিলে দশজনের সংসার। বাবা ছিলেন দিনমজুর। কোনোদিন কাজ পেতেন, কোনোদিন পেতেন না।
যেদিন কাজ থাকত না, বাবা মাকে জিজ্ঞেস করতেন,
— “আজ কী করবা? কাজ তো পেলাম না।”
মা হাসিমুখে বলতেন,
— “আছে, চলে যাবে। চিন্তা করো না।”
এইভাবেই মায়ের চাপাবাজি শুরু।
ঘরে আসলে কিছুই থাকত না। কখনো না খেয়ে, কখনো অর্ধাহারে দিন কাটত আমাদের। মা পাশের বাড়ির জাকি বা ফেলাদের কাছ থেকে অনেক অনুরোধ করে এক কেজি চাল বাকিতে আনতেন।
তারপর মাঠ থেকে তুলে আনা হাতরি-পাতরি শাক বেশি করে রান্না করতেন। আর বড় পাতিলে অনেক পানি দিয়ে সামান্য চাল বসাতেন চুলায়।
আমি, আমার বড় ভাই সাইদার আর ছোট বোন খাদিজা চুলার পাশে গোল হয়ে বসে থাকতাম। ভাত যখন ফুটত, আমরা একদৃষ্টিতে পাতিলের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
একটা বুদবুদ, তারপর দুইটা… একসময় পুরো পাতিল ভরে যেত বুদবুদে।
মা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে চোখ মুছতেন।
আমরা জিজ্ঞেস করতাম,
— “মা, কী হয়েছে?”
মা বলতেন,
— “আগুনের ধোঁয়া চোখে গেছে।”
এই বলেও চাপাবাজি করতেন মা।
পাশের বাড়ির চাচি এসে বলতেন,
— “এত পানি দিয়েছো কেন?”
মা হেসে বলতেন,
— “ভুল করে একটু বেশি পড়ে গেছে।”
আবারও চাপাবাজি।
ফ্যান গালার সময় আমরা ছোট ছোট বাটি নিয়ে বসে থাকতাম। আমার ছোট বোন বলত,
— “মা, ফ্যানের মধ্যে ভাত পড়ে যাচ্ছে তো!”
মা বলতেন,
— “কই? তুই ভুল দেখছিস।”
তারপর সেই ফ্যান ভাগ করে দিতেন আমাদের মধ্যে।
আমরা লবণ দিয়ে কী যত্ন করেই না খেতাম!
সকালেও খাইনি, দুপুরেও না—ক্ষুধায় কুঁকড়ে যাওয়া পেটটা তখন একটু শান্তি পেত।
এক কেজি চালের ভাত মা নয়জনের পাতে সমান করে তুলে দিতেন। হয়তো পাতিলে অল্প একটু নিজের জন্য রাখতেন। কিন্তু কারো পেট ভরেনি বুঝলে সেটুকুও তুলে দিতেন তার পাতে।
বাবা জিজ্ঞেস করতেন,
— “পাতিলে আর কত আছে?”
মা সঙ্গে সঙ্গে বলতেন,
— “অনেক আছে, তুমি খাও।”
পরে দেখা যেত, পাতিলে কিছুই নেই।
তবুও মা বলতেন,
— “আমার ক্ষুধা নাই। রান্নার সময় ফ্যান খাইছি। একটা পেটে আর কত জায়গা হয়?”
এভাবেই চাপাবাজি করতে করতে মা আমাদের বড় করেছেন।
আজ মা আমাদের মাঝে নেই। হয়তো তিনি বেহেশতের কোনো এক কোণে বসে এখনও আমাদের মঙ্গল কামনা করছেন।
যে মা চাল না থাকলেও বলতেন “আছে”,
পানি বেশি দিয়ে বলতেন “ভুল করে হয়ে গেছে”,
নিজে না খেয়ে বলতেন “আমার ক্ষুধা নাই”—
সেই চাপাবাজ মায়েরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যোদ্ধা।
আল্লাহ যেন সকল মাকে ভালো রাখেন, আর যেসব মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।
মোঃ সাইফুল ইসলাম
উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হারদি
আলমডাঙ্গা চুয়াডাঙ্গা
০১৭৩৯৮৫৮৯৪৫