13/02/2026
রোগীর “ঘরের ও বাইরের সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে” কী লক্ষ করতে হয়!
কয়েকদিন আগে, অর্গাননে রোগীর কেইস-রেকর্ড করার সময় ও তাকে বোঝার লক্ষ্যে হ্যানিমান মানুষের ঘরের ও বাইরের সম্পর্কগুলোর ব্যাপারে লক্ষ করতে বলেছেন – সেটা নিয়ে একটা জিজ্ঞাসামূলক পোস্ট করেছিলাম। আজকে ব্যাপারটাতে একটু এক্সপ্লোর করবো। তা করার আগে, সামান্য একটু গোড়ার দিকের আলোচনায় আলোকপাত করছি - সম্পর্ক বা Relationship ব্যাপারটা কী – তা সুস্পষ্টরূপে ডিফাইন করার লক্ষ্যে।
বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা আছে, যাকে বলে Systems thinking এবং তাদের একটি সিদ্ধান্ত হচ্ছে:
“Reality is not made of things, but of relationships.”
আলোচনার প্রেক্ষাপটে কথাটা ফিলোসফিক্যাল শোনালেও, এটা কিন্তু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ফল!
এ প্রসঙ্গে Beau Lotto (A visiting scholar at New York University. His research explores “How the brain adapts to uncertainty at the cellular, computational and perceptual levels with the aim of understanding the fundamental principles of biologically-inspired innovation.) বলেন:
“Relationships are a living system. The quality of their life reflects the quality of the interaction between those involved. How you interact is a choice.”
এবার ধান ভানতে আগে শীবের গীত গাওয়ার কারণটা বলে নিই। বিজ্ঞান যেরকমটি বলছে – রিলেশনশিপ যদি সত্যিই এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে সেটা খোদ আমাদের সবচাইতে সাবলীল ও স্বাধীন অস্তিত্বের প্রশ্নের সাথে জড়িত। কাজেই, যে চিকিৎসককে মানুষের পরিমাপ ও মেরামত করতে হবে তাকে সম্পর্কগুলো ব্যক্তির জীবনে কী অর্থ বহন করে সেটার নূন্যতম Mental Clarity (বোধের স্বচ্ছতা) থাকতে হবে।
বিজ্ঞানের এই কথাগুলো সত্য কিনা সেটা বোঝার জন্য আমি মনে মনে একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছিলাম। সেটা আমি বলছি, হয়তো আপনি এপ্লাই করলেও ব্যাপারটা ধরতে পারবেন।
তার আগের গুরুত্বপূর্ণ একটা দিকও বলে নিতে হবে। বর্তমান সময়ে “Relationship” শব্দটা বহুজনের কাছে কেবল একটা বিশেষ ধরনের সম্পর্ককে প্রকাশ করে, সমাজে যেটা প্রেম, ভালোবাসা বা এরকম আইডিয়াগুলোর সাথে জড়িত। কিন্তু বিজ্ঞান ও সার্বজনিন বাস্তবতায় শব্দটা এই ক্ষুদ্র ও সীমিত অর্থ বহন করে না। হ্যানিমান বা অন্য কোনো বিজ্ঞানীর কাছেই নয়।
এটা বুঝতে হলে, আপনাকে জানতে হবে যে, “সম্পর্ক” বলতে মূলত দুইটি পক্ষের একটা বিশেষ প্রকার পারস্পরিক সংযোগ বোঝায়, যা মূলত নির্ভর করে দু’পক্ষের Vibrational Synchronicity এর উপর। কোনো এক ব্যাক্তির ক্ষেত্রে তার সেই সম্পর্ক বা সংযোগ যে কোনো কিছুর সাথে হতে পারে। গাছ, পাথর, মাছ, মানুষ যে কেনো কিছু্। এবার, আপনি যদি মনে মনে আপনি যাদের সাথে সম্পর্কিত তাদের নিয়ে যদি কল্পনা করেন, আপনার নিজের সাথে যদি তাদের একটা সংযোগ-রেখা কল্পনা করেন – তাহলে সেটা একটা জালের মতো বুননে দেখতে পাবেন।
সম্পর্কের ব্যাপারে আরেকটা সিদ্ধান্ত হচ্ছে: আপনি সচেতন হলে, আপনার দিকের সম্পর্কের মাত্রা জানতে পারেন কিন্তু অপরপক্ষের মাত্রা সাধারণ নিয়মে ঠিক ঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়। প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই আপনাকে অনুমানের উপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কাজেই ব্যাপারটা ঠিক সায়েন্টিফিক হবে না। এবার এক্সপেরিমেন্ট শুরু করুন:
মনে মনে কল্পনা করুন – আপনি কার কার ও কীসের সাথে সম্পর্কিত। আপনার অনুভূতির পক্ষ থেকে তাদের সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব বা অনুভূতির তীব্রতা অনুসারে তাদের সাথে আলোকিত সংযোগ রেখা কল্পনা করুন। আপনার পক্ষের তীব্রতার মাত্রা যেখানে বেশি সেখানে আলোটাকে বেশি উজ্জ্বল রাখুন, যেখানে যত কম সেখানে আলোটা তত দুর্বল রাখুন। এটা আপনার সম্পর্কের একটা সাধারণ ম্যাপিং।
এবার একটু গভীরভাবে লক্ষ করে দেখুন – আপনি যখন যে কাজেই করছেন না কেন, এই কোনো একটা বিন্দুর সাথে সম্পর্কের সাপেক্ষেই করছেন। অর্থাৎ আপনার সেই কাজ কোনো একটা বিন্দুর সাথে সবটা সময়ই সংশ্লিষ্ট।
এবার আরেকবার আপনার সম্পর্কের পৃথিবীটাতে প্রবেশ করুন। একটা একটা করে আলো খুব সচেতন বোধ ও চিন্তা নিয়ে নিভিয়ে দিন। কিছুক্ষণের জন্য ভাবুন- তার বা সেটার সাথে এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। একটা একটা করে, ধীরে ধীরে, খুবই সুনিন্তিতভাবে সময় নিয়ে কাজটা করুন। শেষ বাতিটা নেভার আগেই হয়তো টের পাবেন –
আপনি পৃথিবীর সাথে ডিসকান্টেক্টেড, ডিপ্রেসড, ডিটাচড একজন ব্যক্তি; অন্ধকার ছাড়া চারপাশে আর কিছুই নেই। আপনার প্রণোদনা নেই, প্রয়োজন নেই, কোনো কিছু ইচ্ছে করার কোনো কারণ নেই, জীবনটা কিছু যান্ত্রিক কাজের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু মনে হবার আর কারণ নেই। যাকে প্রকারান্তরে ব্যক্তির মৃত্যু ছাড়া আর কীভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে? হ্যা, জম্বি বলতে পারেন।
অন্তত উপরে বলা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানগুলো সত্য হলে, এটাই হচ্ছে ঘটনা। আর এই বিশাল ঘটনাটা বলার কারণ হচ্ছে – চিকিৎসক যদি বুঝতে না পারেন যে, সম্পর্ক আদতে কী; তিনি রোগীর “ঘরের ও বাইরের সম্পর্কযুক্ত পরিবেশ”-কে কখনোই সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারবেন না। তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে: আমাদের বহুজন রোগীদের জীবন-ইতিহাসে সম্পর্কের কেবল ছকে বাঁধা কিছু দিকে দৃষ্টিপাত করেন, যেমন – দুঃখ, শোক, ব্যর্থ প্রেম ইত্যাদি। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। বহু কারণেই গুরুত্বপূর্ণ, তন্মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে – এগুলো ইটিওলজি হতে পারে।
কিন্তু আপনি এখান থেকে যত তথ্যই সংগ্রহ করুন- তা অতীত সীমানার অন্তর্ভুক্ত। রোগীর বর্তমান সম্পর্কগুলো বা তার অবস্থার সঠিক পরিমাপ বহু সময়ই অবমূল্যায়িত থেকে যায়। সব রোগীতে তো আর ইটিওলজি থাকে না। আবার একটা বড় ঘটনা ঘটলেই যে সেগুলো ইটিওলজি হবে তার কোনোই নিশ্চয়তা নেই। বরঞ্চ আগেরগুলোর কোনোটা ইটিওলজি ছিলো কিনা, সেটা বুঝতে হলেও আপনাকে সামনে বসা রোগীর বর্তমানটিতে মনোযোগ দিতে হবে; তার স্বরূপ, প্রবণতা, প্রিডিসপোজিশনকে বুঝতে হবে। আর হেরিংয়ের ল’ অনুযায়ী, অস্তিত্বের যে কোনো স্তরে রোগীর বর্তমান প্যাথলজিক্যাল অবস্থাটিই প্রথমে বিবেচ্য।
তাহলে বর্তমানের এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে কী দেখতে হবে? আমরা আগেই দেখেছি- অন্য পক্ষের অনুভূতির তীব্রতা ও সম্পর্কের মাত্রা কেবল অনুমানসুলভ হবার সম্ভাবনা। কাজেই, দেখতে হয়- রোগী তার সম্পর্কগুলোর ব্যাপারে কী অনুভূতি, কতটা অনুভূতি, কী রকম অনুভূতি পোষণ করে এবং সেটা ঘরে কেমন ও বাইরে কেমন? আর এগুলোর মাধ্যমে আদতে যা দেখতে হয় – তা হচ্ছে, ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য। রোগীর কথাগুলো তার কী বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করছে!
এখন কথা হচ্ছে, রোগী যা নিজের বা তার পারিপার্শ্বিক সম্পর্ক সম্বন্ধে যা বলছে তা সত্য হবে বা সত্য বলবে – এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। মিথ্যে বলছেন এমন অনুমানেরও প্রয়োজন নেই। তবে এটা ভুললে চলবে না, সবচাইতে সৎ ব্যক্তিটিও সে যা ভাবে – আদতে সেটাই বলবে, তা যে মাত্রার সুস্থই হোন কিংবা পাগল হোন। তা সত্য হতেও পারে, আবার নাও পারে। কাজেই, কী বলেছে সেটা দেখার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে – কীভাবে বলছে? তার আচরণ, অভিব্যক্তি তার নিজের ব্যাপারে কতটা প্রায়োরিটি (Ego) ও তার কতটা চাহিদা (Desire, Expectation, Ambition) প্রকাশ করছে। দেখতে হবে, সম্পর্কের জায়গাগুলোতে সে কতটা সচেতন ও শুদ্ধ। সে তার সম্পর্কগুলোতে ব্যবসায়িক বা লেনদেন-গত সম্পর্ককে অতিক্রম করে কতটা ভালোবাসার সম্পর্ক সংরক্ষণ বা ধারণ করতে পেরেছে।
আরেকটা ব্যাপারে সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে। মানুষের সাথে মানুষ কানেক্টেড থাকবে, জীবন্ত ও শুদ্ধ সম্পর্ক থাকবে – এটাই হচ্ছে স্বাভাবিকতা। এগুলোকে লক্ষণ বিবেচনা করে আবার রেপার্টরি করতে বসবেন না। দেখতে হবে, এটা কী প্রাকৃতিক, সহজাত ও স্বাভাবিক অবস্থায় আছে? নাকি এখানে কোনো প্যাথলজি বা দূষণ সৃষ্টি হয়েছে। তার সম্পর্কগুলো কী সত্যিই ভালোবাসার সম্পর্ক, নাকি স্রেফ কোনো একটা প্রয়োজনের অনুষঙ্গ। বহু প্রয়োজনে মানুষকে বহুজনের সাথে যোগাযোগ করতে হয় এবং যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়; সেগুলো সম্পর্ক নয়। এই সম্পর্কবিহীন যোগাযোগ কোনো অপরাধও নয়। বহু সম্পর্ক হয় কেবল আইন-ভিত্তিক এবং আইনের জোরেই সৃষ্টি হয়। সেটা সমস্যা নয়। কিন্তু সমস্যা সেখানেই ঘটে – যেখানে স্বাভাবিক বা সঠিক সম্পর্কের জায়গাটিতে উদাসীনতা বা বাড়াবাড়ির সঞ্চার হয় বা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়। সেটাই এখানে দূষণ, সম্পর্কের ক্ষেত্রে রোগীর কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে কৃত ইঙ্গিত।
আপনি আরো লক্ষ করবেন- অতীতে রোগীর যত রকম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তালিকা আপনি করেছেন, তা আদতে রোগীর ঘরের ও বাইরের এই সম্পর্কগুলোতে প্যাথলজি তৈরি করেছে, বৃদ্ধি করেছে, রোগীর মন বা আবেগে আরো আনুষঙ্গিক বহু লক্ষণের সৃষ্টির কারণ হয়েছে। এভাবে যদি আপনি বিচার করতে পারেন- তাহলে আপনি রোগীর আবেগের জায়গাটিকে বুঝতে পারলেন। কারণ সমস্ত সম্পর্কই রোগীর আবেগের, প্যাশনের সাথে সম্পর্কিত।
সেই সাথে, আপনি এমন বহুজনকে দেখতে পাবেন – যাদের এই কানেকশন শুন্য। তার অতীত জীবনের ঐ সমস্ত ঘটনা-পরিক্রমা, বৈরি অভিজ্ঞতা, তিক্ত স্মৃতি, বিশ্বাসভঙ্গ – তার সেই সম্পর্ক বা কানেকশনগুলোর বাতি একটা একটা করে নিভিয়ে দিয়েছে। তার আবেগ ও অনুভূতি ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে ভোঁতা বা মৃত হয়েছে। আবেগের এই অবস্থাটির একটা সুনির্দিষ্ট নামই হয়েছে “Emotional Death”; যে অবস্থাটির আধুনিক নামকরণ করেছেন- প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস। এটা একটা ভয়ানক প্যাথলজিক্যাল অবস্থা। বহু মানুষ এরকম বা এর কাছাকাছি নেতিবাচক আবেগজনিত স্বাস্থ্য বা অবস্থা মায়াজমেটিক প্রি-ডিজপোজিশন হিসাবে জন্মসূত্রেই লাভ করে বসে আছে। এদের দিয়ে সমাজে সর্বোচ্চ শ্রেণির অনিষ্ট হয়, যাদের মধ্যে বহু ক্যাটাগরির সাইকোপ্যাথ সৃষ্টি হয়।
যাই হোক, এই হচ্ছে সম্পর্কগুলো বিবেচনার ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য। এর বিভিন্ন এক্সপেক্টস নিয়ে কমেন্টবক্সে আলোচনা চলতে পারে। কোনো ব্যাপার না বুঝতে পারলেও, জানাতে অনুরোধ রাখছি; ব্যস্ততার কারণে উত্তর দেরিতে দিতে হলেও, আলোচনা চালিয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ।
ডা. শাহীন মাহমুদ
চিফ ট্রেইনার, হোমিওডাইজেস্ট
ফ্যাকাল্টি-প্রধান, হোমিওডাইজেস্ট রিসার্চ ফ্যাকাল্টি
বাংলাদেশ