17/03/2026
আমি সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা সমালোচনামূলক পোস্ট দিই না। কারণ এখন চারপাশে এত অসংখ্য অসংগতির ঘটনা ঘটে যে—কোনটা রেখে কোনটা বলব! কিন্তু গতকাল একটি ভাইরাল ভিডিও দেখে একজন মা হিসেবে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতে বাধ্য হলাম—আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?
আমাদের সমাজ, আমাদের ধর্ম—সবাই শেখায়, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশ্ত।” কিন্তু সেই বেহেশ্ত কি সব মায়ের পায়ের নিচেই থাকে? ইদানীং দুটি ঘটনা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে।
প্রথমটি—একজন তরুণীর আত্মহনন, যে স্বামীর পরকীয়া সহ্য করতে না পেরে নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে। আমি বারবার ভাবছি—একজন নারী যখন মা হন, তখন তার প্রথম পরিচয় হয়ে যায় “মা”। জীবনে হাজার কষ্ট, হাজার অবিচার থাকতে পারে—কিন্তু সেই কষ্টের ভার কি সন্তানের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়? মাত্র ৫ বছরের সেই কোমল শিশুটিকে সে নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখে ফেলে রেখে গেল। যে শিশুটিকে সে এতদিন পৃথিবীর সব আদর দিয়ে আগলে রেখেছিল, আজ মা হারা হয়ে সে কোথায় যাবে? মা-বাবার ভুলের জন্য কেন তাকে এই অন্ধকার অনিশ্চয়তার রাজ্যে নিক্ষিপ্ত হতে হলো? পৃথিবীর কোনো দুঃখ-কষ্টই একজন মাকে সেই অধিকার দেয়নি যে, সে তার মাতৃত্বের দায়িত্ব ভুলে সন্তানকে এভাবে ফেলে চলে যাবে।
আরেকটি ঘটনা—গতকাল দেখলাম একজন মা তার মাত্র দুই মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে রেখে নিজের ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটে গিয়েছিলেন। তিন বছর পর ফিরে এসে সেই আবেগঘন মুহূর্তকে “সাক্রিফাইস” হিসেবে দেখিয়ে তিনি ভাইরাল হলেন। কিন্তু আমার ভেতরে প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়ে উঠছে—আহা, এই দীর্ঘ তিনটি বছর সেই মাসুম বাচ্চাটা কী পরিমাণ কষ্ট পেয়েছে! এই যে শিশুটি মাতৃত্বের মমতা থেকে বঞ্চিত হলো, তার সাথে ঘটে যাওয়া এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ভাষা তো শিশুটির নেই, সমাজেরও নেই। একটি নিষ্পাপ শিশুর স্রষ্টা প্রদত্ত অধিকার—মায়ের দুধ, মায়ের গন্ধ, মায়ের স্পর্শ—সেই অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা কি কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে? ওই বয়সে একটি শিশুর অধিকার ছিল মায়ের বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা, তার শরীরের প্রতিটি স্পন্দনে মিশে থাকা।
আমরা অনেক সময় ভুলে যাই—সন্তানের হক থেকে তাকে বঞ্চিত করা কোনো স্বাধীনতা নয়, এটি এক ধরনের চরম অন্যায়। আমি জানি, নারীদের জীবন সহজ নয়। বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, দাম্পত্য—অনেক সংগ্রাম, অনেক অবহেলা আর নির্যাতন সহ্য করতে হয়। তবুও, একজন মা হিসেবে আমার সব মায়েদের প্রতি বিনীত অনুরোধ—আপনার কষ্ট যত বড়ই হোক, আপনার সন্তানের অধিকার যেন তার চেয়েও ছোট না হয়ে যায়।
মনে রাখবেন—জীবন থেমে থাকে না। সন্তান বড় হয়ে যাবে, সময় আবার আপনার হাতে ফিরে আসবে। তখন আপনি চাইলে আবার নতুন করে নিজের স্বপ্ন সাজাতে পারবেন। কিন্তু সন্তানের শৈশব—বিশেষ করে জীবনের প্রথম দুই বছর—এই সময়টা আর কখনো ফিরে আসবে না। এই সময়েই একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, তার আবেগ, তার নিরাপত্তাবোধ—সবকিছুর ভিত্তি গড়ে ওঠে। সে মায়ের গন্ধ চিনতে শেখে, মায়ের কণ্ঠে শান্তি খুঁজে পায়। এই স্মৃতিগুলোই তার জীবনের আসল ভিত।
আমরা অনেক সময় ভাবি—দামী স্কুল, ব্র্যান্ডের পোশাক, ভালো খাবার—এসব দিয়েই সন্তানকে “ভালো মানুষ” বানানো যায়। কিন্তু সত্য হলো—সন্তান মানুষ হয় মায়ের সান্নিধ্যে, মায়ের মমতায় আর পরিবারের মূল্যবোধে। আজ যারা সন্তানকে সময় দেয় না, কাল সেই সন্তানের কাছ থেকে সময় না পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমরা প্রায়ই সন্তানের উপর দোষ চাপাই, কিন্তু ভুলে যাই—তার শিকড়টা আমরা কেমন করে গড়ে দিয়েছিলাম।
শেষ কথা—যদি আপনি সেই সৌভাগ্যবতী নারী হন, যাকে স্রষ্টা একটি সন্তানের দায়িত্ব দিয়েছেন, তবে সেই আমানতের খেয়ানত করবেন না। তার জীবনের প্রথম দিনগুলোতে তাকে আপনার ভালোবাসা, আপনার ছোঁয়া, আপনার উপস্থিতি দিন। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে কেউ কর্পোরেট টাইটেল মনে রাখে না—মানুষ খোঁজে তার আপনজন, তার সন্তান আর তার পরিবারকে।
পরম করুণাময় সকল মায়ের কষ্টকে প্রশান্তিতে রূপান্তর করুন, আর আমাদের সবাইকে সঠিক বোধ ও দায়িত্ববোধ দান করুন।