15/01/2026
প্রথমেই বলে দেই, এই পোস্টটি পড়ে আমাকে আবার কেউ ইরান প্রেমী ভেবে বসবেন না। কিন্তু এই পোস্টটি দ্বারা আমি একটি বিশেষ দিকে ইঙ্গিত করতে চাই। আশা করছি অনুসন্ধিৎসু পাঠকরা বুঝতে সক্ষম হবেন।......
👉সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের সাক্ষরতার হার প্রায় ৮৫.১ শতাংশ (২০২৩)।
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার প্রায় ৯৮.৯ শতাংশ (২০২২),
পরিষ্কারভাবে দেখায় যে নতুন প্রজন্মের নারীরা শিক্ষা নিয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং সুযোগও পাচ্ছে।......
👉চিকিৎসা ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগতি আরও চোখে পড়ার মতো। ১৯৭৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ইরানে মোট মেডিকেল স্পেশালিস্টের সংখ্যা বেড়েছে ৩৩২ শতাংশ।
কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধিটা ছিল অবিশ্বাস্য—নারী মেডিকেল স্পেশালিস্টের সংখ্যা বেড়েছে ৯৩৩ শতাংশ।
শুধু তাই নয়, সক্রিয় চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা যেখানে মোটামুটি ৩৩২ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে সক্রিয় নারী বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বেড়েছে ১০০০ শতাংশেরও বেশি ¹। এটা থেকেই বোঝা যায় স্বাস্থ্যখাতে নারীরা কত দ্রুত ও শক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে।.......
👉বিশ্ববিদ্যালয় আর বিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলেও চিত্রটা একই রকম। বর্তমানে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী।
STEM (Science, Technology, Engineering, or Mathematics) বিষয়গুলোতেও নারীদের আধিপত্য চোখে পড়ে—প্রায় ৭০ শতাংশ STEM গ্র্যাজুয়েটই নারী
²। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে গবেষণার সুযোগ সীমিত হলেও, পড়াশোনা আর বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণে নারীদের অংশগ্রহণ থেমে থাকেনি।......
👉মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখায় (সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রায় ৪৬-৪৬.১%)।.....
👉সবচেয়ে চমকে দেওয়ার বিষয়টা আসে পারমাণবিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের প্রায় ৪০ শতাংশই নারী ³। তুলনা করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক গড় মাত্র ২২.৪ শতাংশ। ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান নিজেই এই সংখ্যাকে “অবিশ্বাস্য” বলে উল্লেখ করেছেন। এত স্পর্শকাতর ও উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে নারীদের এমন অংশগ্রহণ সত্যিই ব্যতিক্রমী।.....
👉সব মিলিয়ে বলা যায়, নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ইরানে নারীরা শিক্ষা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা এমনকি পারমাণবিক গবেষণার মতো জটিল ক্ষেত্রেও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
তবুও প্রচার করা হয় ইরানে নারীর কোন স্বাধীনতা নেই। শিক্ষা, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র এগুলি দ্বারা নারী স্বাধীনতা মেজার করা হয় না.. ইরানে নারীদের পাবলিক প্লেসে এক বিশেষ ধরনের হিজাব পড়তে হয়.. আর এটার নামই নাকি পরাধীনতা.. এক আজব এই স্ট্যান্ডার্ড।......
👉আমি উপরে ইরানের নারীদের শিক্ষা, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পারমানবিক বিজ্ঞানে যে অবদানগুলি রাখলাম এগুলিকে পশ্চিমারা মোটেই সেলিব্রেট করে না। বরং সেলিব্রেট করা হয় ওয়েস্টার্ন পোশাক পরা ইরানি মহিলাদের প্রোটেস্টের বিভিন্ন পোস্ট। সম্প্রতি একটি ছবি বিশেষ করে ভাইরাল হচ্ছে যেখানে এক ইরানি তরুণী খোমেনীর ফটোতে আগুন ধরিয়ে সেই আগুন দ্বারা সিগারেট জ্বালাচ্ছেন। এটার নাম দেওয়া হয়েছে "বোল্ড প্রোটেস্ট"। আর এটাই নাকি নারীদের প্রকৃত স্বাধীনতা। সত্যি কি আজব স্ট্যান্ডার্ড।.......
👉এই সিগারেট জ্বালানোর ছবিটি দেখে একটি আর্টিকেলের কথা মনে পড়ে গেল। এটা বহুদিন আগে পড়েছিলাম। হুসাইন শাকিলের লেখা 'Illusion of choice'। সেই আর্টিকেলের ই সারাংশ নিচে উল্লেখ করছি।.......
👉১৯২০ সালের দিকে আমেরিকায় মেয়েদের প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়া খুবই খারাপ চোখে দেখা হতো। তখন আমেরিকান টোবাকো কোম্পানির প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ হিল ভাবলেন—মেয়েরা যদি সিগারেটই না খায়, তাহলে তো বিশাল একটা মার্কেট হাতছাড়া। তাই তিনি ডাকলেন এডওয়ার্ড বার্নেসকে, যিনি আবার সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ভাতিজা। বার্নেস ফ্রয়েডের তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে প্রথমে বললেন সিগারেট নাকি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, ওজন কমায় ইত্যাদি।.......
👉পরে আরও চালাক একটা আইডিয়া বের করলেন—সিগারেটকে বানালেন “নারী স্বাধীনতার প্রতীক”। ১৯২৯ সালে ইস্টার প্যারেডে কিছু মেয়েকে সিগারেট খেতে খেতে হাঁটালেন, সাংবাদিক ডাকলেন, আর পরদিন পত্রিকায় শিরোনাম উঠল—মেয়েরা স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে সিগারেট খাচ্ছে। ব্যস, মেয়েদের মধ্যে সিগারেট খাওয়া হু হু করে বেড়ে গেল।........
👉এই অভিজ্ঞতা থেকেই বার্নেস লিখলেন Propaganda বইটা। সেখানে তিনি দেখালেন কীভাবে মানুষের চাহিদা, ভাবনা আর মতামতকে অজান্তেই একটা নির্দিষ্ট দিকে ঘোরানো যায়। তার মতে, সমাজে একদল অদৃশ্য মানুষ আছে যারা এসব কৌশল দিয়ে আসলে দেশ চালায়। রাজনীতি থেকে ব্যবসা—সব জায়গাতেই এই “প্রোপাগান্ডা” অবধারিত।......
এই এডওয়ার্ড বার্নেস কে জানেন? তাকে আজও “Father of Public Relations” বলে অভিহিত করা হয়। ভাবুন আর বোঝার চেষ্টা করুন প্রোপাগান্ডা কিভাবে কাজ করে এবং নিজের পরিবারের মহিলাদেরকেও সজাগ করুন।........
=======================
রেফারেন্স:
1. Arch Iran Med, Volume 23, Issue 7, July 2020, Page: 473
2. A/HRC/59/NGO/264 General Assembly- United Nations
3. Article: Islamic Revolution at 45: Iranian women rise and shine in different fields, Written by Humaira Ahad, Press TV
4. Propaganda, Book by Edward Bernays
লেখা:- মহঃ সাহিল খাঁন.