19/05/2026
আমরা যখন অসুস্থ হই, তখন আমাদের প্রথম চিন্তাটাই থাকে নিশ্চয়ই কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হয়েছে, আবহাওয়া পরিবর্তন হচ্ছে কিংবা ধকল বেশি গেছে। কিন্তু আমরা প্রতিদিন প্লেটে কী তুলে নিচ্ছি, সেটা যে আমাদের প্রতিদিনের শারীরিক অস্বস্তির প্রধান কারণ হতে পারে, এই সত্যটা আমরা অনেকেই এড়িয়ে যাই। মাথাব্যথা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, ক্লান্তি বা জয়েন্টে ব্যথার মতো দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে আমরা স্রেফ সাধারণ অসুস্থতা ভেবে ওষুধ খেয়ে চেপে রাখি। অথচ, একটু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই সমস্যাগুলোর সিংহভাগেরই সুতো বাঁধা রয়েছে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের সাথে।
মানুষ সাধারণত যেকোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক ফলাফল খুঁজতে অভ্যস্ত। যেমন আঙুলে সুই ফুটলে সাথে সাথে ব্যথা লাগে, তাই আমরা সাবধান হই। কিন্তু খাবারের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন হয় না (যদি না তীব্র ফুড পয়জনিং বা অ্যালার্জি থাকে)। অতিরিক্ত চিনি, রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট বা প্রসেসড ফুড খাওয়ার সাথে সাথেই কেউ অসুস্থ হয় না। এই খাবারগুলো শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে সাইলেন্ট ইনফ্লামেশন তৈরি করে। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই ইনফ্লামেশন একসময় আর্থ্রাইটিস, ক্রনিক ফ্যাটিগ (দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি) বা অস্টিওপরোসিসের মতো জটিলতায় রূপ নেয়। যেহেতু প্রক্রিয়াটি ধীরগতির, তাই মানুষ বুঝতেই পারে না ৫ বা ১০ বছর আগের খাদ্যাভ্যাস আজকের এই ব্যথার জন্য দায়ী। ফুড অ্যালার্জি মানুষ সহজেই বুঝতে পারে কারণ এর প্রতিক্রিয়া তীব্র হয় (যেমন: চিংড়ি খেলে শরীর চুলকানো বা শ্বাসকষ্ট হওয়া)। কিন্তু ফুড ইনটলারেন্স বা খাবারের অসহনশীলতা ধরা কঠিন। গ্লুটেন (গমজাত খাবার) বা ডেইরি (দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার) অনেকের শরীর ঠিকঠাক হজম করতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়া খাবার খাওয়ার সাথে সাথে না হয়ে কয়েক ঘণ্টা বা এমনকি ২-৩ দিন পর দেখা দিতে পারে। ততক্ষণে মানুষ অন্য অনেক কিছু খেয়ে ফেলে, ফলে ঠিক কোন খাবারের কারণে শরীর খারাপ লাগছে (যেমন: পেট ফাঁপা, জয়েন্ট পেইন বা ব্রেইন ফগ), তা চিহ্নিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের অন্ত্র বা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টকে বলা হয় শরীরের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক (Second Brain)। অন্ত্রে কোটি কোটি অণুজীব বা মাইক্রোবায়োম থাকে, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ করে। আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার বা ফাস্টফুড এই ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এর ফলে যখন মুড সুইং, বিষণ্ণতা, বা তীব্র ক্লান্তি দেখা দেয়, মানুষ সেটাকে মানসিক চাপ বা কাজের চাপ মনে করে। অথচ মূল সমস্যাটি হয়তো তৈরি হচ্ছে তাদের হজম প্রক্রিয়ার অব্যবস্থাপনা থেকে।
আজকের দিনে সামান্য বুক জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টাসিড বা পেইনকিলার খাওয়া একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ওষুধগুলো সাময়িকভাবে লক্ষণটি (Symptom) কমিয়ে দেয়, কিন্তু সমস্যার মূল কারণ (Root Cause) দূর করে না। অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা ভাজাপোড়া খাওয়ার কারণে মাথাব্যথা হলে, মানুষ একটা পেইনকিলার খেয়ে নেয়। এতে শরীর যে সংকেত (Signal) দিচ্ছিল যে খাবারে গড়বড় আছে, তা চাপা পড়ে যায়। ফলে খাদ্যাভ্যাস বদলানোর প্রয়োজনীয়তা মানুষ আর অনুভব করে না।
তাই সুস্থ থাকতে হলে শরীরের ভেতরের সংকেতগুলো বুঝতে হবে। প্রতিদিন কী খাচ্ছেন এবং তার কয়েক ঘণ্টা পর শরীর কেমন আচরণ করছে, সেদিকে নজর দেওয়া শুরু করুন। রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপটি শুরু হয় আপনার রান্নাঘর থেকেই।
ডাঃ মোঃ আবদুল্লাহ ইউসুফ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ইউএসএ