27/02/2025
#ইসলাম_ও_মেডিকেল_সাইন্সের_আলোকে_প্রেগন্যান্সিতে_রোজা_রাখার_বিধান*
প্রশ্ন : ১. গর্ভবতী মহিলা কি রোজা রাখতে পারবে কিনা?
২. রোজা না রাখলে পরবর্তী কি করবে?
৩. একজন ডাক্তার হিসাবে কোন গর্ভবতী মহিলাকে রোজা রাখা /না রাখার বিষয় কিভাবে কাউন্সেলিং করবেন?
রোজার ইসলামের ২য় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ , মহান আল্লাহ পবিত্র রমাযান মাসে রোজা রাখাকে ফরজ করেছেন।
তিনি বলেন- রোজার ফরজ হওয়া সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের আয়াত:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
🔹 বাংলা অনুবাদ: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” 📖 (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩
অসুস্থ ব্যক্তির রোজা ভাঙ্গার অনুমতি সম্পর্কে আয়াত:
১. আল্লাহ বলেন:
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
🔹 বাংলা অনুবাদ: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অসুস্থ বা সফরে থাকে, সে অন্য দিনে রোজা পূরণ করবে।” 📖 (সূরা আল-বাকারা: ১৮৪)
২. দ্বিতীয় আয়াত:
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
🔹 বাংলা অনুবাদ: “আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অসুস্থ কিংবা সফরে থাকে, সে অন্য দিনে রোজা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তিনি তোমাদের জন্য কষ্ট চান না।” 📖 (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)
ইসলাম সহজ ধর্ম, একজন অসুস্থ ব্যক্তি উপর ইসলাম জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়না-
তাই মহান আল্লাহ অসুস্থ ব্যাক্তির জন্য যার পক্ষে রোজা রাখা কষ্টকর, তাকে রোজা ভাঙার অনুমতি দিয়েছেন। সেই ব্যক্তি সুস্থ হলে রোজা রাখবে, কিন্ত সুস্থ হলেও যদি রোজা রাখতে অসুবিধা হয়, তাহলে প্রতি রোজার পরিবর্তে একজন অসহায় মিসকিন কে দুই বেলা করে খাবার দিবে।
আয়াত:
وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ
বাংলা অনুবাদ:
“আর যারা রোজা রাখতে সক্ষম, কিন্তু কষ্ট সহ্য করতে হয়, তাদের জন্য এর পরিবর্তে এক দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান (ফিদইয়া) করা বিধান রয়েছে।” 📖 (সূরা আল-বাকারা: ১৮৪)
এবার আসি, প্রেগন্যান্ট মহিলাদের আলোচনায় -
যেহেতু পবিত্র কোর'আনে মহান আল্লাহ সকল সুস্থ মানুষকে রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন, তাই প্রেগন্যান্সিতে যদি গর্ভবতী মা নিজের কিংবা বাচ্চার কোনো ক্ষতি হবার আশংকা না করে, তাহলে তার উপর রোজা রাখা আবশ্যক হবে। আর যদি বাচ্চার ক্ষতি হবার আশংকা করে, তাহলে রোজা না রাখার অনুমতি আছে।
প্রথমে আমরা এই বিষয় ইসলামের বিধান দেখে নিই-
হযরত রাসূল কারীম (সা:) বলেন-
إن الله وضع عن المسافر شطر الصلاة، وعن المسافر والحامل والمرضع الصوم
অনুবাদ
মহান আল্লাহ মুসাফির, গর্ভবতী মহিলা ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য রোজার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দিয়েছেন (তিরমিজি ৭১৫, নাসাই শরীফ)
অর্থাৎ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কুদামা ও অন্যান্য ফকীহ গন বলেছেন, সে পরিপূর্ণ সুস্থ থাকলে, এবং নিজের কিংবা বাচ্চার ক্ষতির কোন আশংকা না করলে রোজা রাখবে, আর যদি নিজের কিংবা বাচ্চার ক্ষতির আশংকা করে, তাহলে গর্ভবতী অবস্থায় রোজা না রেখে পরবর্তীতে কাযা আদায় করবে।
এই হাদীসে যদিও অসুস্থ অবস্থায় রোজা না রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তথাপি অনেক গর্ভবতী মা রোজার সময় রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এবং রোজা না রাখা তাদের জন্য সাইকোলজিক্যাল ট্রমার কারণ হয়ে যায়, তাই এমন একজন গর্ভবতী মা যদি রোজা রাখা/ না রাখার বিষয় পরামর্শ চায়, তাহলে ডাক্তার হিসাবে কিভাবে পরামর্শ দিবেন?
প্রথম কথা হচ্ছে প্রেগন্যান্সিকে আমরা প্রথমত দুইভাগ ভাগ করবো,
1.
pregnancy with pre existing Disease or High risk pregnancy :
কোন প্রেগন্যান্ট মহিলার যদি ডায়াবেটিস থাকে, কিংবা উচ্চ রক্তচাপ কিংবা নিম্ন রক্তচাপ, তাহলে তিনি হাই রিস্ক ক্যাটাগরিতে পড়বেন, তার জন্য রোজা রাখা বাচ্চার জন্য /এবং নিজের জন্য ঝুঁকি হতে পারে, তিনি পবিত্র কোর'আনের সুরা বাকারা ১৮৪ নং আয়াত অনুযায়ী রোজা রাখবেন না, বরং পরে কাযা আদায় করবেন। রোজায় গর্ভবতী মহিলাদের ডায়াবেটিস ঔষধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয়না, কারণ যখন খালি পেটে থাকবে, তখন লিভারে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ভেঙ্গে গ্লুকোজ তৈরি হতে থাকবে, আর তা persistent blood glucose বাড়িয়ে রাখবে৷ আর প্রেশার বেশি থাকলে Pre eclampsia ঝুকি থাকে, প্রেশার কম থাকলে placental blood flow কমে বাচ্চা পুষ্টি পাবেনা, তাই adequate hydration maintain এর জন্য ইসলাম তাকে রোজা না রাখার অনুমতি দিয়েছেন৷ সেখানে আবেগ দেখাতে গিয়ে নিজের /বাচ্চার ক্ষতি করে রোজা রাখা তাকওয়ার মধ্যে পড়বেনা।
২। যেসব প্রেগন্যান্ট মহিলার আগে miscarriage এর হিস্ট্রি আছে, কিংবা preterm delivery হিস্ট্রি আছে,কিংবা pre eclampsia or eclampsia হিস্ট্রি আছে, তারা হাই রিস্ক ক্যাটাগরিতে পড়বে, তাদের কে রোজা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে।
৩। যেসব প্রেগন্যান্ট মহিলা malnutrition এ কিংবা মডারেট এনিমিয়াতে তে আছেন, তাদের কে রোজা না রাখার পরামর্শ দেওহা হবে
মূলকথা প্রেগন্যান্সির সাথে অন্য কোন কো এক্সিস্টিং ডিজিজ থাকলে রোজা রাখবেনা, এমন কি UTI হলেও রোজা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে।
এখন আসুন- কোন প্রেগন্যান্ট মহিলা, যার কোন pre-existing disease নাই, কিংবা যে পরিপূর্ণ সুস্থ, তার ক্ষেত্রে করনীয় কি?
এই মহিলাদের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় বিবেচনীয়-..
১. First trimeter :
এই সময় টা হচ্ছে অর্গানোজেনেসিসের সময়, প্রেগন্যান্সির প্রথম ১২ সপ্তাহ, এই সময় বাচ্চার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ / অর্গান তৈরি হয়, এই সময় বাচ্চার মায়ের পরিপূর্ণ পুষ্টিতে থাকা উচিৎ, একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা যদি দিনের বেলায় রোজা রাখে, আর রাতে তার দৈনিক প্রয়োজনীয় খাবার খেতে না পারে, তাহলে সে রোজা রাখবেনা, প্রথম ১২ সপ্তাহ সব প্রেগন্যান্সিতে কিছু কমন সমস্যা থাকে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে morning sickness, Anorexia, Nausea, Vomiting. তাই Nausea/Vomiting থাকলে রোজা রাখবেনা এইটা স্পষ্ট - Anorexia থাকে সাধারণত, এখন একজন নন প্রেগন্যান্ট সুস্থ মানুষের anorxia মানে খাবার রুচি না থাকলে কোনো সমস্যা নাই, কিন্ত একজন প্রেগন্যান্ট মহিলার anorexia থাকলে তা বাচ্চার প্রতি প্রভাব ফেলবে, কারণ anorexia এর কারণে শুধু রাতের বেলায় তার পরিপূর্ণ ক্যালরি মেইন্টেইন করা সম্ভব হবেনা, সেজন্য first trimeter এ রোজা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে।
2nd Trimester :
সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে healthy pregnant যারা আছেন, অর্থাৎ যাদের কোন bad obstetric history নাই, তারা রোজা রাখতে পারেন- তবে সেই ক্ষেত্রে বডি ওয়েট অনুযায়ী এবং দিনে যতটুকু ক্যলরি দরকার, তা রাতে খেতে হবে, তার ক্ষেত্রে রোজা সংযমের মাস, তাই রাতে কম কম খেয়ে পুষ্টি হীনতায় ভুগবে, এমন চিন্তা করা যাবেনা, বরং সে রোজার আগে যে পরিমান খাবার খেতে সারাদিনে, তা রাতের বেলায় খাবে, দুই থেকে আড়াই লিটার পানি রাতের বেলায় পান করা ensure করবে। সন্ধ্যায় ও ভোর বেলায় ভালোভাবে খেতে হবে। কেউ যদি adequate hydration maintain করতে না পারে, রাতের বেলায় ইফিতারি থেকে নিয়ে সেহরী পর্যন্ত দুই আড়াই লিটার পানি খেতে না পারে, তাহলে তার জন্য রোজা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে।
সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে রোজা শুরুর পর Dizziness, vertigo হচ্ছে কিংবা অনেক বেশি দূর্বল লাগতেছে, রোজা ভেংগে ফেলবে, এবং পরবর্তী দিন থেকে রোজা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে।
সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে রোজা শুরুর আগে blood pressure চেক করবেন, আর রোজা শুরুর পর দিনের বেলায় আবার প্রেশার চেক করবেন, যদি দেখেন, প্রেশার আগের থেকে কমে গেছে, তার মানে proper hydration maintain হচ্ছেনা, রোজা ভাঙার পরামর্শ দিবেন, এবং রোজা না রাখার পরামর্শ দিবেন।
সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে 20-24 weeks এর মধ্যে থেকে fetal movement পাওয়া যায়, যদি রোজা শুরুর পর বাচ্চার নড়াচড়ার পরিমান আগে থেকে কমে যাচ্ছে মনে হয়, তাহলে রোজা না রাখার পরামর্শ দিবেন, প্রেগন্যান্ট মহিলাকে এইটা ভালো ভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। আর যদি ফিটাল মুভমেন্ট ঠিক থাকে, তাহলে রোজা রেখে যাবে, কিন্ত রোজা রাখতে যদি কষ্ট হয়, তাহলে ভাঙ্গার অনুমতি আছে।
3rd Trimester :
3rd Trimester মানে ২৮ সপ্তাহ থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত সময়, এই সময়টাতদ বাচ্চার সব অঙ্গ প্রতঙ্গের পরিপূর্ণতা পায়, তাই এই সময় রোজা রাখতে চাইলে সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারের বিষয় গুলি চিন্তা করবে, প্রতিদিন extra 450 calory তথা এক কাপ ভাত/এক পিস মাছ বেশি খাবে, আর পর্যাপ্ত পানি খাবে। যদি খাবার খেতে না পারে, রাতের বেলায় ২ লিটার পানি খেতে না পারে, তাহলে রোজা রাখবেনা।
উপরের সব আলোচনার সারকথা হচ্ছে- ১.প্রেগন্যান্ট মহিলার কোন অসুস্থতা থাকলে রোজা রাখবেনা.
২. প্রেগন্যান্ট মহিলা সুস্থ, কিন্ত Anorexia কারনে পর্যাপ্ত খেতে পারেন না, তিনি রোজা রাখবেন না। ৩. রোজা রাখার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা অনেক দূর্বল লাগলে রোজা রাখা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে মনে হলে রোজা ভেংগে ফেলবে ৪. যারা রোজা রাখবে, তারা প্রতিদিন ২ গ্লাস দুধ, দুই বেলা খাবার, ৮ গ্লাস পানি, মাছ/মাংস সবজি ইত্যাদি পর্যাপ্ত পরিমানে খেতে হবে।
মনে রাখবেন, মহান আল্লাহ আমাদের জন্য কষ্টকর কোন বিধান চাপিয়ে দেন নাই, যেখানে বিধান আছে, সেখানে অল্টারনেটিভ রাস্তাও তিনি বলে দিয়েছেন।
সিনারিও: ৮৪
রাবেয়া ৭ সপ্তাহের প্রেগ্ন্যাসি নিয়ে আসছে, তার ব্লাড প্রেশার 90/60 এমন থাকে, তার কোনো ডায়াবেটিস নাই, তার শরীর অনেক দূর্বল, তিনি রোজা রাখার ব্যাপারে আপনার কাছে পরামর্শ চাচ্ছেন, ইসলাম ও মেডিকেল সাইন্সের আলোকে তাকে কিভাবে পরামর্শ দিবেন?
সিনারিও ৮৫: ১৬ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট মহিলা, যার আগে ২ টা miscarriages ও একটা pre term delivery এর হিস্ট্রি আছে, তিনি রোজা রাখার জন্য পরামর্শ চাচ্ছেন, তাকে কিভাবে পরামর্শ দিবেন?
সিনারিও :৮৫
জমিলা ৩২ বছর বয়স, ২২ সপ্তাহ প্রেগন্যান্ট, ওনার সমস্যা হচ্ছে GDM controlled By Metformin, রোজার পরামর্শ চাচ্ছে, কিভাবে পরামর্শ দিবেন?
আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুন, সুস্থ রাখুন।
Dr Ismail Azhari
MBBS, MRCP part-1 (UK)
Masters in Hadith (Darul Uloom Hathazari)
Faculty of Islamic science :Al Azhar University
Founder : CCR Academy