01/02/2026
কলম: Manira Sultana Papri
একবার ভাবুন তো, প্রেগনেন্সির পুরো সময় আপনাকে বিছানায় শুয়ে কাটাতে হচ্ছে, খাওয়া, প্র স্রাব,পায়খা*না, সব করতে হচ্ছে বিছানায়, একবার ভাবুন সে কষ্ট কত তীব্র। হ্যাঁ এভাবেই কাটছিলো দুর্ভাগা মেয়েটির প্রেগনেন্সি
পিরিয়ড। আহারে মা। মায়েরা কিনা করে একটা সন্তানের জন্য।
একবার ভাবুন একটা মেয়ে মা হতে গিয়ে কি স্যাক্রিফাইস করে। একবার ভাবুন তারপরও যদি সে তার সন্তানকে না বাঁচাতে পারে এবং নিজেকে না বাঁচাতে পারে, তাহলে তার মতো অসহায় আর কে আছে?
মৃত বাচ্চা পেটে নিয়ে যদি আট ঘন্টা লেবার রুমের ঠান্ডা জায়গায় পড়ে থাকতে হয় একা। অসহায়। নিজের সাথে কি ঘটতে যাচ্ছে না জানা, না বুঝতে পারা মানুষটার অবস্থা একটু ভাবুন।
না জানি কত স্মৃতি তার মনে পড়েছে। না জানি কত ভয় তার লেগেছে। না জানি সে কত কথা বলতে চেয়েছে। হয়তো কয়েক মিটার দূরেই ওয়েটিং রুমে তার হাজবেন্ড বসা,সে জানে,কিন্তু তার সাথে কথা বলবার মতো
সুযোগ সে পায়নি।
শুনেছি মৃ ত্যুর আগে নাকি মানুষের চোখের সামনে সারাটা জীবন ভেসে ওঠে। ডোরার চোখে কি ভেসে উঠেছিল সেদিন? কোনদিন কেউ জানবে না।
মেয়েটার নাম ছিলো ডোরা। একদিন আগেও যে স্বপ্ন দেখছিল তার কোল জুড়ে সন্তান আসবে, আজকে সে সন্তানও
মৃ ত।
সেও মৃ ত। ডোরা আর কোনদিন এভাবে হাসবেনা।
ডোরা তার সন্তানকেও রেখে যেতে পারলো না।
ডোরা আমার এক্স কলিগ এবং বন্ধু ডোনার ছোট বোন।
সে নিজেও একজন ডাক্তার।
Dr. Chand Sultana Dora
MBBS, Khulna Medical College (Batch K-19)
Aspiring Pulmonologist,BMU
কি হয়েছিলো সেদিন ডোরার সাথে??
আমি এখানে ডোরার বন্ধু PG তে যে একজন গাইনী ডাক্তার ড: মহুয়া পারভীনের বক্তব্যটাই আমার ভাষায় তুলে ধরলাম।
Khulna Medical College K19 batch-এর চাঁদ সুলতানা ডোরা।
২৯ সপ্তাহের প্রেগন্যান্সি ছিল। ঘটনার দিন রাতে প্রায় এগারোটার দিকে ডোরা তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ফোন করে জানায়—বিকেল থেকে সে বেবির নড়াচড়া ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে সে খুব উদ্বিগ্ন ছিল এবং অনুরোধ করে যেন কেউ এসে দেখে।
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সেই বন্ধু ডোরার বাসায় পৌঁছায়। স্টেথোস্কোপ ও ডপলার—দুটো ব্যবহার করেও fetal heart beat পরিষ্কারভাবে ট্রেস করা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ডোরাকে দ্রুত Bangabandhu Sheikh Mujib Medical University (BMU)-এর fetomaternal department-এ নিয়ে যাওয়ার।
BMU-তে ২৯ সপ্তাহের গর্ভকাল বিবেচনায় CTG খুব reliable না হলেও ডপলার দিয়ে হার্টবিট কনফার্ম করার চেষ্টা করা হয়। একবার হার্টবিট প্রায় ১৩০ bpm দেখালেও এরপর আর স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি।
এর কিছুক্ষণ পর ডোরার শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়। তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর সে বমিও করে। তখন জানানো হয় ইমার্জেন্সি আল্ট্রাসাউন্ড করা দরকার, যা স্কয়ার হাসপাতালে করা হবে। ডোরার হাজবেন্ডের সঙ্গে তাকে স্কয়ারের উদ্দেশে রওনা করানো হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে ডোরার হাজব্যান্ড, তিনি নিজেও একজন ডাক্তার
Dr. Nazrul Islam Ranju.
MS. BSC in Orthopedic, BMU.
যাইহোক
রাত প্রায় একটা বাজে। পথে ওই বন্ধু বাসায় ফিরে যায়।
কারণ পর্যন্ত সকালে তার খুব জরুরী একটা ট্রেনিং আছে।
রাত প্রায় দুইটার দিকে ডোরার হাজবেন্ড ফোন করে জানায়—ডপলারে নাকি fetal heart beat পাওয়া গেছে এবং কিছুক্ষণ পর আল্ট্রাসাউন্ড করা হবে। এই খবরের পর সবাই কিছুটা আশ্বস্ত হয়।
কিন্তু তার একটু পরে ফোন করে জানানো হয়—বেবিটি মা রা গেছে। বলা হয়, সকালে ডাক্তার এলে ডেলিভারি করানো হবে। সকালের দিকে কেউ স্কয়ারে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও হাসপাতালের পক্ষ থেকে কাউকে সহজে অ্যালাও করা হচ্ছিল না।
ডোরার বোনের কাছ থেকে জানতে পারি,
মৃত সন্তান পেটে থাকা অবস্থায় ডোরাকে প্রায় ৮ ঘণ্টা লেবার রুমে ফেলে রাখা হয়।
সকাল দশটার দিকে তাকে OT তে নেয়া হয় বাচ্চা ডেলিভার করার জন্য।
দুপুরের দিকে হঠাৎ খবর আসে—ডোরার cardiac arrest হয়েছে দুবার এবং তাকে ICU-তে নেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই জানা যায়—ডোরা আর বেঁচে নেই।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল—এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর কেউ দিতে পারেনি।
ডেলিভারির সময় কী হয়েছিল,
কীভাবে পরিস্থিতি এত দ্রুত মারাত্মক হয়ে উঠল,
কোন পর্যায়ে জটিলতা শুরু হয়—
এসব বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি।
আমরা যারা সাধারন মানুষ আমরা না হয় মেডিকেল টার্ম বুঝবোনা।
হসপিটালে ডোরার হাজব্যান্ড ছিলেন যিনি নিজে একজন স্বনামধন্য ডাক্তার। তিনিও কি বুঝতেন না?
তাকে কেন কোথাও ঢুকতে দেয়া হয়নি?
কেন কিছু এক্সপ্লেইন করা হয়নি?
দুটো প্রাণ এভাবে চলে গেল, এর ক্লারিফিকেশন স্কয়ার হসপিটাল কি দেবে?
কে দায় নেবে মা এবং সন্তানের মৃ*ত্যুর?
অনেকগুলো প্রশ্ন থেকে গেল।
আশা করি স্কয়ারের কাছে এর উত্তর আছে।
এই লেখাটা আমি লিখছি,
আমাদের সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য যারা হসপিটালগুলোতে গিয়ে বলতে গেলে হারিয়ে যান।
কোথায় যেতে হবে কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে,
কোন ওষুধ টা কোথায় পাওয়া যায়, কে ঠিক বলছে
কে ঘোল খাওয়াচ্ছে হসপিটালে?
কে অযথা কতগুলো টেস্ট ধরিয়ে দিচ্ছে, কিংবা অযথা বিভিন্ন ইস্যু দেখিয়ে হসপিটালে হোল্ড করে রেখে
ভিকটিমের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে,
এরকম অসংখ্য কেইস আমরা জানি পরিচিতজনদের ভেতর থেকেই।
একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে কি কোন ভিজিবিলিটি থাকবে না?
মানুষ কখন হসপিটালে যায়?
যখন মানুষ সবচেয়ে অসহায় হয়। যখন মানুষ ভীষণ অসুস্থ হয়। যখন মানুষ মৃ ত্যুর কাছাকাছি যায়,
এরকম ভালনারেবল অবস্থায় মানুষের
কাছ থেকে টাকা আদায় করা বা তাদেরকে হয়রানি করা
কতটা মানবিক?
একজন সাধারন মানুষ বোঝে না বলে তাকে হয়রান করা না হয় সোজা।
কিন্তু যে নিজে একজন ডাক্তার, যার হাজবেন্ড একজন ডাক্তার, যার বন্ধু ডাক্তার, তাদের কাছেও যদি মিনিমাম ভিজিবিলিটি না থাকে,
তাহলে আমার আপনার মত সাধারন মানুষ কতটা নিরাপদ?? আমরা কোন ভরসায় আমাদের প্রাণপ্রিয় মানুষকে হসপিটালে ছেড়ে আসবো?
কিভাবে বুঝব সেই বদ্ধ ঘরে তার সাথে কি ঘটনা ঘটছে??
আমরা যদি হসপিটাল কে ভরসা করতে না পারি তাহলে কাকে করবো ??
প্রশ্ন করুন, প্রশ্ন তুলুন।
আজকে ডোরার সাথে হয়েছে, কাল হয়তো আমার সাথে বা আপনার সাথে হবে।
প্রশ্ন করুন।
স্কয়ারে তো আপনারা ও চিকিৎসা নেন। নিতে যাবেন।
এই ঘটনাটা আপনার মাথায় থাকুক। যাতে আপনার কোন আত্মীয়-স্বজনের সাথে এই ঘটনা না ঘটে।
আপনার একটা শেয়ার বা একটা সচেতনতা হয়তোবা
একটা মূল্যবান প্রাণ বাঁচাতে পারে আপনার আমার কিংবা অন্য কারোর।