22/02/2026
বাংলা ভাষা কোনো স্থবির বা বদ্ধ জলাশয় নয়, বরং এটি একটি প্রবহমান নদীর মতো যা যুগের পর যুগ বিভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের মাতৃভাষার শব্দভাণ্ডারের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে বিদেশি শব্দ। ঐতিহাসিকভাবে ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন সময়ে পারস্য, আরব, তুরস্ক এবং ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আসা মানুষেরা তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে এসেছিলেন। সেই সুবাদে আরবি, ফারসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও ইংরেজি শব্দগুলো আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় এমনভাবে মিশে গেছে যে, সেগুলোকে আজ আর 'বিদেশি' বলে মনেই হয় না।
উদাহরণস্বরূপ, আইন-আদালত বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত 'আদালত', 'নালিশ', 'আইন', 'ফয়সালা' বা 'ইনসাফ' শব্দগুলো মূলত আরবি ও ফারসি থেকে আসা। আবার ধর্মীয় ও আবেগীয় ক্ষেত্রে 'আজাদী', 'জিন্দাবাদ', 'গুনাহ', 'বেহেশত'—এই শব্দগুলো বাঙালির মুখে মুখে ঘোরে। পর্তুগিজরা এ দেশে আসার ফলে আমরা পেয়েছি 'আনারস', 'আলমারি', 'সাবান', 'চাবি'-র মতো অতি প্রয়োজনীয় শব্দ। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় 'অক্সিজেন', 'টেলিফোন', 'কম্পিউটার' বা 'চেয়ার-টেবিল' তো আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শেখায় নিজের ভাষার প্রতি মমত্ববোধ এবং এর স্বকীয়তা বজায় রাখা। তবে এই স্বকীয়তা মানে অন্যকে বর্জন করা নয়। ভাষা বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, কোনো জীবন্ত ভাষা যখন অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণ করে, তখন সেই ভাষার প্রকাশভঙ্গি আরও জোরালো হয়। 'জল' আর 'পানি' যেমন পাশাপাশি থেকে আমাদের তৃষ্ণা মেটায়, তেমনি 'স্বাধীনতা' আর 'আজাদী' শব্দ দুটি আমাদের লড়াইয়ের স্পৃহাকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপন করে। তাই বিদেশি শব্দ ব্যবহারে কোনো হীনম্মন্যতা বা দোষ নেই; বরং এগুলো আমাদের শব্দভাণ্ডারের অলংকার। ভাষার এই বৈচিত্র্যই প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা কতটা উদার এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে।
ডা. তানভীর আহমেদ