03/01/2026
২০২৫ সালেই দেশে অনেক ছাত্র মেডিকেল পড়া ছেড়েছে। একই বছরে আত্মহত্যা করেছেন অনেক চিকিৎসক-ছাত্র। এই সংখ্যাগুলো আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নয়-এগুলো একই সংকটের দুইটি ভিন্ন উপসর্গ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এটাকে কেবল ‘ব্যক্তিগত দুর্বলতা’ বলে এড়িয়ে যাব, নাকি এটাকে একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখব?
চিকিৎসা পেশা কখনোই সহজ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশে এই পেশাটি এখন আর শুধু কঠিন নয়- এটি ক্রমশ অমানবিক হয়ে উঠছে।
এই বছরে কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও জার্মানি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। শুধু এই তিনটি দেশেই নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চিকিৎসকদের জন্য সপ্তাহে দুইদিন বাধ্যতামূলক ছুটি একটি স্বাভাবিক নিয়ম। অন-কল ডিউটি আছে, কিন্তু তার সীমা আছে। ওয়ার্ক আওয়ার নিয়ন্ত্রিত, ওভারটাইমের স্পষ্ট হিসাব আছে, আর তার আর্থিক ও মানসিক ক্ষতিপূরণও নিশ্চিত।
বেতন শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়, এটি সম্মানের প্রতিফলন। ঐ দেশগুলোতে চিকিৎসকদের বেতন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আনুপাতিক, ফলে একজন চিকিৎসককে অতিরিক্ত শিফট বা অনিরাপদ কাজের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় না। এর বিপরীতে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি- দুই ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের বেতন পাশের দেশের তুলনায়ও কম। কর্মঘণ্টা অনির্দিষ্ট, ছুটি অনিশ্চিত, আর কাজের চাপ প্রায় সীমাহীন।
বাংলাদেশে ট্রেইনি চিকিৎসকরা যে ভাতায় কাজ করেন, সেটিকে ভাতা বলা হয় বটে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রতীকী মাত্র। এই বাস্তবতা পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। একজন ট্রেইনি চিকিৎসক দিনে ৮-১২ ঘণ্টা কাজ করেন, জরুরি বিভাগে রোগী সামলান, সার্জারী করেন, ওপিডি-আইপিডিতে রোগী দেখেন, ICU-তে সিদ্ধান্তের ভার নেন, অথচ মাস শেষে যে অর্থ পান, তা দিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন তো দূরের কথা-মৌলিক চাহিদা পূরণও কঠিন। এই ব্যবস্থাকে আমরা বছরের পর বছর ‘ট্রেনিংয়ের অংশ’ বলে স্বাভাবিক করে তুলেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ট্রেনিং কি শোষণের লাইসেন্স? কর্পোরেট হাসপাতালগুলোয় বিশেষ করে এন্ট্রিলেভেলের চিকিৎসকদের অবস্থা শোচনীয়।
অতিরিক্ত কাজ, কম বেতন, সামাজিক অবমূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা- এই চারটি একসাথে মিললে তা কেবল বার্নআউট তৈরি করে না, তৈরি করে গভীর মানসিক সংকট। এতো চিকিৎসকের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল।
আর অনেক শিক্ষার্থীর মেডিকেল ছেড়ে দেওয়া ভবিষ্যতের জন্য আরও ভয়ংকর সংকেত। কারণ চিকিৎসক তৈরি করা যায় বছরে বছরে, কিন্তু একজন ভালো চিকিৎসক তৈরি হয় সময়, অভিজ্ঞতা আর মানসিক স্থিতির সমন্বয়ে।
এদেশে পোস্ট গ্রাড চিকিৎসকদের পাশের নিম্ন হার পৃথিবীর কোনো দেশেই নেই। এসবের জন্য পরীক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয় না- জিজ্ঞেস করা হয় না আপনার আণ্ডারে ট্রেনিং করে কেন (৩-৮)% ছাত্র পোস্টগ্রাডে পাশ করছে? অবস্থা বেগতিক দেখে মেধাবীরা পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে।
নীরবতা কি সমাধান?
এই সংকট নিয়ে নীতিনির্ধারকদের তেমন মাথাব্যথা নেই। তারা বলেন, আমাদের সময় এটা করেছি, সেটা করেছি!
স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার মানে শুধু নতুন ভবন বা যন্ত্রপাতি নয়; সংস্কারের কেন্দ্রে থাকতে হয় মানুষকে- যারা এই ব্যবস্থা চালায়। চিকিৎসক যদি ক্লান্ত, ভীত ও ককর্মক্ষেত্র নিয়ে অনিশ্চিত হন, তাহলে সেই ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না।
চিকিৎসকরা কোনো অতিমানব নন। তারা বিশ্রাম চান, নিরাপত্তা চান, সম্মান চান। এগুলো বিলাসিতা নয়- এগুলো একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ন্যূনতম শর্ত। আজ যদি আমরা এই বাস্তবতা স্বীকার না করি, তাহলে আগামী দিনে প্রশ্ন উঠবে-রোগী থাকবে, হাসপাতাল থাকবে, কিন্তু চিকিৎসক কোথায়?