17/01/2026
আজকে একটু স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লিখব । যে লেখাটা লেখার জন্য গত আড়াই বছর ধরে নিজেকে নিজেই সাহস যোগাচ্ছি । এই সাহস কাউকে দেখে ভয় পাওয়ার জন্য নয় .. মানসিক সাহস !
কারণ যে তিনটা ঘটনা আমি বর্ণনা করব সেই ঘটনা গুলো আমি নিজে সরাসরি দেখেছি ।কাছ থেকে দেখেছি তাদের কষ্ট , মানসিক অস্থিরতা আর অজস্র অশ্রু বিসর্জন । সাথে আমি নিজেও কেঁদেছি , মানসিক অস্থিরতায় বেশ কিছু রাত ঘুমাতে পারিনি । দুঃস্বপ্ন হয়ে তাড়িয়ে বেরিয়েছে ঘটনা গুলো। নিস্ফল আক্রোশে গুমড়ে মরেছি ! কিন্তু করার কিছু কি আদৌ ছিল আমার ? শুধু মানসিক সান্তনা দেয়া ছাড়া ?
ঘটনা এক:
ঘটনাটা আমার এক অফিসের এক নারী শ্রমিকের । সে সময়ে মেয়েটা সাত মাসের গর্ভবতী ছিল । সেই অফিসের ডাক্তার হিসাবে প্রতিটি গর্ভবতী মেয়েকে আমি চিনতাম । তাদের চিকিৎসা , নিয়মিত ফলোআপ , টিকা , মাতৃকালীন ছুটির রিকমেন্ডেশন , এবং ছুটি শেষে ফেরত এলে তাদের ফিটনেস দেয়া সব কিছু আমি নিজেই করতাম । সেই সুবাদে মেয়েগুলোর সাথে আমার বেশ আন্তরিকতা হয়ে যেত ।তারা তাদের জীবনের ছোট ছোট সুখ দুঃখ গুলো আমাকে শেয়ার করতো । আমি শুনতাম , কখনো পরামর্শ দিতাম আবার আজাইরা ছুটি চাইতে আসলে ধমকও দিতাম ।
একদিন সকালে অফিসে বসতে না বসতেই মেয়েটা হুড়মুড় করে আমার চেম্বারে ঢুকল । একটু বিরক্ত হয়ে তাকাতেই দেখি মেয়েটার চোখ মুখ ফোলা , চোখ দিয়ে মনে হচ্ছে এখনি রক্ত পরবে , ক্লান্ত - বিধ্বস্ত একটা বিষাদময় মুখ ! অথচ মেয়েটাকে দুদিন আগেও দেখেছি , সবকিছু স্বাভাবিক ছিল । চোখে প্রশ্ন নিয়ে জানতে চাইলাম - কি হয়েছে ? তোমার এ অবস্থা কেন ?
জবাবে মেয়েটা যা বলল তাতে কেউ বিশ্বাস করুন আর না করুন আমি পর পর চার রাত ঘুমাতে পারি নাই ! মেয়েটার আগে একবার বিয়ে হয়েছিল , সেই ঘরে একটা মেয়ে আছে । বাচ্চা মেয়েটার বয়স এগার বছর । নানীর কাছেই থাকত মেয়েটা । নানী মারা যাওয়াতে বাচ্চা টাকে তিনমাস ধরে নিজের কাছে এনে রেখেছে । একটা ঘরে খাটের উপর থাকে তারা স্বামী - স্ত্রী , নিচে তোষক পেতে মেয়েকে শোয়ায় ।
সারাদিন গর্ভাবস্থায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে রাতে এসে শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে যায় । মনের মধ্যে আশা কিছুদিন পরেই তো মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবে , তখন সাধ মিটিয়ে মেয়েটার সাথে গল্প করতে পারবে ।
কিন্তু গতরাতে বাথরুমে যাবে বলে একা একাই উঠে বাথরুমের লাইট জ্বালাতেই সেই আলোতে দেখে তার স্বামী মেয়ের বিছানায় …..
মেয়েটা ভয়ে কুকড়ে আছে ! আর তার নিজেরই স্বামী নামক জানোয়ারটা বাচ্চা মেয়েটার সাথে …….
চিন্তা করুন তো ঐ মেয়েটার মানসিক অবস্থাটা ! নিজের মেয়ে আবার এদিকে নিজের বর্তমান স্বামী ! যার বাচ্চা সে নিজের জরায়ু তে ধারণ করেছে ।
মেয়েটা সেই অবস্থা দেখে আল্লাহ্ গো বলে একটা চিৎকার দিয়েই অজ্ঞান হয়ে যায় । মাঝরাতে ঐ চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতা কে ভেঙ্গে খান খান করে দেয় !
মেয়েটার বোন পাশের ঘরে থাকতো । সেও একই অফিসে চাকরি করে । বিকট চিৎকারে বোন পাশের ঘর থেকে এসে দরজায় ধাক্কা ধাক্কি শুরু করে । ঐ জানোয়ার স্বামী অবস্থা বেগতিক দেখে দরজা খুলে পালিয়ে যায় ।
তারপর মেয়েটার জ্ঞান আসলে বাচ্চা মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করা হয় - এর আগেও এমন হয়েছে কিনা ! মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলে দেয় সব । গত তিনমাস থেকেই জানোয়ার টা এমন করছে । মেয়েটাকে ভয় দেখিয়েছে - যদি কাউকে বলে তাহলে ওর মাকে মেরে ফেলবে ।
ঘটনা শুনতে শুনতে আমার কেমন যেন বমি পেল । মনে হল আমি এখনি বমি করে ঘর ভাসিয়ে ফেলব । খুব কষ্ট করে বমিটাকে গিলে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম ।
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে জানতে চাইল - ম্যাডাম , এখন আমার মেয়েটা প্রেগনেন্ট হয়ে গেছে কিনা কিভাবে বুঝব ? আরো অন্য কোন সমস্যা হয়েছে কিনা বোঝার কোন উপায় আছে ?
মেয়েটাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলাম । আমার ফোন নাম্বার দিয়ে দিলাম , অসুবিধা হলে যেন যোগাযোগ করে ।
যাবার বেলায় আমাকে করুন গলায় জিজ্ঞেস করল - ম্যাডাম , আমি এখন কি করব ? ঐ শুয়োরের বাচ্চার বাচ্চা আমার পেটে , এটাকে এখন কি করব ?
আমি শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম । এর উত্তর তো আমি জানি না...
ঘটনা ২ :
দিনটি ছিল শনিবার । আমার জন্য বিশাল ব্যস্ততার দিন । অফিসে সেদিন থাকে রোগীদের লম্বা লাইন । সারাদিন বিভিন্ন ঝামেলা সামলিয়ে বিকালে চেম্বারে ঢুকেছি । চেম্বারেও বেশ ভীড় ছিল সেদিন ।আল্ট্রাতে বসেছি । ছয় সাতটা আল্ট্রার পর বোরকা পরা আপাদমস্তক ঢাকা একজন রোগী ঢুকল ।
আল্ট্রা করতে আসছে কিন্তু পেট বের করে না । আমার সিস্টার একদিক দিয়ে কাপড় গুছিয়ে ঠিক করে দেয় আর সে সেকেন্ডের মধ্যে কাপড় নামিয়ে ফেলে । বেশ কয়েকবার এমন হওয়ার পর আমি তাকে বললাম - আপনি আগে কাপড় উঠানোর জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নেন আর আমি বাকি আল্ট্রা গুলি করে ফেলি ।
মেয়েটা দ্রুত উঠে গেল । তারপর আরো ছয় সাতটা আল্ট্রা হয়ে যাবার পর সেই বোরকাওয়ালী আবার ঢুকল ।
আবার রেডি করতে গেলে সেই আগের কাহীনি ।মেজাজ কতক্ষণ ঠিক থাকে ? তাকে বেশ কড়া গলায় বললাম - এমন করছেন কেন ? কী সমস্যা ?
মেয়েটা চুপ। রিসিট টা হাতে নিয়ে দেখলাম তলপেটের আল্ট্রা করতে এসেছে । বয়স দেখলাম চৌদ্দ বছর । পিচ্চি মানুষ বলেই হয়তো এত লজ্জা পাচ্ছে ভেবে সিস্টার কে বললাম ওর সাথে কে এসেছে উনাকে ডাক ।
মেয়েটার মা এসেছে । কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না , অসুস্থ । আল্ট্রা রুমের ভিতরে একটা চেয়ারে তাকে বসতে দিলাম ।
এইটুকু আন্তরিকতায় তিনি কেঁদে ফেললেন । আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম । কাঁদতে কাঁদতে নিজেই বলতে লাগলেন - ম্যাডাম আমার পাকস্থলির ক্যানসার । দুইবার অপারেশন হয়েছে । মেয়েটার ঠিকমত যত্ন করতে পারি না বলে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম । সেখানে আমার নিজের বাবা আমার এই একরত্তি সোনামনিটারে প্রেগনেন্ট করে ফেলেছিল ম্যাডাম !!আমাকে আকারে ইংগিতে মেয়েটা অনেক কিছু বলেছে কিন্তু আমি নিজেই অসুস্থ বলে ওসব পাত্তা দেইনি । ভেবেছি নানীর বাড়িতেই ভাল থাকবে ।আমি আজ আছি কাল নেই ।
অনেক বড় ভুল করেছিলাম .. তার খেসারত দিচ্ছি !
গত সপ্তাহে এমআর করিয়েছি .. আজ দেখতে আসছি কোন অসুবিধা আছে কিনা !
আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম । সেই বমিভাব টা ফিরে এল আবার । মনে হচ্ছিল বমি টা হয়ে গেলে আমার একটু অস্বস্তিটা কমতো !
এই ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের মনের অবস্থাটা কেমন সেটা কি ভাষা দিয়ে বুঝানো সম্ভব ?
কাকে বিশ্বাস করবে একটা মেয়ে ? নিজের জন্মদাতা বাবার কাছেও নিজের নাড়িছেড়া ধন নিরাপদ নয় !
ছি.. ধিক্কার দেবার মতন যথেষ্ট শব্দও আমার জ্ঞানে নেই !
আড়াই বছর আগের এই ঘটনাটাও আমাকে ঘুমাতে দেয়নি অনেক দিন । বমি বমি ভাবটাও ছিল বেশ কিছুদিন।
আমি জানিনা আড়াই বছর পর সেই মা টা এখন বেঁচে আছেন কিনা ? জানিনা সেই বাচ্চা মেয়েটা এখন কোথায় আছে , কার কাছে আছে ,কেমন আছে ….?
ঘটনা ৩:
এই ঘটনা টা আমাকে বেশ তৃপ্তি দেয় । খুলে বলি - একদিন অফিসের এইচআর থেকে আমাকে জানানো হল - গতরাতে একটা মেয়ে অফিস ছুটির পর বাসায় ফিরছিল। রাস্তার দুইপাশে শালবন থাকায় গাজীপুরের এই দিকটা বেশ সুনসান । মেয়েটার সাথে আরো দুটি মেয়ে ছিল । হেঁটেই যাচ্ছিল সবাই । একটা অটো পাওয়ায় পাশের দুই মেয়ে লাফ দিয়ে উঠে চলে যাওয়াতে এই মেয়ে একলা একলা যাচ্ছিল ।পরে নাকি মেয়েটাকে কে বা কারা ধর্ষনের চেষ্টা করেছে । আপনি একটু মেয়েটার সাথে কথা বলে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বুঝে এর পরের করণীয় কি আমাদের গাইড করুন ।
আমি শুধু বললাম - পাঠান ।
একটু পরেই মেয়েটা আসলো আমার চেম্বারে । বয়স হবে বত্রিশ থেকে পয়ত্রিশের মধ্যে । সারামুখে আচরের দাগ , সামনের তিনটা দাঁত ভাংগা , বাম চোখ ফুলে ঢেকে গেছে , সামনের একগাছি চুল নাই । মাথায় দুই তিন জায়গায় কেটে রক্ত জমে শক্ত হয়ে আছে । আমি কথা শুরুর আগে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিলাম ।
আমি বললাম - তোমার কে কে আছে রে মা ?
তিনি জানালেন - তার তিন মেয়ে । স্বামী আরেকটা বিয়ে করে চলে গেছে দশ বছর আগেই । মেয়েদের নিয়ে তিনি একাই জীবন যুদ্ধ করে চলছেন । দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন । আর ছোট টাকে স্কুলে পড়ান । যা বেতন পান তাতে মা বেটির দুজনের সংসার ভালই চলে ।
তারপর জানতে চাইলাম - গতকাল কি হয়েছিল বলতো !
তিনি বললেন - আমার ক্ষতি করতে পারে নাই ম্যাডাম । ব্যাটা একাই আছিলো। ব্যাটার হাতে চাকু আছিলো , হেইডার মাথা দিয়া প্রথমে আমারে বিভিন্ন জায়গায় ঘাও দিছে ।রাস্তা থেকে মুখ ছাপ দিয়ে ধইরা বনের মধ্যে নিয়া আমার উপরে চইড়া বইছিল ।আমি নড়তে চড়তে পারি নাই । পরে বিপদ বুইঝা আমি লোকটার লগে ভাও দিছি । এমনেও বিপদ অমনেও বিপদ । চিৎকার করলেও কেউ হুনবো না ।
লোকটারে কাকুতি কইরা কইলাম - আমি এমনেই রাজি আছি , চাকুর ঘাও দিয়েন না ।
ইতিমধ্যে আমার ওড়না কই ফালাইছে কইতে পারি না । চাকুর ঘাওয়ে জামা বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়া রক্ত পরতাছে ।
আমার এই কথায় লোকটা একটু ঢিল দিতেই ধাক্কা দিয়া লোকটারে ফালাইয়া দিয়া উইঠা দৌড় দিছিলাম । কিন্তু ধইরা ফেলছিল আমারে । কিন্তু আর শোয়াইতে পারে নাই । ধস্তাধস্তি করতে গিয়া আমি সুযোগমত লোকটার বিচি ধইরা এমন টান মারছি লোকটা ব্যথায় হুইয়া পরছে । চাকুটা পাশেই ছিল । হেইডা নিয়া লোকটার বিচি বরাবর দিছিলাম ফ্যাস । কিন্তু হারামজাদা লোকটা হাত দিয়া ঠেস দেওয়াতে যুতমত লাগে নাই কিন্তু দেহেন ম্যাডাম এইটুক কাইট্টা আনছি !
বলতে বলতে একটুখানি মাংসের টুকরা হাতের মুঠ খুলে দেখালো আমাকে! সত্যি সত্যিই সেটা অন্ডকোষ বা স্ক্রোটামের অংশবিশেষ ছিল !
আমি সঙ্গে সঙ্গ উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটাকে একটা স্যালুট দিলাম! সাবাস মেয়ে!!! খুশিতে আমার চোখে তখন জমেছে আনন্দঅশ্রু!
—ডা. ফাহমিদা মাহবুব
ফলো করুনঃ বিয়ে করতে হবে