24/07/2025
ক্রাইসিস পরবর্তী সময়ে আমরা সবাইই যার যার জায়গা থেকে কিছু একটা করতে চাই যা মানুষ হিসাবে চমৎকার একটা ব্যাপার।
এক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানী বা সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট প্রোভাইডারদের ভূমিকা সম্পর্কে মেন্টাল হেলথ প্রফেশনাল হিসাবে আমি কিছু ব্যক্তিগত আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের জায়গা শেয়ার করছি।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের নানাভাবে কনট্রিবিউট করার জায়গা আছে এটা যেমন বাস্তব, কখন, কি ধরনের সেবা প্রযোজ্য এবং কি ধরনের সেবা কাকে দেওয়া যাবে না তা বুঝাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা অনেকেই প্রথমেই ধরে নিচ্ছি এতবড় ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতদের স্বজন/বন্ধু ও আহতদের PTSD ডেভেলপ করতে পারে এবং কেউ কেউ এতে ব্যবহৃত ট্রিটমেন্ট মেথড ব্যবহার করার কথা ভাবছেন বা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কিন্তু PTSD ছাড়াও এখানে তীব্র অপরাধবোধ, নির্দিষ্ট কিছুর প্রতি অস্বাভাবিক ভীতি বা ফোবিয়া, গ্রিফ, ASD বা অ্যাকিউট স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, রিঅ্যাক্টিভ অ্যাটাচমেন্ট ডিসঅর্ডার, অ্যাংজায়টি, ডিপ্রেশন ইত্যাদির বৈশিষ্ট্যও ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যেতে পারে।
PTSD ডেভেলপ করেছে এমনটা আমরা তখনই বলি যখন ব্যক্তি ঘটনার পর কিছু নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া মিট করে এবং এই বৈশিষ্ট্য গুলো এক মাসের বেশি সময় অতিক্রম করলেও তার মধ্যে বর্তমান থাকে। যেহেতু এখনো এক মাস হয়নি, আমরা কাউকেই PTSD বলে ডায়াগনোস করব না।
যেহেতু এটা একটি কালেক্টিভ ট্রমা আমাদের সবার জন্য, তাই প্রথমেই নিজের মেন্টাল স্টেট মাথায় রেখে আগানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এই ধরনের ইস্যুতে। আপনার ব্যক্তিগত কোন আনপ্রসেসড ট্রমা থাকলে, স্পেসিফিক ফোবিয়া থাকলে কিংবা সিমিলার কোন এক্সপেরিয়েন্স থেকে থাকলে এবং তা ট্রিগার হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে এই ক্রাইসিসে সেবা দেওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো।
একটু মাথায় রাখা যেতে পারে এখন আমরা কোন স্টেজে আছি। যাদেরকে সেবা দিতে যাচ্ছি, প্রাথমিকভাবে কিছু কমন বিষয় তাদের মধ্যে দেখা যেতে পারে:
১. আহত, নিহতের স্বজন বা প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে সার্ভাইভারস গিল্ট খুব কমনলি দেখা যেতে পারে। এর ফলে কিছু শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। রাগ, তীব্র অক্ষমতার বোধ, অস্থিরতার পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় তারা এক্সপেরিয়েন্স করতে পারেন-
নির্দিষ্ট কিছু জিনিসের প্রতি অস্বাভাবিক ভীতি,
ঘুমের অসুবিধা,
দুঃস্বপ্ন,
বুক ধড়ফড় করা,
বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা,
কোন কিছু উপভোগ করার ক্ষেত্রে তীব্র অপরাধবোধ,
শ্বাসকষ্ট,
পেটে অস্বস্তি বা হজমের গোলযোগ,
মুড সুইং,
হুট করে কান্না পাওয়া,
ঘটনার ফ্ল্যাশব্যাক আসা,
কোন কাজে ইনভলভ হতে না পারা,
মনযোগ দিতে না পারা, বা
তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব।
২. গ্রিফ বা শোক। প্রাথমিকভাবে এই ধরনের ঘটনায় মানুষ তীব্র শোকে পতিত হয়। গ্রিফের পাঁচটা স্তর থাকে। denial, anger, bargaining, depression, and acceptance। যাকে সেবা দিতে চাচ্ছেন তিনি এখন কোন স্তরে আছেন তা আইডেন্টিফাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
শোকের ক্ষেত্রে ব্যক্তি তীব্র আবেগীয় অবস্থায় থাকেন। এই অবস্থায় তার ফ্রন্টাল লোব বা লজিক্যাল ব্রেইনের অংশটুকু খুব একটা ফাংশনাল থাকেনা। তাই অবশ্যই এই সময় তাকে ভালোমন্দ বুঝাতে যাবেন না।
তার ইমোশনাল ভ্যালিডেশন এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমন কোন কথা বলা বা কাজ করা থেকে বিরত থাকবেন, যা তার ইমোশনাল এক্সপ্রেশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বা ইমোশনাল হওয়ার কারণে তাকে কোন গিল্ট দেয়। কেননা এর ফলে ব্যক্তি যে ইমোশোনকে সাপ্রেস করবে, তা তার মধ্যে দুঃস্বপ্ন, মেজাজের ভারসম্যহীনতা, ফাংশনালিটি কমিয়ে দেওয়ার মত বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
প্রশ্ন হল, তাহলে কি করা যেতে পারে?
এভাবে দেখতে পারেন ব্যাপারটাকে,
ইমোশনাল অ্যাক্সেপ্ট্যান্স( অর্থাৎ আমার মধ্যে যে একটা তীব্র আবেগীয় অবস্থা বিরাজ করছে তা মেনে নেওয়া) → ইমোশোনটাকে অ্যাড্রেস করা → হেলথি ওয়েতে চ্যানেল করা (এমন কিছু করা যা প্রাইমারীলি ব্যক্তির আবেগীয় অবস্থা থেকে কিছুটা ডিসট্রাকশন তৈরি করে এবং পরে আবেগীয় অবস্থাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ধরে না রেখে ডিসেন্ট্রালাইজ করে) → আবেগের তীব্রতাকে ধিরে ধিরে কমিয়ে আনা।
৩. নিহতের স্বজনদের মধ্যে যাদের সাথে বাচ্চার অ্যাটাচমেন্ট গভীর ছিল, তাদের মধ্যে বিষন্নতা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে জীবনের প্রতি অনাগ্রহ দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তার বিষন্নতার মাত্রা বুঝে আত্মহত্যার প্রবণতা আছে কিনা চেক করা গুরুত্বপূর্ণ।
আত্মহত্যা প্রবণতা থাকা ব্যক্তিকে তখনই ডিল করবেন যদি আপনার ক্রাইসিস ইন্টারভেনশনের দক্ষতা থাকে। সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড দিয়ে সুইসাইডাল ব্যক্তিকে সেবা দেওয়া যাবে না।
৪. Acute Stress Disorder ট্রমাটিক এক্সপেরিয়েন্সের পরপরই দেখা যেতে পারে, যা কমপক্ষে তিনদিন থেকে সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এক্ষেত্রে ঘনঘন মুড সুইং দেখা যায়, ফ্ল্যাশব্যাক, ডিসোশিয়েশন, ঘটনা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যাওয়া, ঘুমের অসুবিধা, দুঃস্বপ্ন ইত্যাদি দেখা যায়।
৫. যদিও আমরা এই মুহূর্তে PTSD ডায়াগনোস করব না, কিন্তু কিছু ট্রমা রেসপন্স ব্যক্তির মধ্যে দেখা যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করা যেতে পারে-
-বারবার ঘটনার স্মৃতি মনে পড়া এবং একইরকম কষ্ট অনুভব করা
-ঘুমাতে না পারা বা ঘুমালে দুঃস্বপ্ন দেখা
-কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি/বস্তু/স্থান তীব্র ভীতি বা আবেগীয় অবস্থা সৃষ্টি করলে
-উক্ত ব্যক্তি/বস্তু/স্থান সর্বদা এড়িয়ে চলার প্রবণতা থাকলে
-হুটহাট যেকোনো সময় আবেগীয়ভাবে বর্তমান অবস্থা থেকে সেই ঘটনার সময়ে ফিরে গেলে
-অল্পতেই প্রচন্ড চমকে গেলে
-ভীষণ রাগ, বিরক্তি, মুড সুইং
-নিজের ব্যাপারে তীব্র নেতিবাচক মনোভাব
-কোন কিছু ইতিবাচক ভাবে নিতে না পারা বা কোন ইতিবাচক চিন্তা করতে না পারা
-নিজের জন্য ক্ষতিকর কাজ করা
-জীবনের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পাওয়া
-সব সময় ফাইট অর ফ্লাইট মোডে থাকা
এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই দক্ষ চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ব্যতিত অন্যান্য মানসিক সেবা প্রদানকারী ব্যক্তি সেবা না দেওয়া ভালো। কেননা এই ধরনের ইস্যু অ্যাড্রেস করতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
মাথায় রাখতে হবে যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ট্রমা রেসপন্স ডিল করা আর একজন শিশুর ট্রমা রেসপন্স ডিল করার প্রক্রিয়া ভিন্ন, তাদের ট্রমার রেসপন্স প্যাটার্নও ভিন্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, "Do No Harm" পলিসিটা মাথায় রাখা। অর্থাৎ, আমি উপকার করতে পারি বা না পারি, আমার মাধ্যমে কোন অপকার যেন না হয়।
*কি করা যাবেনা-
১. তুলনা করা
২. কপালের দোষ দেওয়া
৩. জাজ করা
৪. পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার জন্য নিজেকে বা অন্যকে জোর করা
৫. বারবার ব্যক্তির সামনে এ সংক্রান্ত বিষয় আলোচনা করা
৬. স্বাভাবিক আচরণ করতে বলা
৭. দীর্ঘ সময় ব্যক্তিকে একা ছেড়ে দেওয়া
৮. ক্ষতিকর অভ্যাস তৈরি বা নিজের জন্য ক্ষতিকর কাজকর্ম করা
৯. মেটা ফিজিক্যাল বিলিফ স্ট্রং হয় এমন কিছু বলা।
*মেটা ফিজিক্যাল বিলিফ হচ্ছে এমন কিছু ধারণা যা ফিজিক্যাল ওয়ার্ডের বিয়ন্ডে অবস্থান করে। ধরুন এই ঘটনার পর কারো কারো স্রষ্টার প্রতি তীব্র রাগ-ক্ষোভ কাজ করতে পারে। এই অবস্থায় এমন কিছুই বলা যাবেনা যা এই রাগকে বৃদ্ধি করে বা নতুন কোনো অ্যাঙ্গেল থেকে রাগ তৈরি করে। অনেকেই এই সময় ধর্মীয় জ্ঞান দিতে যান। এটা আত্মঘাতী চিন্তা। কেননা এমনটা প্রচুর দেখা যায় যে, এর ফলে ব্যক্তি অনুভব করে, তার কষ্টটাকে মিনিমাইজ করে দেখা হচ্ছে এবং সেটা সেই স্রষ্টারই নিয়মের কারণে, যিনি তাকে এই বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলেছেন। এতে করে অনেকেই স্রষ্টা বিমুখ হয়ে যান। এমনকি যারা ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা বলে সান্তনা দিতে যান তাদের প্রতিও ব্যক্তি ডিফেন্সিভ আচরণ করেন।
যেহেতু অনেককেই ধর্মীয় জ্ঞান থেকে সান্তনা দিতে দেখা যাচ্ছে, তাই হযরত আলী (রাঃ)-এর একটি কথা শেয়ার করছি।
"মানুষের মন সব সময় সব কথা ধারণ করার জন্য প্রস্তুত থাকেনা। তাই কাউকে উপদেশ দিতে গেলে তার বর্তমান অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে তা প্রদান করবে। কেননা, হতে পারে অন্যথায় সেটি তার মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করবে এবং সে কথাটি শুনতে অনাগ্রহী হয়ে পড়বে।"
তীব্র কষ্টের সময় ব্যক্তির পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তাকে সাইকোলজিক্যাল অ্যাশিওরেন্স দেওয়ার জন্য যে, সে একা নয়। কিন্তু সারাক্ষণ তার সাথে কমিউনিকেট করতে চেষ্টা করা কিংবা তাকে স্বাভাবিক আচরণ করতে জোর করা অনুচিত। ব্যক্তিকে তার নিজস্ব ব্যথাগুলো প্রসেস করার পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। এবং মাথায় রাখতে হবে যে, এই সময়টুকু প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়।