30/12/2025
আজ সকালটা ভীষণ ঠান্ডা।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি ঠান্ডা—চারপাশের নীরবতা।
কথা বলতে একদমই ইচ্ছে করছে না।
মনে হচ্ছে—আমি নির্বাক।
ঘরের ভেতরে হাঁটছি,
কিন্তু কেন হাঁটছি—নিজেও জানি না।
আজ কাজে যাইনি, ছুটি নিয়েছি।
কিন্তু এই ছুটিতে কোনো প্রশান্তি নেই।
গত রাতে—এখানে যখন গভীর রাত—
আমি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শুনেছি।
সারারাত ঘুম আসেনি।
কখনো এপাশে, কখনো ওপাশে গড়াগড়ি,
কখনো বিছানায় বসে থাকা—
এইভাবেই প্রতিটি সেকেন্ড কেটেছে।
এখন সকাল।
আমার পুরো শরীর যেন শকে স্তব্ধ।
চোখের পানি থামছে না—
মনে হচ্ছে নদীর মতো বয়ে সাগরে মিশে যাচ্ছে।
আমার বেড়ে ওঠার সময়,
আমার তরুণ বয়সে—
তাঁর মমতা, তাঁর স্নেহ আমার হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল।
আমি রাজনীতি করিনি।
আমি কখনো তাঁর সঙ্গে রাজনীতি নিয়েও কথা বলিনি।
যখন অনেকে পাঁচ মিনিট সময় বের করতে পারতেন না—
তিনি কীভাবে আমাকে এত সময় দিয়েছেন?
কীভাবে আমাকে এত কাছে বসিয়ে,
এত আপন করে কথা বলেছেন?
তিনি এমনভাবে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছিলেন
যে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম—
আমি কত বড় ও ক্ষমতাধর একজন মানুষের সামনে বসে আছি।
তাঁর ভালোবাসা, তাঁর স্নেহ—
আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না।
তিনি জেনে খুব খুশি হয়েছিলেন
যে আমি আমেরিকায় পড়াশোনা করছি।
আমি কখনো রাজনীতিতে যাওয়ার কথা ভাবিনি।
ছাত্রজীবন এতটাই কঠিন ছিল
যে দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—
পড়াশোনা শেষ করবো, আর তাঁকে বিরক্ত করবো না।
তখনকার দিনে যোগাযোগও আজকের মতো সহজ ছিল না।
বছরের পর বছর কেটে গেল।
এরপর তাঁর জীবনে একের পর এক
ভয়ংকর অন্যায় আর অবিচার নেমে এলো।
দূরে বসে সবসময় তাঁর জন্য দোয়া করেছি।
কিছু করতে চেয়েছি—
কিন্তু আমার সামর্থ্যের বাইরে ছিল।
যে নিষ্ঠুরতা তাঁর ওপর হয়েছে—
তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
একজন চিকিৎসক হিসেবে বলছি—
আমি এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না।
কীভাবে কেউ একজন মানুষকে
এত অসুস্থ করে ফেলতে পারে?
কীভাবে যথাযথ চিকিৎসা ছাড়া
তাঁকে বন্দি করে রাখা যায়?
কীভাবে তাঁকে কারাগারে রাখা হয়
যেখানে ন্যূনতম মানবিক সুবিধাও ছিল না?
আর কীভাবে এত শুভাকাঙ্ক্ষী থাকা সত্ত্বেও
তাঁকে মুক্ত করার মতো শক্তি কারও ছিল না?
তাঁর বাড়ির সামনে থাকা ব্যারিকেড
সরানোর মতো সাহস কারও হলো না?
একজন মানুষ হিসেবে,
একজন নাগরিক হিসেবে—
আমি লজ্জিত।
আরও লজ্জা পেয়েছি এই ভেবে—
অনেক রাজনীতিবিদ নিজেদের ভবিষ্যৎ,
নিজেদের সুবিধা নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন,
তাঁর সুস্থতা আর নিরাপত্তা নিয়ে নয়।
আজ একটি মহাকাব্যের সমাপ্তি ঘটলো।
এখন ম্যাডামের প্রতি আর কোন ভণ্ডামি ভালোবাসা
দেখার প্রয়োজন নেই।
আমার মতো লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ
তাঁকে আজীবন ভালোবাসবে।
আজীবন তাঁর জন্য দোয়া করবে।
আমাদের হৃদয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে।
তিনি কোনো একটি দলের নন—
তিনি বাংলাদেশ।
তিনি আমাদের সবার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক।
তিনি কখনো দেশকে বিকিয়ে দেননি।
তিনি কখনো বাংলাদেশকে একা ছেড়ে যেতে চাননি।
তিনি তাঁর পুরো জীবন বাংলাদেশকে উৎসর্গ করেছেন।
আমি তাঁর গুণাবলি শেষ করতে পারছি না।
চোখে ঝাপসা,
মনে গভীর শোক—
মনে হচ্ছে মস্তিষ্কের সব অনুভূতি স্তব্ধ হয়ে গেছে।
শুধু এটুকুই বলতে পারি—
লক্ষ লক্ষ স্যালুটও
তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
হে আল্লাহ,
এই কিংবদন্তি মানুষটিকে
এই মহান আত্মাটিকে
আপনি নিজের হেফাজতে রাখুন।
তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আমিন।