28/04/2026
ঘটনা ১: আমার ফ্রেন্ডলিস্টে একজন মহিলা ছিলেন যিনি প্রায়ই আমাকে মেসেজ করতেন। তাকে অবশ্য আমি চিনি না। কোন এক চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে অন্য কোন পেইজে প্রথমে কথা হয়েছিল তারপর উনি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলেন। আমি একসেপ্ট করে নিয়েছিলাম। এরপর থেকে উনি বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ আমার কাছ থেকে নেন। সেটা কোন সমস্যা না। সমস্যা হলো, উনি একদিন আমাকে পরপর দুটি টেক্সট করলেন। টেক্সট এসেছে আমি দেখেছি কিন্তু আমি ব্যস্ত থাকায় রিপ্লাই করিনি যদিও মেসেঞ্জারে একবার ঢুকে আমার হাজবেন্ডের টেক্সটের রিপ্লাই করেছিলাম। এবং আমি মনে করি এটা আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। আমার প্রায়োরিটি লিস্টে কে থাকবে সেটা আমিই নির্ধারণ করবো। আমি অনলাইন হয়েছি অথচ ওনার প্রশ্নের উত্তর দেইনি কিংবা মেসেজটা দেখিনি এটা উনার বিরাট গায়ে লেগেছে। উনি মেসেজ গুলো ডিলিট করে দিয়েছেন।
একটু পর দেখলাম উনি আমাকে টেক্সট করেছেন,
-প্রয়োজনের সময় যদি পরামর্শ না পাওয়া যায় তাহলে এমন বন্ধুর দরকার নেই।
আমি কথাটা গায়ে মাখলাম না শুধু ওনাকে আনফ্রেন্ড করে দিলাম। কোন উত্তর দিলাম না কারণ উনি আমার বন্ধু নন।
ওমা ভদ্রমহিলা(!!!) ইনবক্সে আমাকে যা তা বলা শুরু করলো! আমি কেন তাকে আনফ্রেন্ড করেছি? আমার সাহস হলো কি করে! মানুষকে কসাই ডাক্তাররা এভাবেই অবমূল্যায়ন করে?
আমি শুধু একটা রিপ্লাই দিলাম।
-ডাক্তারি আমার প্রফেশন। আমি দাতব্য চিকিৎসালয় খুলে বসিনি। বসলেও সেটা আপনার জন্য প্রযোজ্য না কারণ আপনি সেই কাতারে পড়েন না। এতদিন আপনাকে যে সমস্ত পরামর্শ দিয়েছি সেই জন্য আমার যেই ফি টা আসে সেটা দয়া করে আমাকে পাঠিয়ে দেবেন। চাইলে আপনাকে আমার বিকাশ নম্বর দিতে পারি।
একটু পর উনি আমাকে ব্লক করে দিলেন।
তাই বলছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্মান এবং প্রায়োরিটি অন্য কাউকে দেবেন না।
ঘটনা ২: বিয়ের পরপর এক বন্ধুর মা এলেন আমার বাসায়। সপ্তাহের দুই দিন আমরা হাজব্যান্ড ওয়াইফ দুজনেই আমার বাড়ি অর্থাৎ আমার বাবার বাড়িতে থাকি। আন্টির সাথে আমার সুসম্পর্ক বরাবরই ছিল স্কুল ফ্রেন্ডের মা বলে কথা। যাইহোক আমার হাজবেন্ডের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিলাম। আমার হাজব্যান্ড কিছুক্ষণ কথা বলে বাইরে গেল।
অমনি আন্টি বলে উঠলেন,
-আমি ভেবেছিলাম তুমি আর রাজিব সম্পর্কে আছো। উল্লেখ্য আমার বন্ধুটির নাম রাজিব।
হেসে মাথা নাড়ালাম।
- আপনি ভুল জানেন আন্টি আমরা শুধুই বন্ধু।
-কিন্তু আমার ছেলে তো অন্যভাবে দেখেছে সব সময়।
আমি এসব জানতাম না একটু বিরক্ত হলাম। তবু হাসি মুখে বললাম,
-এখন আর কি করার আছে? যার ভাগ্য যেখানে।
-এই ছেলের মধ্যে এমন কি দেখলে যে কয়েক দিনের পরিচয় বিয়ে করে ফেলতে হলো?
মেজাজ খারাপ হলো, উনাকে কি আমার কৈফিয়ত দিতে হবে!
-ভালো লেগেছে, বাবা-মা পছন্দ করেছে, আমার আপত্তি করার কিছু ছিল না। তাই পারিবারিকভাবে ছোট্ট পরিসরে বিয়ে করে ফেলেছি। কোন সমস্যা আন্টি?
-অবশ্যই সমস্যা, তুমি ডাক্তার তোমার হাজব্যান্ড তো ডাক্তার না। এই ছেলের সাথে তোমার যায়?
-আপনার ছেলের সাথে যায়?
মহিলা নিশ্চুপ চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। দৃষ্টি বলে দিচ্ছে হ্যাঁ ওটাই সঠিক।
-না আন্টি যায় না কারণ আপনার ভাষ্যমতে আমার হাজব্যান্ড যেহেতু ডাক্তার নয় তাই তাকে বিয়ে করা আমার উচিত হয়নি, আপনার ছেলেটিও ডাক্তার না। আপনার ছেলে আমার সমবয়সী। তার চেয়ে আমার ইনকাম অনেক বেশি। কিছুদিন পরেই সে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা শুরু করবে। অন্তত বাংলাদেশের ছেলেরা এই ব্যাপারে এখনো অতটা উদার হতে পারেনি। আমার হাজব্যান্ড এখনই যথেষ্ট এস্টাবলিস্ট এবং ম্যাচিউরড, তার এসব ভাবার সময় নেই।
মহিলা চায়ের কাপ আছড়ে রেখে উঠে চলে গেলেন। এরপর আর কোনদিন আমার সাথে তার দেখা হয়নি।
তাই বলছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্মান এবং প্রায়োরিটি কাউকেই দেবেন না। ভদ্র মহিলাকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি বিধায় নির্দ্বির্ধায় ওনাকে অনেক সম্মান করতাম এবং পছন্দ করতাম কিন্তু উনার মনে এটা ছিল তা জানতাম না। আর মনে মনে থাকলেও আমার বিয়ের পরে সেটা প্রকাশ করা ওনার কি উচিত হয়েছে?
ঘটনা ৩: কো*ভিডের সময় আমার খালুর চাকরি চলে গেল। খালা যদিও একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে তবুও দুটি সন্তান নিয়ে সে যথেষ্টই সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আমি প্রায় প্রতিমাসেই আমার সাধ্যমত সে যেন না বুঝে এমন ভাবে খালাতো দুই বোনের বাহানা দিয়ে কিছু টাকা দিতাম না। এমন কোন বড় এমাউন্ট না তবে আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের জন্য সেই টাকাটা নেহায়েত কম না। এভাবে প্রায় ৭/৮ মাস চলল।
এক মাসে আমি ব্যস্ত থাকায় টাকা দিতে দেরি হল কিন্তু ভুলে যাইনি। সে আমাকে ফোন করে হাই হ্যালো কেমন আছিস ভালো আছিস নাকি? কোন কিছুর ধার না ধেরে বলল,
-কিরে এই মাসের টাকা কোথায়! বাসা ভাড়া দিতে হবে না? আমার বাড়িওয়ালা তাগাদা দিয়ে গেছে।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম,
- তুমি কি আমার কাছে কোন টাকা পাও?
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে বললো,
- যেটা কন্টিনিউ করতে পারবি না সেটা শুরু করার দরকার কি? টাকাটা পাঠিয়ে দে, বাড়িওয়ালা বিকেলের মধ্যে দিতে বলেছে ।
আমি টাকা দেইনি, এরপর আর এক টাকাও দেইনি। চোখের সামনে কষ্ট করতে দেখেছি, নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা দেখেছি কিন্তু এক পয়সাও দেইনি। যে উপহার কে অধিকার ভেবে নেয় এবং সেটা না পেলে খারাপ ব্যবহার করে তাকে সম্মান দেয়ার কোন প্রয়োজন আমি অন্তত বোধ করি না। হ্যাঁ ঈদে আমার বোনদেরকে গিফট দিয়েছি কিন্তু এরপর থেকে আর একটি পয়সাও দেইনি।
তাই বলছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্মান এবং প্রায়োরিটি কাউকেই দেবেন না।
ঘটনা ৪: আমার স্কুল ফ্রেন্ড আসিফ নতুন বিয়ে করেছে। ডাক্তারি পাস করার পর পরই যেহেতু আমাদের বাড়ির কাছাকাছি তাই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আন্টি আঙ্কেল আমাকে ডাকত। এই প্রেসার মেপে দেওয়া, সুগার দেখে দেওয়া, এছাড়াও বিভিন্ন ইমারজেন্সিতে। আমি সব সময়ই তাদের খোঁজখবর রেখেছি এবং কখনোই না করিনি। তো বন্ধুর বিয়ের পর দায়িত্ব আরো বাড়লো। এক সময় বন্ধুর বউ প্রেগন্যান্ট হলো। প্রথম চেকআপটা আমি হাসিমুখে বাড়িতেই করে এলাম। এখানে বলাই বাহুল্য আমি কিন্তু তাদের কাছ থেকে একটা পয়সাও নেই না আর আমার দিক থেকে এটাই স্বাভাবিক। যাই হোক, কিছুদিন আগে যখন আমার ছোট ফুপু মা*রা গেল, এত রাতে গাড়ি পাওয়া ছিল মুশকিল। আমার বন্ধুটির রেন্ট এ কারের বিজন্যাস। অতি দ্রুত তাকে ফোন করে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে রিকোয়েস্ট করলাম। সে হাই তুলে বলল,
-এগুলোর বুকিং আগেই দিতে হয় রে।
-আশ্চর্য মৃ*ত্যু কি বুকিং দিয়ে আসে, আমি অবাক!
-না তা না, আচ্ছা ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি।
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম কিন্তু পরবর্তীতেই আমি একটু ধাক্কা খেলাম।
-শোন, নরমালি তো আমরা ৫০০০ টাকা নেই যেহেতু এত রাতে এত ইমার্জেন্সিভাবে বলছিস তাই তুই আট হাজার টাকা দিস আমি ম্যানেজ করে দিচ্ছি। বলে ও ফোনটা রেখে দিল।
আমি টাকা দিয়েছিলাম এবং ওই গাড়ি দিয়েই গিয়েছিলাম।
পরের চেকআপে আমি যখন ওর বাড়ি গেলাম না এবং ওর ফোন ধরলাম না তখন ভাবিকে নিয়ে ও সরাসরি আমার চেম্বারে চলে এল। আমি চেকআপ করলাম এবং ওষুধ দিলাম। ওরা যখন উঠে যাচ্ছিল ঠিক তখন বললাম,
-আমার ভিজিট ১০০০ টাকা, তুই বন্ধু মানুষ তাই ২০০ টাকা কম দে, সমস্যা নেই। তবে এরকম হুটহাট চলে আসলে কিন্তু হবে না। আমার চেম্বার ব্যস্ত থাকে, অবশ্যই এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এর পরের বার থেকে আসবি।
সে হতভম্ব হয়ে টাকা বের করে দিয়েছিল।
সব মানুষ আপনার সদিচ্ছা বহন করতে পারে না। কেউ কেউ ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভাবে, সাহায্যকে অধিকার মনে করে, আর নীরবতাকে অপরাধ ধরে নেয়, সম্মানকে বিনয়কে প্রাপ্য মনে করে। তাই জীবনে সবচেয়ে জরুরি যেটা শিখতে হয়, তা হলো কোথায় থামতে হবে। সম্মান দিন, সাহায্য করুন, পাশে দাঁড়ান কিন্তু নিজের আত্মসম্মানের দামে নয়। কারণ যে মানুষ উদার মনে পরামর্শ দেয়াকে অধিকার মনে করে, যে মানুষ সম্মানকে প্রাপ্য মনে করে, যে মানুষ উপহারকে দাবি বানায়, তারা কখনোই কৃতজ্ঞ হতে শেখে না। আর নিজের সীমা রক্ষা করা কখনো স্বার্থপরতা নয়। এটা আত্মরক্ষার সবচেয়ে পরিণত ভাষা।
#সীমারেখা
লেখা - সুবর্না শারমিন নিশী