05/01/2026
রকেফেলার যুগে পেট্রোকেমিক্যাল ড্রাগস বনাম হোমিওপ্যাথির ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
✒️ শামীম রেজা
১৯শ শতকের শেষভাগ এবং ২০শ শতকের শুরুর দিকে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তখনকার সমাজের অভিজাত শ্রেণি, রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে লেখক, শিল্পপতি এবং সাধারণ জনগণও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা রাখতেন। আমেরিকায় তখন শতাধিক হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল ছিল, যার মাধ্যমে বোঝা যায় এ চিকিৎসা পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা কতটা বিস্তৃত ছিল। এমনকি জন ডি. রকফেলার, যিনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম ধনী ব্যক্তি, নিজে একাধিকবার হোমিওপ্যাথির প্রশংসা করেছেন এবং বলেছিলেন – “Homeopathy is a progressive and aggressive step in medicine.”
কিন্তু এ প্রশংসার আড়ালে ছিল এক গভীর বৈপরীত্যে এবং মুনাফালোভী চরিত্র। রকফেলার খুব শীঘ্রই উপলব্ধি করেন যে, পেট্রোকেমিক্যালস থেকে উৎপন্ন ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি একটি সম্ভাবনাময়, বিশাল মুনাফার ক্ষেত্র।উল্লেখ্য হোমিওপ্যাথিতে কোনো প্যাটেন্ট নেই,তাই প্যাটেন্ট এর মাধ্যমে একচেটিয়া ব্যবসা ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বজায় রাখা যাবে না।আরো একটি বিষয় হলো কোনো রোগী যদি একেবারে সুস্থ হয়ে যায় তাহলে সেই কাস্টমার হাত ছাড়া হয়ে যাবে।তাই শুধু সিম্পটোম ম্যানেজ করে মূল রোগের নির্মূল না করে একই রোগীকে আজীবন কাস্টমার বানিয়ে মুনাফা ভোগ করতেই থাকবে। নানাবিধ দিক বিবেচনা করে তিনি নিজে হোমিওপ্যাথিতে আস্থা রাখলেও, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং অন্যান্য সিক্রেট গ্লোবাল এজেন্ডা বাস্তবায়নের স্বার্থে ফার্মাসিউটিক্যাল ও এলোপ্যাথিক চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেন। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় কূটকৌশল ছিল ১৯১০ সালে প্রকাশিত Flexner Report, যা ছিল কার্নেগি ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং রকফেলার ফাউন্ডেশনের প্রভাবাধীন।
ফ্লেক্সনার রিপোর্ট মূলত মেডিকেল শিক্ষাকে মানসম্পন্ন করার নামে একটি স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠা করে, যার মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক, হার্বাল, ন্যাচারোপ্যাথিক এবং অন্যান্য অল্টারনেটিভ চিকিৎসা পদ্ধতিগুলিকে ‘অবৈজ্ঞানিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তী সময়ে, এই রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী বহু হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সরকারিভাবে শুধু এলোপ্যাথিক চিকিৎসাই 'প্রমাণভিত্তিক' বলে স্বীকৃতি পায়।
এছাড়াও, American Medical Association (AMA)-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। আর এই AMA প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল হোমিওপ্যাথিক এসোসিশন এর প্রতিক্রিয়ায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থার সত্যতাকে চাপা দিতে। তারা চিকিৎসকদের জন্য এমন এক নিয়ম চালু করে, যেখানে বলা হয়েছিল – “যদি তুমি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা চর্চা করো, তাহলে তোমার সদস্যপদ এবং চিকিৎসা লাইসেন্স বাতিল করা হবে।” এভাবে হুমকি ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অল্টারনেটিভ চিকিৎসা পদ্ধতিকে প্রান্তিক করে ফেলা হয়।তারা হোমিওপ্যাথগণের জ্ঞানের ব্যাপারে খুব শঙ্কিত ছিল। তারা জানত যে মূলধারার চিকিৎসকগণ যদি একবার জানতে পারেন যে হোমিওপ্যাথি কি করতে পারে, তাহলে তারা কখনোই আর বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করবে না। এখানেই তাদের খেলা শেষ।
তবে সব চেয়ে বড় আইরনি হলো, রকফেলার পরিবার নিজস্ব তিনজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে তাঁদের চিকিৎসা নিতেন। অর্থাৎ তিনি নিজের ও পরিবারের জন্য প্রাকৃতিক ও নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থা রাখলেও, বৃহত্তর জনসাধারণের জন্য এলোপ্যাথিক এবং রসায়নভিত্তিক ওষুধ ব্যবস্থাকেই চাপিয়ে দেন – মূলত বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে।তাছাড়া অসংখ্য এলিট, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করলেও সাধারণ জনগণকে এ বিষয়ে জানতে দেয় না। চার্লস ডারুইন এই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে অরিজিন অব স্পেসিস লেখেন। বর্তমানে ব্রিটিশ রাজপরিবারের অনুমোদিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক এবং Royal Medical Household‑এর প্রধান হলেন ডাঃ মাইকেল দিক্সন (Dr Michael Dixon)। তিনি ২০২২ সাল থেকে এই পদে রয়েছেন এবং এই হিসেবে তিনি Sovereign ও রাজপরিবারের মেডিকেল টিমের নেতৃত্ব দেন। অথচ জনসমক্ষে তিনিও হোমিওপ্যাথির বিষয়টি কৌশলে অবজ্ঞা করেন।উল্লেখ্য ফ্রিমেসনের অনেক সদস্যই হোমিওপ্যাথিক ডক্টর। ড. হ্যানিম্যান নিজেও ফ্রিমেসন সদস্য ছিলেন।পরে তিনি ইসলাম ধর্মে গ্রহণ করে মুসলিম হিসেবে মারা যান।
যেকোনো চিকিৎসা পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা অনেক সময় বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি নির্ধারিত হয় অর্থনীতি, রাজনীতি ও ক্ষমতার দখলদারিত্বের মাধ্যমে। আজও হোমিওপ্যাথি বিশ্বের বহু দেশে, বিশেষ করে ইউরোপ ও ভারতে, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আমেরিকায় এর প্রভাব প্রায় মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলে আসছে – একটি সুপরিকল্পিত আর্থ-রাজনৈতিক নীতির মাধ্যমে।
তথ্যসূত্র (References):
1. Abraham. Medical Education in the United States and Canada, 1910. Carnegie Foundation.
2. Coulter, Harris L. Divided Legacy: A History of the Schism in Medical Thought, Vol. 3.
3. Dana Ullman. Discovering Homeopathy: Medicine for the 21st Century.
4. AMA historical records, available via National Library of Medicine.
5. Gerson, Charlotte. Healing the Gerson Way, for perspectives on alternative medicine suppression.