30/11/2025
লুপাস জয়ীর জীবনসংগ্রামের গল্প 🦋
সিয়াম ইবনে হাসান রিয়ান, বগুড়া
অনুপ্রেরণায়: লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সম্মানিত কো-ফাউন্ডার ও সেক্রেটারি, শ্রদ্ধেয়া ফারহানা ফেরদৌস আপু
আমার জীবনের এক দুর্বিষহ সময় এবং আলোর পথে যাত্রার গল্প—
শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক।
২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে হঠাৎ টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হই। সুস্থ হয়ে ফিরে চতুর্থ শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হই। পরবর্তী পরীক্ষাতেও ভালো ফল করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই পড়া মনে রাখতে সমস্যা শুরু হয়।
দুই লাইনের একটি পড়া মুখস্থ করতে দুই ঘণ্টা লেগে যেত, আর আমি কান্নায় ভেঙে পড়তাম। ফলস্বরূপ, ১ম সাময়িক পরীক্ষায় আমার রোল ১ থেকে নেমে ৪৪ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় মানুষের অবজ্ঞা, বিদ্রুপ ও অপমান।
সবকিছু সহ্য করে পি ই সি ই পরীক্ষায় অংশ নিই এবং GPA-5.00 অর্জন করি।
ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি — অব্যাহত অপমান ও মানসিক ভাঙন।
বন্ধুরা দূরে সরে যায়। কিছু সহপাঠীর অভিভাবক আমার মা-কে অপমান করতে কুণ্ঠা বোধ করতেন না। আমার মা তা সহ্য করতে পারতেন না, আমিও ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি।
সপ্তম শ্রেণির মাঝামাঝি সময়ে মানসিক সমস্যাগুলো গুরুতর রূপ নেয়। স্কুলে যেতে ভয় পেতাম, ভাবতাম কেউ অপমান করবে। পরীক্ষাও দিতে পারিনি ঠিকভাবে, তবুও বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উঠি।
তীব্র মানসিক অবস্থা ও আত্মবিরোধী আচরণ-
নিজেকে আঘাত করতাম, হাতের রগ কেটে ফেলতাম, বাড়ি চিনতাম না — এক ভয়াবহ সময় পাড়ি দিয়েছি। চিকিৎসার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হয়ে জেএসসি পরীক্ষায় GPA-5.00 পাই।
২০২০: কোভিড-১৯ ও এক ভয়ঙ্কর মোড়।
নবম শ্রেণিতে উঠে কোভিড-১৯ এর কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালের মাঝামাঝি হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ি।
২০২১ সালের শুরুতে আমার শরীরে ধরা পড়ে একটি বিরল ও জটিল অটোইমিউন রোগ —
Systemic Lupus Erythematosus (SLE)।
সেদিন থেকেই শুরু হয় আমার এক নতুন যুদ্ধ — নিজের শরীরের বিরুদ্ধে।
চিকিৎসার খরচ এতটাই বেড়ে যায় যে, আমার মা তাঁর বিয়ের গয়না বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরিবারকে চালাতে আমাদের নিতে হয় ব্যাংক লোনও।
এসএসসি ও এইচএসসি — লড়াই চালিয়ে যাই একাই।
আমি সিদ্ধান্ত নিই, কোনো প্রাইভেট পড়বো না। ইউটিউবসহ বিভিন্ন ফ্রি অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করে নিজে নিজে পড়ালেখা চালিয়ে যাই, যাতে চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থ সাশ্রয় করা যায়।
কিন্তু ২০২৩ সালে আসে নতুন বিপর্যয়।
আমি একসাথে আরও কিছু জটিল ও কষ্টদায়ক রোগে আক্রান্ত হই:
Chronic Antral Ulcer
Solitary Re**al Ulcer Syndrome (SRUS)
Irritable Bowel Syndrome – Constipation predominant (IBS-C)
Small Intestinal Bacterial Overgrowth – Methane dominant (SIBO-M)
Fibromyalgia with Musculoskeletal Pain (MSK)
Pelvic Floor Dyssynergia
Obstructed Defecation Syndrome (ODS)
এই রোগগুলোর কারণে নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে পারিনি। পরীক্ষাগুলো দিয়েছি কোনোভাবে। একটানা ক্লাস করলে প্রচণ্ড ব্যাকপেইন ও হাঁটু ব্যথা হতো।
নিজেকে হারিয়ে ফেলার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছি।
অনেক সময় শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যেত যে, বাধ্য হয়ে বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি অচেনা মানুষদের কাছ থেকেও সহায়তা চেয়েছি। আত্মসম্মান ভুলে গিয়ে সাহায্যের আবেদন করেছি, শুধুমাত্র আমার বাবা-মায়ের অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে।
কিছু মহান মানুষ — কেউ আমার খুব আপন, কেউ সম্পূর্ণ অচেনা — নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ কেউ আবার ভুল বুঝেছেন, অপমান করেছেন। তবুও আমি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার দিকেই মনোযোগ দিয়েছি।
২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আমার চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা।
সময়ে সহায়তা না পেলে হয়তো আজ আমি বেঁচে থাকতাম না।
তাদের প্রতি আমি চিরঋণী। তারা আমার জীবনে আলো এনেছেন, বাঁচতে শিখিয়েছেন।
আজ, আলহামদুলিল্লাহ, আমি United International University-তে BSc in Data Science প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছি এবং একটি নতুন জীবনের পথচলা শুরু করেছি।
আমার স্বাস্থ্য এখন অনেকটাই স্থিতিশীল এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থাও উন্নত।
তবুও, যখন অতীতের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন বুকের গভীরে এক অসহনীয় কষ্ট অনুভব করি।
যারা আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে পাশে ছিলেন-
Shafiq Islam Sir ( My Honorable Physics Teacher)
Farhana Ferdous Apu ( Co-founder Secretary, Lupus Foundation of Banglaesh)
Tasneem Asif Adiba Apu 💓
Kazi Abu Darda Meshkat (Friend)
Mahbubur Rahman (Friend)
Md Siam (Friend)
Mohammed Zawad Reza (Friend)
Syeda Maria Affendi Apu
Maisha Mumtaz Titli Apu
Mirza Abir Vaia
Mohammad Gufran Vaia
Faizunnessa Munni Apu
পরিশেষে, লুপাসে আক্রান্ত সকল ভাই-বোনদের প্রতি আমার হৃদয়ের বার্তা-
প্রিয় সহযোদ্ধা,
লুপাস একটি কঠিন ও ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া রোগ। এটি শুধু শরীর নয়, মন, সম্পর্ক ও সমাজ—সবকিছুকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আপনি যেন কখনও ভুলে না যান—এই রোগ আপনাকে দুর্বল করে না, বরং আপনাকে আরও দৃঢ় ও অটল করে তোলে।
আমি জানি এই পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ। অসহ্য ব্যথা, ঘন ঘন হাসপাতালে যাওয়া, ক্লান্ত দেহে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা, সহানুভূতির অভাব, অপমান—সব কিছুই খুব ভালো করেই চিনি।
তবুও, আজ আমি আপনাকে বলতে চাই—হাল ছেড়েন না।
জীবনে অন্ধকার যতই ঘনিয়ে আসুক, কোথাও না কোথাও একটা আলোর রেখা ঠিকই থাকে। আপনি একা নন। আপনার ভেতরেই আছে সেই শক্তি, যেটা আপনাকে বহুদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে।
যদি কেউ আপনার কষ্ট না বোঝে, মনে রাখবেন—মহান আল্লাহ / সৃষ্টিকর্তা সব জানেন।
যদি সবাই দূরে সরে যায়, তবুও মনে রাখবেন—আপনি একাই যথেষ্ট, কারণ আপনি একজন যোদ্ধা।
লড়াই করুন, কাঁদুন, আবার উঠে দাঁড়ান, হাঁটুন, হাসুন। জীবন থেমে থাকেনি, আপনিও থামবেন না।
একদিন নিশ্চয়ই আপনি নিজের গল্পে বিজয়ী হবেন—যেমনটা আমি হয়েছি।
আপনার ভেতরেই বেঁচে থাকার প্রেরণা আছে, আর সেটিই আপনাকে জয়ী করবে।
ইনশাআল্লাহ