03/11/2025
লসিকাতন্ত্র
(লসিকা, লসিকানালী এবং লসিকা গ্রন্থি এনাটমি এবং ফিজিওলজির এই অঙ্গতন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দেওয়া অসম্ভব)
মানব দেহে রক্ত একটি অন্যতম পরিবহন মাধ্যম যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থ বিভিন্ন কোষ কলায় (Tissue)
পৌঁছে এবং বিভিন্ন বিপাকীয় পদার্থ রেচনের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্গে বাহিত হয়। অন্যদিকে দেহের সমস্ত কলা (Tissue) রক্তপূর্ণ কৈশিক জালিকায় বেষ্টিত থাকে। রক্তের কিছু উপাদান কৈশিক জালির প্রাচীর ভেদ করে কোষের চারপাশে অবস্থান করে । এ উপাদানগুলোকে লসিকা (Lymph) বলে।
কৈশিক জালিকা ছাড়াও কিছু পরিমাণ কলারস এক ধরনের বদ্ধ নালি দিয়ে গৃহীত ও পরিবাহিত হয়ে পুনরায় রক্তে ফিরে আসে। এ সব নালিকে “লসিকা নালি” (Lymph vessels) বলে। অতএব লসিকা, লসিকানালি ও লসিকাগ্রন্থি সমন্বয়ে গঠিত অন্ত্রকে “লসিকাতন্ত্র” বলে।
লসিকা: এক ধরনের পরিবর্তিত ঈষৎ ক্ষারধর্মী স্বচ্ছ কলারস যা লসিকা নালির ভেতর দিয়ে পরিবাহিত হয়ে দেহের সকল
কোষকে সিক্ত করে। এতে লোহিত রক্ত কণিকা ও অণুচক্রিকা অনুপস্থিত কিন্তু শ্বেত কণিকার সংখ্যা অত্যাধিক। লসিকায় ৯৪% পানি ও ৬% কঠিন পদার্থ থাকে। যেমন- প্রোটিন, স্নেহ পদার্থ, কার্বোহাইড্রেট, নাইট্রোজেনযুক্ত পদার্থ, ফসফরাস, সোডিয়াম, ক্লোরাইড, কিছু এনজাইম ও অ্যান্টিবডি। মানুষের দেহে লসিকার পরিমাণ ১-২ লিটার ।
লসিকা নালি (Lymph vessels): লসিকা জালিকা থেকে কতকগুলো নালি একত্রে মিলিত হয়ে লসিকা নালি গঠিত।
লসিকা নালি দু'ধরনের।
যথা- (১) অন্তর্মুখী লসিকা নালি ও
(২) বহির্মুখী লসিকা নালি ।
অন্তর্মুখী লসিকা নালিঃ যে নালি লসিকাকে লসিকা গ্রন্থির দিকে বহন করে তাকে অন্তর্মুখী লসিকা নালি বলে ।
বহির্মুখী লসিকা নালি: যে নালি লসিকা গ্রন্থি হতে লসিকা বহন করে, তাকে বহির্মুখী লসিকানালি বলে ।
সাধারনত পেশি সঞ্চালন, শ্বাস কাজ ও ধমনির কাঁপনে দেহে লসিকা প্রবাহিত হয়। অন্ত্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লসিকাকে ল্যাকটিয়াল বলে।
লসিকা গ্রন্থি (Lymph Gland) : লসিকা নালিতে বেশ কাছাকাছি অবস্থিত গোলাকার বা ডিম্বাকার ফোলা অংশগুলোকে “লসিকা গ্রন্থি” বলে। যান্ত্রিক ছাঁকুনি হিসেবে কাজ করে বিভিন্ন জীবাণু ও ক্ষতিকর কোষের হাত থেকে এগুলো দেহকে রক্ষা করে। ঘাড়ে, বগলে ও কুঁচকিতে লসিকা গ্রন্থি থাকে।
মানুষের শরীরে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি লসিকা গ্রন্থি থাকে, যা ঘাড়, বগল, বুক, কুঁচকি এবং পেটের মতো অংশে গুচ্ছাকারে অবস্থান করে। এই গ্রন্থিগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা লসিকা থেকে ক্ষতিকর জীবাণু ছেঁকে আলাদা করে।
সংখ্যা: প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি লসিকা গ্রন্থি থাকে।
অবস্থান: এই গ্রন্থিগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকে, যেমন ঘাড়, বগল, বুক, কুঁচকি এবং পেট।
কাজ: লসিকা গ্রন্থি অনেকটা ছাঁকনির মতো কাজ করে, যা লসিকা থেকে জীবাণু ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ দূর করে এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
লসিকার কাজ
প্রোটিন পরিবহন: কলার ফাঁকা স্থান থেকে প্রোটিন লসিকার মাধ্যমে রক্তে ফিরে আসে।
স্নেহ পরিবহনঃ যে সব স্নেহ কলা কৈশিক নালির বাধা অতিক্রমে অক্ষম সেগুলো লসিকার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
পুষ্টি সরবরাহ: দেহের যে সব কলা কোষে রক্ত পৌঁছাতে পারে না সেখানে লসিকা অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে ।
শোষণ: স্নেহ পদার্থ অন্ত্র থেকে শোষিত হয়ে লসিকার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়।
প্রতিরক্ষাঃ লসিকায় অবস্থিত প্রচুর শ্বেত কণিকা দেহের প্রতিরক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকে ।
প্রতিরোধ: B-লিম্ফোসাইট থেকে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
দেহ রসের সংবহন: রক্ত সংবহনের এক অংশ থেকে অন্য অংশে তরল পদার্থের পরিবহনে অংশ নেয়।
লসিকা গ্রন্থিগুলো আলোচনা করা হলো।
১। প্লীহা বা ব্লাড ব্যাংক (Spleen) ঃ প্লীহা হলো মানবদেহের সবচেয়ে বড় লসিকা গ্রন্থি। ইহা পাঁজরের নিচে এবং পাকস্থলীর উপরে অবস্থান করে। ইহা নরম এবং কালচে বর্ণের। একে রক্তে রিজার্ভার বা ব্লাড ব্যাংক বলা হয়। ইহা দুই ধরনের প্লীহা মজ্জা নিয়ে গঠিত। লাল মজ্জা ও সাদা মজ্জা। ইহা ৩০০ মিলি রক্ত জমা রাখতে পারে। প্লীহার আয়তন ১৩×৭×৩ ঘন সেমি এবং ওজন ১৫০ গ্রাম। প্লীহা রক্তের প্রধান ছাঁকুনী হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ লোহিত রক্তকণিকা প্লীহায় ধ্বংস প্রাপ্ত হয় বলে একে লোহিত রক্তকণিকার কবরস্থান বলা হয়। ইহা জীবাণু ধ্বংস করে রোগ প্রতিরোধ করে।
২। টনসিল (Tonsil)ঃ মুখ গলবিলের ভিতরে ডান ও বাম দিকে ছোট বলের মতো যে গঠন দেখা যায় তাকে টনসিল বলে। মানবদেহে তিন ধরনের টনসিল থাকে। প্যালেটাইন, অ্যাডেনয়েড (ফ্যারিঞ্জিয়াল) ও লিঙ্গুয়াল। ইহা অ্যান্টিবডি ও লিম্ফোসাইট উৎপন্ন করে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অনেক সময় টনসিল ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়। একে টনসিলাইটিস (tonsillitis) বা টনসিলের প্রদাহ বলে। অপারেশন করে টনসিল অপসারণকে টনসিলেকটমি (tonsillectomy) বলে।
৩। লিম্ফনোড (Lymph node)ঃ লিম্ফনোড হলো লসিকা বাহিকায় অবস্থিত ক্যাপসুলোর মতো একটি অংশ। মানবদেহে লিম্ফনোডের সংখ্যা ৪০০–৭০০। ইহা ম্যাক্রোফেজ ও লিম্ফোসাইট দ্বারা পূর্ণ থাকে। ইহা অণুজীব ও বহিরাগত পদার্থকে অপসারণ করে। নোডগুলো লসিকা পরিষ্কার করে।
৪। থাইমাস (Thymus)ঃ শ্বাসনালি ও স্টার্ণামের মাঝে হৃৎপিন্ডের উপরে অবস্থিত পিরামিড আকৃতির অঙ্গকে থাইমাস বলে। ইহা নরম ও দ্বিখন্ডিত। শিশুদের থাইমাস বড় ও সক্রিয় থাকে। থাইমাস থেকে থাইমোসিন ও থাইমোপোয়েটিন হরমোন নিঃসৃত হয়। হরমোনগুলো লিম্ফোসাইটের পরিপক্কতা নিয়ন্ত্রণ করে। থাইমাস বয়ঃসন্ধিকালে ক্রমশ ফ্যাট টিস্যুতে পরিনত হয়। তবে প্রাপ্ত বয়সে অদৃশ্য হয়ে যায়। লাল অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন শে^ত রক্তকণিকা থাইমাসে পৌছে T–লিম্ফোসাইটে পরিনত হয়। এরা যে কোন প্রতিরোধী কোষ T–ইফেক্টার, T–কিলার ও T–হেলপার–এ পরিনত হয় এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে শনাক্ত করে।
৫। লাল অস্থিমজ্জা (Reb Bone marrow)ঃ লাল অস্থি মজ্জা হলো স্পঞ্জের মতো, অর্ধকঠিন ও লাল বর্ণের টিস্যু। লাল অস্থিমজ্জা থেকে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লেটলেট উৎপন্ন হয়। শিশুদের অধিকাংশ হাড়ে লাল অস্থিমজ্জা থাকে। বয়স্কদের পেলভিস, কশেরুকা, স্টার্ণাম, করোটি, ক্ল্যাভিকল, কন্ঠাস্থি, পর্শুকা, হিউমেরাস, ফিমার প্রভৃতিতে লাল অস্থিমজ্জা থাকে।
প্রচারে
ডা. মোঃ আম্মার আব্দুল্লাহ
রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক