05/02/2026
“রোগীর ডান হাতটি কেটে ফেলতে হবে।”
এই বাক্যটা শোনার পর মানুষটা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলেন। চোখে তখন শুধু ভয় নয়—অবিশ্বাস, আফসোস আর নিজের উপর রাগ।
কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন একদম স্বাভাবিক। হঠাৎ একটা দুর্ঘটনায় ডান হাতের হাড় ভেঙে যায়। বড় কিছু মনে হয়নি। হাসপাতালের বদলে তিনি গেলেন পরিচিত এক কবিরাজের কাছে।
👉 “ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছি, ঝাপ দিচ্ছি—কয়দিনেই ঠিক হয়ে যাবে”—এই আশ্বাসটাই তখন সবচেয়ে আপন মনে হয়েছিল। কম খরচ, পরিচিত মানুষ, দ্রুত আরাম—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটা সহজই মনে হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হাতটা ভালো হওয়ার বদলে ফুলতে লাগল। ব্যথা বাড়ল, রঙ বদলাতে শুরু করল। অবশেষে যখন হাসপাতালে এলেন—তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আজ ছবিতে আপনারা যা দেখছেন, সেটা শুধু একটি ক্ষতবিক্ষত হাত নয়—
এটা একটি ভুল সিদ্ধান্তের নির্মম পরিণতি।
দুঃখজনক হলেও সত্যি—এই রোগীর ডান হাতটি আর রাখা সম্ভব হয়নি। সংক্রমণ এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে প্রাণ বাঁচাতে হাত কেটে ফেলাই একমাত্র উপায়।
আমি জানি—গ্রাম হোক বা শহর, আজও অনেক মানুষ হাড়ের ব্যথা, মচকানো, ফোলা বা ভাঙার পর প্রথমেই কবিরাজি চিকিৎসার শরণাপন্ন হন।
কারণটা খুব মানবিক—চেনা মানুষ, কম খরচ, দ্রুত ভালো হয়ে যাওয়ার আশা।
কিন্তু যে সত্যটা কেউ বলে না, সেটা হলো—
👉 এই একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্তই অনেক সময় আজীবনের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একজন অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ হিসেবে রোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এই কথাগুলো বলা আমার দায়িত্ব।
কবিরাজি চিকিৎসার ভয়াবহ কুফলগুলো এক নজরে—
🔸 ভাঙা হাড় ভুলভাবে জোড়া লাগা (Malunion)
ভুল মালিশ, চাপ বা শক্ত বাঁধনের কারণে হাড় বেঁকে জোড়া লাগে—পরে বড় অস্ত্রোপচার ছাড়া ঠিক করা যায় না।
🔸 ভুল রোগ নির্ণয়
হাড়, লিগামেন্ট, ডিস্ক বা জয়েন্টের জটিল সমস্যা বুঝতে X-ray, MRI দরকার—যা কবিরাজি চিকিৎসায় নেই।
🔸 স্থায়ী বিকলাঙ্গতা
লিগামেন্ট ছেঁড়া অবস্থায় জোরে টানাটানি করলে জয়েন্ট আজীবনের জন্য দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
🔸 সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি
অস্বাস্থ্যকর তেল, গাছগাছড়া বা খোলা হাতে চিকিৎসা থেকে ইনফেকশন হয়ে হাড় পর্যন্ত পচে যেতে পারে।
🔸 নার্ভ ড্যামেজ
ভুল চাপ বা বাঁধনের ফলে স্নায়ু নষ্ট হয়ে হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, শক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
শেষ কথা একটাই—
🩺 হাড়-জয়েন্ট একবার নষ্ট হলে তার ক্ষতি অনেক সময় আর পূরণ হয় না।
যে চিকিৎসা আজ সস্তা ও সহজ মনে হয়, সেটাই কাল সবচেয়ে বড় মূল্য আদায় করে—স্বাস্থ্য দিয়ে, সক্ষমতা দিয়ে, কখনো পুরো জীবন দিয়ে।
🙏 সচেতন হোন।
🙏 বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নিন।
সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক—সকল রোগী।
ছবিটি অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মোঃ রিয়াজ মৃধা থেকে নেওয়া।
ডা. সরওয়ার রশিদ তন্ময়
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ এবং ট্রমা সার্জন
কনসালট্যান্ট
আদ দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মগবাজার, ঢাকা