24/12/2025
কাউন্সেলিং টেবিলের গল্প
পর্ব ৫০৪
“অগণন মানুষের মৃত্যু হ'লে -
অন্ধকারে জীবিত ও মৃতের হৃদয়
বিস্মিতের মতো চেয়ে আছে;
এ কোন সিন্ধুর সুর: মরণের - জীবনের?
এ কি ভোর?
অনন্ত রাত্রির মতো মনে হয় তবু।“
জীবনানন্দ দাশ
সূর্যতামসী
"আমি কি করব বুঝতে পারছি না... আমার স্বামী তার বন্ধুদের সাথে আমাদের..." একটু থমকে আবার শুরু করলেন, "আমাদের ব্যক্তিগত একান্ত। ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলোর কথা নিয়ে গল্প করে।..." ভদ্রমহিলা বললেন।
কিছু মানুষের চোখ ঝকঝক করে। চোখ দেখলেই আপনি বলতে পারবেন স্বচ্ছ একটা মন তার। এই ভদ্রমহিলার চোখ সেরকম।স্পষ্ট উচ্চারণ। চোখে চোখ রেখে কথা বলা। আচরণ বসার ভঙ্গি সবকিছুতে শালীনতাকে ছাপিয়ে আভিজাত্যের ছাপ সুস্পষ্ট।
নরম স্বরে জানতে চাইলাম, "একান্ত ঘনিষ্ঠ বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন? "
ভদ্রমহিলার মনে হলো এক মুহূর্তের জন্য দম আটকে গেল।
"শারীরিক! যৌন জীবন!" ছোট্ট করে উত্তর দিলেন।
গ্লানির ছায়া মাঝে মাঝে মুখকে কিভাবে পলকে কালো করে দেয় সেই প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট, ভদ্রমহিলার চোখের কোলে, ঠোঁটের কোণে, গালে। মনে হল যেন এক পোচ কালি মুহূর্তে কেউ ঢেলে দিল।
চুপ করে থাকলাম।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রমহিলা আবার শুরু করলেন, "আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে মনে করতে পারি না কখনও দ্বিতীয় হয়েছি। আমার সিজিপিএ সব সময় অন্যদের উদাহরণের বিষয় থাকতো। যেহেতু দেশের বাইরে পড়ছি, আমার বাবা আমাকে ডরমে থাকতে না দিয়ে, একদম ক্যাম্পাসের কাছেই একটা বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে আমার মা বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। পড়াশুনায় ভালো, এক্সট্রা কারিকুলার কাজে ভালো, বিভিন্ন রকম দুর্যোগে ফান্ড রেইজিং, ছাত্রদের পক্ষে প্রতিবাদ সবকিছুতেই আমি সামনে থাকতাম। আমি বুঝতে পারতাম আমাকে অনেকেই পছন্দ করেন। কিন্তু আমার মাথায় ছিল, যেহেতু আমি ভালো মেয়ে, বাবা মার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করব না। বাবা মার সাথে একটা শর্ত ছিল, আমার পিএইচডির আগে যেন বিয়ে নিয়ে আমাকে চাপ না দেন। পিএইচডি শেষ হলো, তখন আমার বিয়ে হয়ে গেল। ইতিমধ্যে ওই বিশ্ববিদ্যালয় আমার চাকরি হয়। আমার বিয়েটা অনেকটা রূপকথার মতন। সবাই দেখতে চাইল যে, আমি কাকে বিয়ে করছি। কারণ আমি প্রচন্ড ভোকাল ছিলাম। কিন্তু কখনো সীমারেখা অতিক্রম করিনি। ইউনিভার্সিটিতে বিভিন্ন সময় ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ডায়লগে বসেছি। ফলে কেউ যে খুব চট করে প্রেম নিবেদন করবেন সেই সাহসটা পেতেন না। কিন্তু সবার সাথেই আমার একটা মৌখিক কথা বলার ছিল। আমি যে একদম বুঝতাম না কে কে আমাকে পছন্দ করেন সেটা না। সম্ভবত পারিবারিক শিক্ষার কারণেই আমি নিজের চারপাশে একটা বৃত্ত আঁকতে পারতাম। যেটা অতিক্রম করে, দুটো কথার পরে, তৃতীয় ধাপে প্রগোলভ সামনের মানুষটি হতে পারতেন না। আমি স্বীকার করছি, কেউ কেউ আমাকে অহংকারী বলতেন। কেউ কেউ বড়লোকের মেয়ে বলে হিংসা করতেন। কিন্তু কেউ কখনো, আমি ফুটানি করেছি বা অন্যকে হেয় করেছি এই দুর্নাম দিতে পারবেন না। এরপর বিয়ে হল, বাবা-মা এবং শ্বশুরবাড়ির পছন্দে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং। নামকরা পরিবার। সবকিছুই যেন পিকচার পারফেক্ট। যেহেতু সম্পূর্ণই অপরিচিত ছিলেন আমার স্বামী, আমরা এনগেজমেন্ট হওয়ার পর বছরখানেক সময় নেই দুই পরিবারের সম্মতিতেই। সিদ্ধান্ত হয়েছিল এর মধ্যে যদি আমাদের পারস্পরিক কোন বোঝার অসুবিধা হয়, যে কেউ স্বাচ্ছন্দ এনগেজমেন্ট ভেঙ্গে দিতে পারে। আমার স্বামীর মধ্যে কখনোই আমি, আমার সাথে বা অন্যের সাথে তথাকথিত অসভ্যতা করতে দেখিনি। কাজেই বিয়ে হল। আমরা চেষ্টা করছিলাম দুজনের কর্মস্থল একখানে নিয়ে আসার জন্য। তারআগ পর্যন্ত এভাবেই থাকুক। একটু পানি খাওয়া যাবে? "
পানি আসলো।
ছোট ছোট করে পানিতে চুমুক দিচ্ছেন ভদ্রমহিলা।
এক ঢোক পানি মুখে নিয়ে গিলছেন না।
ধরে রাখছেন।
বাইরে তীব্র রোদ।
শরৎকাল।
কিন্তু আকাশটা ধূসর।
মাত্রা ছাড়া গরম।
গ্লাসের গায়ে বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা জমছে।
ভদ্রমহিলার চোখেও জল জমছে।
ইথারে কোন শব্দ নেই। শুধু এসির হালকা গুনগুন আওয়াজ।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভদ্রমহিলা আবার শুরু করলেন, "যাই হোক, দাম্পত্যের শুরুটা ছিল চমৎকার। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আক্ষরিক অর্থেই, আমাকে মেয়ের মত আদর করেন। আমার স্বামীর সাথেও আমাদের কেমিস্ট্রিটা মিলে গেল। যেহেতু দুজন দুই জায়গায় থাকতাম, আমরা ছুটিগুলো জমিয়ে প্ল্যান করতাম একসাথে ঘুরে বেড়ানোর। কাজেই অনেকটা যেন বিবাহিত হয়েও, প্রেমিক প্রেমিকার মতন চুটিয়ে প্রেম করা। বেশ চলছিল। আমরা বাড়ি কিনলাম। পরিকল্পনা করলাম সন্তান নেবার। তারপর হঠাৎ করে একদিন, ওর বাসায় ছুটিতে গেছি... ও বাথরুমে, ওর ল্যাপটপ খোলা ছিল; এমন সময় ওর ল্যাপটপে একটা মেসেজ পপ আপ করলো। শব্দ হলো দেখে চোখ চলে গেল। আমি ইনটেনশনালি দেখতে চাইনি। দেখি, একজন লিখছেন, গতকাল কি কি পোজ ট্রাই করলি? এরপরই হাহা রিয়াক্ট দিয়ে আরেকজন লিখছেন অমুক পোজটা করে বলিস তো কেমন লাগে? আমি না তখনও স্পষ্ট বুঝিনি। খালি বুঝলাম এটা একটা গ্রুপ চ্যাট। এবং এই নামগুলো ওর বন্ধুদের। এরই মধ্যে তৃতীয় একজনের একটা লেখা ভেসে উঠলো, ওমুক পোজটা গতকাল করেছি। এতক্ষণে আমি আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলাম, যে এটা একটি ছেলেদের গ্রুপ, যেখানে তারা তাদের যৌনজীবনের প্রত্যেকটা গল্প শেয়ার করে। সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার এই প্রত্যেকটি মানুষকে আমি চিনি। আমার স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। উনাদের স্ত্রীদেরকে আমরা খুব ভালো করে চিনি। বিভিন্ন সময় আমরা একসাথে দলবেঁধে বেড়াতে গেছি। এবার স্ক্রল করে আমি উপরের লেখাগুলা যখন দেখতে শুরু করলাম ঘৃণায় আমার গা রিরি করে উঠলো। চারজনের গ্রুপ। এখানে প্রত্যেকে কোন ব্যক্তিগত আড়াল নাই। নিজের গল্প শেয়ার করে বিকৃত আনন্দ পাচ্ছে।" স্পষ্ট দেখতে পেলাম তীব্র ঘৃণায় ভদ্রমহিলার নাকের পাটা কুঁচকে গেল।
কেঁপে উঠলেন।
মুখ হা করে খাবি খাওয়ার মত করে নিশ্বাস নিতে থাকলেন।
"একটু ধীরে লম্বা করে নিঃশ্বাস নিন।" মৃদু কন্ঠে বললাম।
ভদ্রমহিলা উপরের দাঁতের পাটি দিয়ে নিজের ঠোট কামড়ে ধরেছেন।
প্রসাধনহীন ঠোঁট দেখতে পাচ্ছি ক্রমশ সাদা হয়ে যাচ্ছে। ভয় হল রক্ত না বের হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে ভদ্রমহিলা আবার বললেন, "আমার ভয়ংকর বমি পাচ্ছে। রেস্ট রুম কোন দিকে? "
দ্রুতই সাথে করে নিয়ে যেতেই দরজা খুলতে খুলতেই, দেখি ভদ্রমহিলা ছুটে যেয়ে বেসিনে হরহর করে বমি করে দিলেন।
দরজাটা আলগা ভেজিয়ে দিয়ে বললাম আমি কাছেই আছি প্রয়োজন হলে ডাকবেন।
সময় বয়ে যাচ্ছে ধীরগতিতে।
আমার চেম্বারের দরজায় কোকো নামের বিড়ালটি দিব্যি লেজ নাড়াচ্ছে।
মাঝখানে পশু চিকিৎসক জানিয়েছিলেন কোকো স্থুলতায় ভুগছে।
তাই তার নিয়মিত ডায়েট, ব্যায়াম ইত্যাদি ইত্যাদি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
আমি অদ্ভুত একটা জিনিস খেয়াল করেছি।
আমার সাথে কথা বলতে বলতে মানুষ যখন খুব ভার্লনারেবল ফিল করেন, কোকো এসে লাফ দিয়ে মানুষটার কোলে উঠে বসতে চেষ্টা করে।
অনেকটা যেন মানুষটাকে আশ্বস্ত করতে চায়।
প্রকৃতির কি অদ্ভুত যত্ন নেওয়ার পদ্ধতি।
ইদানিং খুব অবাক লাগে এত কম জানি বলে।
আরো অবাক লাগে এত কম বুঝি সেটা খেয়াল করে।
ভদ্রমহিলা এসে বসলেন।
চোখে মুখে পানি দিয়ে এসেছেন বুঝতে পারছি।
মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, "চা খাবেন?"
ভদ্রমহিলা সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "না। আমাদের ব্যক্তিগত কথা যে অন্যরা জেনে ফেলল এই চিন্তা আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আমি কি আর কখনো পারব ওর সাথে সহজ ভাবে কথা বলতে? "
আমার নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতার লাইন মনে পড়ল,
"তাড়াতে তাড়াতে তুমি কতদূর নেবে?"
নরম গলায় আস্তে আস্তে কথা বলা শুরু করলাম, বললাম, "দেখুন, আপনাকে প্রথমে এটা বুঝতে পারা জরুরী যে যে, আপনার এইসব রাগ, বিবমিশা, বিশ্বাসঘাতকতা, ইত্যাদি অনুভব করা সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক এবং ন্যায়সংগত ¹।"
"কিন্তু আমার স্বামী বলছে আমি নাকি বাড়াবাড়ি করছি। ছেলেরা নাকি বন্ধুদের মধ্যে এমন আলাপ করেই থাকে।" ভদ্রমহিলা মৃদুস্বরে বললেন।
আমি জানতে চাইলাম, "আর কি বলেছেন উনি? "
"বলেছে এটা নাকি আমার মানসিক রোগ। আমি নাকি সহজ হতে পারি না। আমারি মানসিক সমস্যা। তাই আমাকে নিজেই আপনার কাছে পাঠিয়েছে। কিন্তু নিজেকে এরকম উলঙ্গ করে মানুষের কাছে বর্ণনা করা, শুধু নিজেকে কেন নিজের স্ত্রীকেও উদোম করে দেয়া অন্যের কাছে, নিজের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলা প্রকাশ হয়ে যাওয়া, এই প্রসঙ্গে খারাপ লাগা কি মানসিক রোগ? " সামনের দিকে ঈষৎ ঝুকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ভদ্রমহিলা জানতে চাইলেন।
ভদ্রমহিলার চোখে চোখ রেখে উত্তর দিলাম, "দেখুন গোপনীয়তা আর প্রাইভেসির পার্থক্য আছে। একটা মানুষ টয়লেটে গেলে দরজাটা টেনে দেন। যদিও সবাই জানেন সেখানে তিনি কি করছেন। অথবা ধরুন একটা মানুষ গোসল করতে গেলে দরজাটা বন্ধ করে দেন। যদিও সবাই জানেন সেখানে তিনি কাপড় খুলেই গোসল করছেন। আবার বাসর রাত্রে নবদম্পতির শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়াটা যে স্বাভাবিক, সেটা সবাই জানলেও বেডরুমের দরজাটা কিন্তু বন্ধই থাকে। কাজেই আপনার যেই খারাপ লাগার অনুভূতিটা, সেটা মানসিক সমস্যা নয়। বরং এই খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। "
স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস দেখলাম ভদ্রমহিলার চোখে মুখে।
তারপর তিনি ফিসফিস করে বললেন, "কিন্তু এটা তো কোন রোগ নয়, না? তাহলে এতটা খারাপ লাগছে কেন? আমি কারও সামনে যেতে পারছি না, লজ্জায় মরে যাচ্ছি। চ্যাট বক্সের প্রত্যেকটি মানুষ আমার চেনা। "
আমি উত্তর দিলাম, "এটা আপনার দুর্বলতা নয়। এটি একটি আস্থার লঙ্ঘন যাকে বলে Betrayal Trauma ²। আমরা এটিকে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন বা সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউজ-এর একটি রূপ হিসেবেই দেখি ³। যখন আপনার সঙ্গী, যার সাথে আপনার সবচেয়ে গোপন ও নিরাপদ সম্পর্ক থাকার কথা, তিনি আপনার সম্মতি ছাড়াই সেই গোপনীয়তা ভেঙে দেন, সেটা একজন মানুষের জন্য ভয়ানক আঘাত ¹।"
"মানে... এটা একটা ধরনের নির্যাতন?" ভদ্রমহিলা মাথা কাজ করে জানতে চাইলেন।
"হ্যাঁ, অবশ্যই। এটি অননুমোদিতভাবে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা (Non-consensual sharing of intimate information) ¹। এটি শারীরিক নির্যাতনের মতোই একটি ক্ষমতার অপব্যবহার। এর মাধ্যমে আপনার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং আপনাকে লজ্জিত ও ছোট করা হয় ³। আপনার যে লজ্জা, অপমান ও অসম্মান বোধ করছেন, সেটাই এই নির্যাতনের সরাসরি প্রভাব ²। আর এই কথাগুলো কোনটাই আমার কথা নয়। গবেষণা তাই বলছে। বন্ধুদের সাথে তো বলাই যায়। সেই বলার একটা সীমা থাকে। রসিকতার একটা সীমা থাকে। এই সীমা যখন লংঘন হয়, এবং এই সীমালংঘনের যখন জন্য যখন জীবনসঙ্গী কষ্ট পান, তখন সেই সীমালংঘন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
ভদ্রমহিলা মূর্তির মতন বসে থাকলেন।
ঝর ঝর করে চোখ থেকে পানি পড়ছে।
গতকাল একজন দোলনচাঁপা দিয়েছেন আমাকে। দোলনচাঁপা মৃদু সুবাস ছড়াচ্ছে।
চুপ করে বসে থাকলাম।
খেয়াল করলাম ভদ্রমহিলা একবারও টিস্যু বক্স ব্যবহার করলেন না।
আঁচলে চোখ মুছে ভদ্রমহিলা বললেন "আমি এখন কি করব? আমি তাকে আর বিশ্বাস করতে পারব কি করে?"
উত্তর দিলাম, "সেটাই আমাদের একসাথে কাজ করার জায়গা। প্রথম ধাপ হলো আপনার নিজের মানসিক ক্ষতি কতটা গভীর হয়েছে সেটা বোঝা ²। আমরা এই আঘাত কাটিয়ে উঠতে কাজ শুরু করব। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু আপনি একা নন। আপনার অনুভূতি কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়, এবং সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা এগোব ³। চা খাবেন? "
ভদ্রমহিলা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "শুধু এটাই শুনতে চেয়েছিলাম যে আমি পাগল হইনি... আমার অনুভূতিগুলো বাস্তব। আমি চা খাই না। ধন্যবাদ। "
তারপর সেই কাউন্সিলিং টেবিলের গল্প।
সঙ্গীর সম্মতি ছাড়াই তার ব্যক্তিগৎ যৌন বিষয়বিস্তারিত কথা অন্যকে বলা একটি ক্লিনিকাল অবস্থা নয়, বরং এটি ইমেজ-ভিত্তিক আবিউজ (Image-based abuse) বা ব্যক্তিগত যৌন তথ্য অননুমোদিতভাবে শেয়ার করার একটি রূপ। এটি আস্থার গুরুতর লঙ্ঘন এবং এক ধরনের মানসিক নির্যাতন বা এভিউজ।
এই কাজটির জন্য কোনও নির্দিষ্ট ক্লিনিকাল শব্দ নেই, কিন্তু এটি যৌন সহিংসতা এবং মানসিক নির্যাতনের এর বৃহত্তর বিভাগের অধীনে পড়ে। কারণ এটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মারাত্মক মানসিক ও আবেগিক ক্ষতি করতে পারে।
ভদ্রমহিলার কন্ঠের হাহাকার ছিল, "আমি কি ওকে মাফ করতে পারব? ও ফিরে আসলে আবার কি বিশ্বাস করতে পারবো? ওর রুচির এই দৈন্যতা নিয়ে একই বিছানায় ওর সাথে শুতে পারবো? "
জীবনানন্দ দাশের সূর্য তামসী কবিতায় এরকমই কি হাহাকার ছিল যেখানে কবি বলছেন,
"যা জেনেছে – যা শেখেনি -
সেই মহাশ্মশানের গর্ভাঙ্কে ধূপের মত জ্ব’লে
জাগে না কি হে জীবন – হে সাগর -
শকুন্ত-ক্রান্তির কলরোলে।"
ভদ্র মহিলাকে বললাম, "আপনার স্বামীর পারভারশন বা অন্য কোন মানসিক জটিলতা আছে কিনা সেটা বিশ্লেষণ করা জরুরী। আর প্রয়োজন নিয়মিত সেশন নেওয়া। কারণ আপনার আত্মমর্যাদার জায়গাটাতে চিড় ধরেছে। সেই সাথে বিশ্বাস ভেঙে গেছে। কাজেই এই ভাঙ্গা গুলোর মেরামত দরকার।"
দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের মামলা আছে বাংলাদেশের আইনে। কিন্তু কাগজে কতটুকু পুনরুদ্ধার হলে মন জোড়া লাগে তা আমার জানা নেই। শুনেছি জাপানে বা পূর্বের দেশগুলোতে কোন কিছু ভেঙে গেলে সেটা নাকি সোনা গলিয়ে জোড়া লাগানো হয়। কিন্তু ভাঙ্গা পাত্রটি সোনার কল্যাণে দামী হয়ে উঠলেও ভাঙা দাগটি তো আর মুছে যায় না। এই জোড়া লাগানোর পদ্ধতিকে বলে কিনসুগি (সোনা দিয়ে ভাঙা জিনিস মেরামত)। বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ (এবং সর্বশেষ পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩)4 এর বিধান অনুযায়ী দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মামলা করা যায় । স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ, যদি অপর পক্ষ বৈধ কারণ ছাড়া একত্র বসবাসে অস্বীকৃতি জানান, তবে পারিবারিক আদালতে এই মামলা দায়ের করা সম্ভব । তবে আদালত কেবল অধিকার পুনঃস্থাপনের ডিক্রি দিতে পারেন; কাউকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে আনার আদেশ দেন না ।
এবার যদি একটু বাংলাদেশের দিকে খেয়াল করি তবে দেখব অনুমতিবিহীন অন্তরঙ্গ তথ্য শেয়ারিং এর প্রাদুর্ভাব ইদানিং ইন্টারনেটের বা অন্তর্জালিক সুবিধার কারণে ব্যাপক। বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে এটি একটি উদ্বেগজনক হার। ২০২২ সালে সাইবার ট্রাইব্যুনালে ১,৩০০-এর বেশি মামলা নিবন্ধিত হয়, যার অনেকগুলোই অন্তরঙ্গ ছবি শেয়ার সংক্রান্ত5।
এখন প্রশ্ন হল আপনি কেন এটাকে অপরাধ বলবেন?
এই অপরাধের কারণ: এটি ব্যক্তির গোপনীয়তা, মানসিকতা ও সম্মানের উপর চরম আঘাত করে। বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ২০১৮ এর ধারা ২৬, ২৭ ও ২৯ এ এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ 6।
প্রতিরোধ কি: 7
• ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি শেয়ারে সতর্কতা
• শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও Two-Factor Authentication ব্যবহার
• ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি
চিকিৎসা/সমাধান:
• মানসিক কাউন্সেলিং, প্রয়োজনে সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে ওষুধের ব্যবহার।
• আইনি সহায়তার জন্য জাতীয় হেল্পলাইন (৯৯৯) বা বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম টিমের সাথে যোগাযোগ।
• সামাজিক সমর্থন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
স্ত্রী/স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্তরঙ্গ তথ্য ফাঁস করার কারণ
প্রথমেই দেখি মানসিক কারণ:
• প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা (Revenge Porn)8
• নিয়ন্ত্রণের মনোভাব ও আগ্রাসী ব্যক্তিত্ব
• হিংসা, সন্দেহ বা বিচ্ছেদের আবেগ
দ্বিতীয়ত স্নায়বিক কারণ:
• আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা হ্রাস
• আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা 9
তৃতীয়ত পরিবেশগত কারণ:
• লিঙ্গবৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো
• ডিজিটাইল সাক্ষরতার অভাব ও প্রযুক্তির অপব্যবহার 10
• পারিবারিক সহিংসতার ইতিহাস
চতুর্থত অন্যান্য কারণ:
• মাদকাসক্তি
• অর্থনৈতিক স্বার্থ বা ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্য 10
আবার আলোচ্য ভদ্রমহিলায় ফিরি।
ভদ্রমহিলা নিজের যত্ন শুরু করেছেন, ওষুধ এবং কাউন্সিলিং নিয়মিত নিচ্ছেন।
যদিও প্রথমদিকে ভদ্রমহিলার স্বামী ওনাকে চাপ দিচ্ছিলেন মেনে নিতে। তবে ইদানিং উনি বুঝতে পারছেন যেটাকে উনি শোভন ভাবতেন সেটা আসলে অশোভন। আশার কথা হল ভদ্রমহিলার স্বামী রাজি হয়েছেন সচেতন ভাবেই নিজের মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে।
সময় লাগবে দুজনে বুঝতে পারছেন। এটুকুই ইতিবাচক পরিবর্তন আপাতত। কারণ কাউন্সিলিং মানে কোন জাদুর ছড়ি ঘোরানো নয় যে একটা দুটো সেশন এই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
সাধে কি আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষের কবিতায়, দাম্পত্যকে একটি শিল্প হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, "লোকে ভুলে যায়, দাম্পত্যটা একটা আর্ট, প্রতিদিন ওকে নূতন করে সৃষ্টি করা চাই"।
যারা যেকোনো সম্পর্কে, অন্যের গোপনীয়তা এবং প্রাইভেসির সম্মান রাখতে পারেন, তাদের জন্য সশ্রদ্ধ ভালোবাসা।
অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া,
চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার।
ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ।
(আমার চেম্বারে আসা মানুষটির অনুমতি সাপেক্ষে, মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, গোপনীয়তা বজায় রেখে প্রকাশ করা হলো।)
তথ্যসূত্র
১. Powell A, Henry N. Sexual Violence in a Digital Age. Palgrave Macmillan; 2017.
২. Freyd JJ. Betrayal trauma: Traumatic amnesia as an adaptive response to childhood abuse. Ethics & Behavior. 1994;4(4):307-329. doi:10.1207/s15327019eb0404_1
৩. World Health Organization. Violence against women prevalence estimates, 2018: global, regional and national prevalence estimates for intimate partner violence against women and global and regional prevalence estimates for non-partner sexual violence. World Health Organization; 2021. Accessed October 26, 2023.
4. দাম্পত্য অধিকার কীভাবে পুনরুদ্ধার করবেন. প্রথম আলো. আইন–অধিকার, তানজিম আল ইসলাম প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭: ৪১
5. Bangladesh Cyber Crime Tribunal. Annual Report 2022. Dhaka: Ministry of Home Affairs; 2023.
6.Digital Security Act, 2018. Act No. 46 of 2018. Parliament of Bangladesh.
7.Bangladesh Legal Aid and Services Trust (BLAST). Guide to Cybercrime Victim Support. Dhaka: BLAST; 2021.
8. Powell A, et al. Image-Based Sexual Abuse: A Study on Causes and Impacts. J Interpers Violence. 2020.
9.Verdejo-García A, et al. Impulsivity and Prefrontal Cortex Dysfunction. Neuropsychology. 2019.
10.Bangladesh Digital Security Act, 2018. Section 26-29.