11/02/2026
মানুষকে সৃষ্টি করাটা একটা বাজে পছন্দ বলে মনে হচ্ছে। আর ফেরেশতারা বলছে,
“আমাদের কাছে একটা ভালো বিকল্প আছে, আমরা নিজেদেরকে বিকল্প হিসেবে পেশ করছি।”
আপনি কি বুঝতে পারছেন? ফেরেশতারা ঠিক এটাই বলেছিল।
আর যখন তারা এই কথা বলছিল, তখন কে শুনছিল?
ইবলিস শুনছিল।
আর সে কি তখন কিছু বলেছিল?
না।
এটা বেশ মজার। এই লোকটা পুরো কথোপকথন দেখছে। আল্লাহ তখনও মানুষকে সৃষ্টি করেননি, কিন্তু সে অলরেডি কিছু একটা অনুভব করছে। কিন্তু সে সেটা বলছে না।
প্রথম যে জিনিসটা আমি চাই আপনারা জানুন—আজ রাতে শয়তান সম্পর্কে আপনারা যা কিছু শিখবেন, তার প্রতিটি কাজ সে আসলে আপনাদের দিয়ে করাতে চায়। সে নিজে যা অনুভব করে, সে চায় আপনারাও তাই অনুভব করেন। সে যা যা করেছে, সে চায় আপনারাও তাই করেন।
আর সে প্রথম যে কাজটা করল—সে কিছু একটা অনুভব করল। কোনো একটা বিষয় তাকে কষ্ট দিচ্ছিল, কিন্তু আল্লাহর সাথে সেটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলে পরিষ্কার করার বদলে সে সেটা নিজের ভেতরে চেপে রাখল।
ফেরেশতারাও কিছু একটা অনুভব করেছিল, কিন্তু তারা কী করেছিল?
তারা সেটা বলে দিয়েছিল।
“হ্যাঁ আল্লাহ, আমাদের কাছে এটা ঠিক যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে না। আপনি তো সব জানেন, কিন্তু আমরা এটা বুঝতে পারছি না।”
তারা সরাসরি বলেছিল।
কিন্তু ইবলিস বলেনি।
এখন, এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ মাঝে মাঝে শয়তান ঠিক এভাবেই কাজ করে।
ধরুন আপনারা দুইজন দেখা করলেন। কেউ একজন সালাম দিল, কিন্তু আপনার চোখের দিকে তাকাল না। আপনি তখন ভাবছেন—
“সে চোখের দিকে তাকাল না কেন? সে কি আমার ওপর রাগ করে আছে? সেই যে একবার আমি তাকে ইমেইল করেছিলাম আর সে উত্তর দেয়নি, সেজন্যই কি সে এমন করল?”
কিন্তু আপনি মুখে কিছুই বলছেন না।
এটা কোথায় চলছে?
আপনার মাথার ভেতরে।
এখন ধরুন ঈদের সময় আপনি মানুষকে দাওয়াত দিচ্ছেন কিন্তু ভাবছেন—
“আমি মনে হয় একে দাওয়াত দেব না। মনে আছে সেই যে চোখের দিকে না তাকানোর ব্যাপারটা?”
এটা ধীরে ধীরে তুষারগোলকের মতো বড় হতে থাকে।
আপনি ভাবেন—
“সে আমাকে অনেক ঘৃণা করে। আমি জানি না আমি তার কী ক্ষতি করেছি।”
কিন্তু আপনি জানেন না সে আসলে কী ভাবছে।
আপনি নিজের মাথার ভেতর একটা সমান্তরাল জগত তৈরি করে ফেললেন—কারণ আপনি জিজ্ঞেস করেননি,
“হেই, সব ঠিক আছে তো?”
হয়তো সে উত্তর দিত—
“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। আসলে আমার অ্যালার্জি হয়েছে।” (হাসি)
“তুমি জানো না আমার একটা চোখ ট্যারা, আমি আসলে ওদিকে তাকাচ্ছিলাম কিন্তু তোমার মনে হয়েছে অন্য দিকে তাকাচ্ছি।”
একবার পরিষ্কার করে নিলে তো বিষয়টা পুরো আলাদা হয়ে যায়, তাই না?
যেমন আমি আপনাদের একবার বলেছিলাম—এক আলেমকে আমি খুব শ্রদ্ধা করতাম। একটা কনফারেন্সে উনার সাথে দেখা হলো। আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। আমি সেলফি-টেলফি তুলি না, তাই শুধু উনার কাছে গিয়ে বললাম,
“আসসালামু আলাইকুম।”
উনি স্টলে নিজের কাজ করে যাচ্ছিলেন, মুখ তুলেও তাকালেন না।
তিনবার বললাম!
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
আমি ভাবলাম—
“ওয়াহ! আমি এই লোকটাকে এত শ্রদ্ধা করতাম!”
আমি যখন চলে যাচ্ছি, অন্য একজন এসে অন্য পাশ থেকে উনাকে সালাম দিল। উনি সাথে সাথে বললেন,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম! ভাই কেমন আছেন? আপনার নাম কী?”
আমি ভাবলাম—
“আমিও তো ওদিক দিয়েই চেষ্টা করতে পারি।”
আমি ওই পাশ দিয়ে গিয়ে সালাম দিলাম, এবং উনি উত্তর দিলেন।
আসলে উনি এক কানে কালা ছিলেন!
তো আপনি যদি বিষয়টি পরিষ্কার না করেন, তবে আপনি নিজের মাথায় একটি সমান্তরাল বাস্তবতা তৈরি করবেন, তাই না?
ইবলিস আল্লাহর আনুগত্য করতে করতে নিজেকে এতটাই যোগ্য প্রমাণ করেছিল যে সে ফেরেশতাদের সাথে মিটিংয়ে বসার সুযোগ পেত।
যখন আল্লাহ বললেন,
“আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি পাঠাতে যাচ্ছি।”
নতুন সৃষ্টি? কেন?
আর এর মধ্যে এত বিশেষ কী আছে?
আল্লাহ বললেন—
“সে আমার রূহ ধারণ করবে, তার ভালো-মন্দের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে।”
ইবলিস ভাবছিল—
“আমি তো সারাজীবন সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছি। এমনকি ফেরেশতারা তো ভুল করার ক্ষমতাই রাখে না, আমি তাদের চেয়েও ভালো। অথচ আপনি আমার কথা ভাবছেন না?”
সে কি এগুলো বলেছিল?
না।
সে মনে মনে ভাবছিল।
তো প্রথম সমস্যা হলো—নেতিবাচক অনুভব করেও সেটা না বলে ভেতরে সংক্রমণ বাড়ানো।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো—
“কেন আমাকে নয়? কেন ওকে?”
ইবলিসকে কি উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়নি?
হ্যাঁ, দেওয়া হয়েছিল।
আদমকে দায়িত্ব দেওয়ার ফলে কি ইবলিসের কিছু কমে গিয়েছিল?
না।
ইবলিস তখনও উচ্চ মর্যাদাতেই ছিল।
কিন্তু ইবলিসের সমস্যা ছিল—সে যা পেয়েছে তাকে আর মূল্যবান মনে করছিল না, যখন সে অন্য কাউকে কিছু পেতে দেখছিল।
সে চেয়েছিল সমস্ত স্বীকৃতি আর প্রশংসা যেন কেবল তার দিকেই আসে।
অন্য কেউ প্রশংসা পেলে সে মনে করত, সেটা যেন তার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
আমি আপনাদের একটা উদাহরণ দেই।
ধরুন মসজিদের কোনো ফান্ডরেইজার অনুষ্ঠান। শেষে সব ভলান্টিয়ারদের ধন্যবাদ দেওয়া হচ্ছে—
“আমি ধন্যবাদ দিতে চাই আব্দুল করিমকে, বোন ফাতিমাকে, ইয়াহিয়াকে, আব্দুল্লাহকে এবং জয়নাবকে…”
আর সেখানে এক ‘মরিয়ম’ নিজের নাম শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল।
সে হয়তো ‘বিনয় বা হিউমিলিটি’ ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি! (হাসি)
সে অপেক্ষা করছে।
কিন্তু তারা তার নামটা বলতে ভুলে গেল।
সে তখন ভাবছে—
“এত কাজ করলাম! আমার নামটা পর্যন্ত বলতে পারল না?”
“আমি তো হ্যান্ডআউটে নিজের নামটা ১৮ ফন্ট সাইজে আর বোল্ড করে দিয়েছিলাম যেন কারো নজর না এড়ায়।”
“আমি জানি তারা ইচ্ছা করেই আমার নাম নেয়নি।”
শয়তান চায় আপনি অনুভব করুন—
অন্য কেউ স্বীকৃতি পাওয়া মানে আপনার থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া।
এটা পরিবারেও শুরু হয়।
মা যখন আপনার ভাইকে জড়িয়ে ধরে, তখন আপনার চোখ জ্বলে ওঠে!
আপনি ভাবেন—
“আজ রাতে ঘুমের মধ্যে তোর মুখে আমার নোংরা মোজা ভরে দেব!” (হাসি)
“কেন আমি ওই আদরটা পেলাম না?”
এখন একটা বাস্তব উদাহরণ দেই।
আপনার এক বাচ্চা সারা সপ্তাহ মিথ্যা বলেছে যে সে হোমওয়ার্ক করেছে—আসলে করেনি। টিচার নোট পাঠিয়েছে।
আর অন্য বাচ্চা অংকে ৯০ পেয়েছে।
দুইজনই আপনার কাছে এল।
ভালো বাচ্চাটা বলল—
“আমি কি আইসক্রিম পেতে পারি?”
আপনি বললেন—
“হ্যাঁ, অবশ্যই! তুমি এটা অর্জন করেছ।”
অন্যজন বলল—
“আমি কি পেতে পারি?”
আপনি বললেন—
“না। তুমি যা করেছ সেটা নিয়ে ভাবো। টিচারকে কেন এমন নোট পাঠাতে হলো? আর তুমি আমার সাথে মিথ্যা বলেছ।”
এখন এই বাচ্চাটা যাকে বকা দেওয়া হলো, সে ভাবছে—
“ওয়াহ! ও আইসক্রিম পাচ্ছে আর আমি বকা? মা ওকে ভালোবাসে, আমাকে বাসে না।”
কিন্তু আসলে কি তাই?
এই দুইটাই কি ভালোবাসার কাজ নয়?
কারণ যে মিথ্যা বলছে তাকে আপনি আইসক্রিম দিতে পারেন না।
তাকে শাসন করাই হলো ভালোবাসা।
আপনি সবাইকে একইভাবে ট্রিট করতে পারেন না।
ঠিক এই অনুভবটাই শয়তান ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
ইবলিস এখনও কিছু বলেনি, কিন্তু তার চুপ থাকাটাই অনেক কিছু বলছিল।
আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন—
“আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।”
এখন গল্পের পরবর্তী অংশ।
আমাদের সবাইকে কিন্তু একসাথে সৃষ্টি করা হয়েছিল।
আমরা কোনো আধ্যাত্মিক আইসিইউ-তে ছিলাম না।
আমরা সবাই সচেতন ছিলাম এবং আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলতাম।
আমাদের এই শরীরটা কেবল একটা খোলস—একটা সাময়িক ঘর।
কিন্তু আমাদের আসল সত্তা—রূহ—অনেক আগে সৃষ্টি হয়েছে।
রাসূল (সা.) বলেছেন, রূহরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল।
কখনো কি হয়েছে—সম্পূর্ণ অপরিচিত কারো সাথে দেখা হয়েছে, যার ভাষাও আলাদা, কিন্তু আপনার মনে হচ্ছে আপনি তাকে চেনেন?
আবার নিজের পরিবারের কারো দিকে তাকিয়ে মনে হয়—
“আমি তোমার আত্মীয় হলাম কীভাবে? বুঝলাম না!”
কিছু রূহকে একে অপরের কাছাকাছি রাখা হয়েছিল।
যখন তারা পৃথিবীতে একে অপরকে খুঁজে পায়, তারা সেরা বন্ধু হয়ে যায়।
আবার কিছু রূহ একে অপরের থেকে অনেক দূরে ছিল।
তারা হয়তো দুজনেই ভালো মানুষ, কিন্তু একে অপরকে সহ্য করতে পারে না—চুম্বকের বিপরীত মেরুর মতো।
তো যাই হোক—
আল্লাহ আদমের শরীর বানালেন মাটি দিয়ে, রূহ ফুঁকে দিলেন।
আল্লাহ আদমকে মনোনীত করলেন।
মনোনীত করার মানেই হলো—সেখানে অনেকগুলো অপশন ছিল।
সব রূহদের মাঝ থেকে আদমকে বেছে নিয়ে ওই শরীরে দেওয়া হলো।
এরপর আল্লাহ আদমের সামনে আমাদের সবাইকে নিয়ে এলেন—
ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ সবাই সেখানে ছিল!
এবং আল্লাহ আদমকে আমাদের প্রত্যেকের নাম এবং গুণাবলী শিখিয়ে দিলেন।
“এই সন্তানটি খুব সৃজনশীল হবে।”
“এ হবে খুব রাগী।”
“এ হবে অংকে তুখোড়।”
“এ হবে অনেক ধৈর্যশীল।”
যেন প্রতিটি মানুষের একটা পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল আদমকে দেওয়া হলো।
‘আসমাহ’ শব্দের মানে নাম এবং গুণ—দুটোই।
এবার আল্লাহ ফেরেশতাদের নিয়ে এলেন।
ফেরেশতাদের সমস্যা কী ছিল?
“মানুষ রক্তপাত করবে।”
আল্লাহ বললেন, মানুষের ভেতরে রূহ আছে যা তাকে বিশেষ করে।
আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন—
“এই মানুষগুলোকে কি তোমরা বর্ণনা করতে পারবে? এদের নাম বলতে পারবে?”
তারা বলল—
“আমরা কিছুই জানি না, আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া।”
আল্লাহ আদমকে ডাকলেন।
বললেন—
“তুমি এদের নাম আর গুণ ফেরেশতাদের বর্ণনা করো।”
যখন এই ডেমোনেস্ট্রেশন চলছিল, তখন পাশে দাঁড়িয়ে কে দেখছিল?
ইবলিস।
আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একটা নূর বা আলো আছে।
এমনকি ফেরাউনের ভেতরেও সেই আলো ছিল।
মুসা (আ.)-কে বলা হয়েছিল ফেরাউনের সাথে নরমভাবে কথা বলতে—কারণ তার ভেতরেও তখনও সেই রূহ ছিল।
আদম আমাদের সবার ভেতরের ভালো গুণগুলো ফেরেশতাদের সামনে তুলে ধরলেন।
ফেরেশতারা ওই অসীম গুণাবলী দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল।
তারা বুঝে গেল।
আল্লাহ তখন বললেন—
“আমি কি বলিনি যে আমি যা জানি তোমরা তা জানো না?”
“আমি তাদের শুধু মস্তিষ্ক দেইনি।
আমি তাদের রূহ দিয়েছি—যা তাদের ভেতরের আলো বাড়াতে সাহায্য করবে।”
ফেরেশতারা তখন সিজদায় পড়ে গেল।
জান্নাতে গেলে আমার একটা অদ্ভুত আবদার থাকবে।
আমি বলব—
“আল্লাহ, আমি কি ওই দৃশ্যটা আবার দেখতে পারি? তবে ক্যামেরাটা যেন ইবলিসের ওপর থাকে!”
আমি কল্পনা করি—তার পাশের ফেরেশতা হয়তো তাকে বলছিল,
“মানুষগুলো কত চমৎকার, তাই না? দারুণ না?”
আর ইবলিস?
এখনও চুপ।
কিন্তু এখন সময় হয়েছে…
প্রথম সিজদাহ করার।
নোমান আলী খান