03/12/2025
🔴🔴 IBS-এর সংজ্ঞা ও ইতিহাস (পর্ব ১)
🔷 ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) একটি দীর্ঘমেয়াদি ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডার, যা বহুদিন ধরে অত্যন্ত সাধারণ রোগ হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন গ্রিসে প্রায় ৩০০০ বছর আগে হিপোক্রেটিস এমন এক রোগীর বর্ণনা দিয়েছিলেন, যার পেটব্যথা, অনিয়মিত মলত্যাগ, ফুলে থাকা এবং হঠাৎ মলত্যাগের তাড়া—এসব লক্ষণ ছিল। অর্থাৎ সেই সময়েও IBS-এর মতো রোগের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।
🔷 সময়ের সঙ্গে সঙ্গে IBS নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, যদিও কোনো মানদণ্ডই পুরোপুরি নিখুঁত নয় এবং এখনো পর্যন্ত IBS নির্ণয়ের জন্য কোনো “গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড” নেই।
Manning Criteria (1978)
১৭৯৮ সালে Manning ও সহকর্মীরা প্রথম বিশ্বব্যাপী লক্ষণ-ভিত্তিক IBS নির্ণয়ের মানদণ্ড তৈরি করেন। এতে ছয়টি প্রধান লক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল—
1. মলত্যাগের পর পেটব্যথা কমে যাওয়া
2. ব্যথা শুরুর সময় ঢিলা পায়খানা
3. ব্যথা শুরুর পর মলত্যাগের সংখ্যা বৃদ্ধি
4. পেটে ফাঁপা ভাব
5. মলের সঙ্গে শ্লেষ্মা বের হওয়া
6. মলত্যাগের পরও সম্পূর্ণ খালি না হওয়ার অনুভূতি
ধীরে ধীরে Manning মানদণ্ড কম কার্যকর মনে হতে থাকে, কারণ এটি স্ত্রী রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী ছিল এবং IBS-D ও IBS-C পার্থক্য করা কঠিন ছিল।
Kruis Score (1984)
১৯৮৪ সালে Kruis প্রমুখ IBS এবং অর্গানিক রোগ পৃথক করতে একটি স্কোরিং সিস্টেম তৈরি করেন।এতে IBS-এর পক্ষে পয়েন্ট এবং অর্গানিক রোগের পক্ষে নেগেটিভ পয়েন্ট ছিল।কিন্তু স্কোর যাচাই জটিল হওয়ায় এটি খুব জনপ্রিয় হয়নি।
Rome Criteria–এর সূচনা (1988)
১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা একত্র হয়ে Rome Foundation গঠন করেন, যা IBS শ্রেণিবিন্যাস ও নির্ণয় মানদণ্ড নির্ধারণের কাজ শুরু করে।
Rome I Criteria (1989)
Rome I মানদণ্ড ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়। এটি গবেষণায় ব্যাপক ব্যবহৃত হলেও অনেক ক্লিনিশিয়ানের কাছে ব্যবহার কঠিন ছিল।
Rome II Criteria (1999)
১৯৯৯ সালে Rome I সংশোধন করে Rome II মানদণ্ড চালু করা হয়।এর প্রধান বৈশিষ্ট্য—
• গত ১২ মাসে অন্তত ১২ সপ্তাহ (ধারাবাহিক হওয়া জরুরি নয়) উপসর্গ থাকতে হবে
✅ Rome III Criteria (2006)
Rome II-র পর ২০০6 সালে Rome III মানদণ্ড প্রকাশিত হয়। Rome I ও II যেখানে মূলত মতৈক্যের ভিত্তিতে তৈরি ছিল, Rome III ছিল অধিক প্রমাণভিত্তিক (evidence-based)।
✅Rome IV criteria (2016)
Rome IV হলো IBS নির্ণয়ের সর্বশেষ ও বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মানদণ্ড। এটি গবেষণা, চিকিৎসা ও ক্লিনিক্যাল চর্চায় ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। Rome IV অনুযায়ী IBS হলো—
একটি ফাংশনাল বাওয়েল ডিসঅর্ডার যেখানে পুনরাবৃত্ত পেটব্যথা মলত্যাগ বা মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত থাকে।
Rome IV-এর
• সংবেদনশীলতা: ৬২%
• বিশেষত্ব: ৯৭%
🔺🔺ROME IV অনুযায়ী IBS নির্ণয়ের ক্রাইটেরিয়া
গত ৩ মাসে রোগীর পুনরাবৃত্ত পেটব্যথা থাকবে এবং সেই ব্যথা প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১ দিন হবে।
এর সাথে নিচের ৩টি মানদণ্ডের মধ্যে অন্তত ২টি থাকতে হবে:
1. পেটব্যথা মলের সাথে সম্পর্কিত
• অর্থাৎ মলত্যাগের পর ব্যথা কমে বা বাড়তে পারে।
2. মলত্যাগের ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন
• যেমন আগের তুলনায় মলত্যাগ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া।
3. মলের আকৃতি বা গঠনে পরিবর্তন
• যেমন মল শক্ত হয়ে যাওয়া, খুব নরম/পাতলা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
✔️Rome III থেকে Rome IV–এ প্রধান পরিবর্তনসমূহ
১. “Abdominal discomfort” শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে
অনেক রোগী “ডিসকমফোর্ট” শব্দটিকে কোনো কোনো সময় হালকা ব্যথা বা ব্লোটিং ভেবে নেন। আবার বহু ভাষায় এর সঠিক প্রতিশব্দ নেই। তাই Rome IV-এ শুধুমাত্র “abdominal pain” (পেটব্যথা) রাখা হয়েছে।
২. ব্যথার মাত্রা/ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি
Rome IV-এ বলা হয়েছে—
• গত ৩ মাসে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১ দিন পেটব্যথা থাকতে হবে।
Rome III-এ ছিল—
• প্রতি মাসে মাত্র ৩ দিন ব্যথা থাকলেই চলত।
৩. Defecation-এর সাথে সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত
Rome III: মলত্যাগের পর ব্যথা কমে যায়
Rome IV: ব্যথা মলত্যাগের সাথে সম্পর্কিত—
কমতে পারে, বাড়তে পারে, বা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
৪. “Onset” শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে
Rome III-এর criteria ২ ও ৩-এ থাকা onset শব্দটি Rome IV-এ আর নেই।
Rome IV অনুযায়ী IBS-এর সাবটাইপসমূহ
Rome IV IBS-কে চারটি সাবটাইপে ভাগ করে, যেটি নির্ভর করে রোগীর “প্রধান” (predominant) মলত্যাগের ধরন বা মলের কনসিস্টেন্সির ওপর।
এটি নির্ণয়ের জন্য Bristol Stool Form Scale (BSFS) ব্যবহৃত হয়।
➡️ শুধুমাত্র অস্বাভাবিক মলত্যাগের দিনগুলো বিবেচনা করে সাবটাইপ নির্ধারণ করতে হবে।
Clinical trial-এ অন্তত ১৪ দিন (২ সপ্তাহ) দৈনিক মল ডায়েরি ব্যবহার করে সাবটাইপ নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
Bristol Stool Form Scale (সহজ ব্যাখ্যা)
মোট ৭ ধরনের মল দেখা যায়:
👉 Type 1 – শক্ত শক্ত ছোট ছোট গোল দানার মতো মল
• খেজুরের বিচি বা ছাগলের লাদির মত
• ➡ অত্যন্ত কোষ্ঠকাঠিন্য
👉 Type 2 – শক্ত লম্বা দলাদলা মল
• লম্বা কিন্তু উপরে ছোট ছোট গাঁটের মতো দেখা যায়
➡ কোষ্ঠকাঠিন্য
👉 Type 3 – লম্বা কিন্তু কিছুটা ফাটল থাকে
• মোটামুটি শক্ত, তবে বের হতে খুব কষ্ট হয় না
➡ স্বাভাবিকের কাছাকাছি
👉 Type 4 – লম্বা, নরম ও একেবারে মসৃণ
• কলার মতো লম্বা ও মসৃণ
• সহজে বের হয়
➡ এটাই স্বাভাবিক বা আদর্শ মল
👉 Type 5 – নরম, ছোট ছোট টুকরা, কিন্তু আকৃতি আছে
• নরম গোল টুকরা, সহজে বের হয়
➡ পেট একটু নরম/ ফাইবার কম
👉 Type 6 – খুব নরম, আধা-তরল, আকার ঠিক নেই
• ভাত-মাখা বা খিচুড়ির মতো নরম
➡ ডায়রিয়া
👉 Type 7 – পুরো পানি পানি মল
• পানি ছাড়া কোনো আকারই নেই
➡ তীব্র ডায়রিয়া
🔎 সংক্ষেপে
• Type 1–2 → কোষ্ঠকাঠিন্য
• Type 3–4 → স্বাভাবিক মল
• Type 5–7 → পাতলা পায়খানা/ডায়রিয়া
ROME IV অনুযায়ী IBS এর সাবটাইপ
1. IBS-C (Constipation predominant) – শক্ত মল প্রধান
2. IBS-D (Diarrhea predominant) – পাতলা মল প্রধান
3. IBS-M (Mixed type) – কখনো শক্ত কখনো পাতলা
4. IBS-U (Unclassified) – স্পষ্টভাবে এক ধরনের নয়
১. IBS-C (Constipation predominant)
• ≥ ২৫% মল BSFS টাইপ ১ বা ২
• < ২৫% মল টাইপ ৬ বা ৭
২. IBS-D (Diarrhea predominant)
• ≥ ২৫% মল BSFS টাইপ ৬ বা ৭
• < ২৫% মল টাইপ ১ বা ২
৩. IBS-M (Mixed type)
• ≥ ২৫% মল টাইপ ১ বা ২fl
• ≥ ২৫% মল টাইপ ৬ বা ৭
৪. IBS-U (Unclassified)
যারা IBS-এর মানদণ্ড পূরণ করে, কিন্তু উপরোক্ত তিনটি গ্রুপের কোনোটিতে পড়ে না।
🚫 Red flag symptoms থাকলে IBS মনে করা যাবে না
• অনিচ্ছাকৃত ওজন কমা
• রাতের বেলা ঘন ঘন ডায়রিয়া
• পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া
• রক্তস্বল্পতা
• কোলন ক্যান্সারের ফ্যামিলি হিস্ট্রি
• ৫০ বছরের উপরে এবং একদম নতুন লক্ষণ যা আগে কখনো ছিল না।
এগুলো থাকলে colonoscopy/other tests জরুরি।
🏛️ডা: নিখিল চন্দ্র রায়
সহকারি অধ্যাপক, পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিভাগ।
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ধানমন্ডি।