22/09/2016
সাপ্তাহিক ‘জনমন’ পত্রিকায় ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬-এ প্রকাশিত আমার লেখা।
-------------------------------
নিরোগ ঘাঁড়, ব্যথা মুক্ত জীবন
---------------------------------
প্রফেসর আলতাফ হোসেন সরকার
---------------------------------
আমরা সরাজীবনে নানান রকম ব্যথায় ভুগে থাকি। আর সেই ব্যথা যদি হয় ঘাঁড়-এর ব্যথা তাহলেই নানা প্রকার বিপত্তি দাঁড়ায় যেমন- ঘুমাতে ব্যথা হয়, বসে বসে কাজ করতে ব্যথা হয়, ভ্রমন করতে ব্যথা হয় ইত্যাদি। এমনই একজন রুগী ৪৩ বছর বয়সী পাবনা জেলার বেড়া থানার রোকেয়া নাসরিন নিয়মিত হাঁটেন প্রতি সকালে। কিন্তু গত নয় মাস আগে হাঁটতে গিয়ে বাম কাঁধের উপর পড়ে যান। তখন থেকেই অল্প অল্প ব্যথা কাঁধে অনুভব করে। এখন ঘাড়ে ব্যথা, ঘাড় থেকে ব্যথা ডান কাঁধে এবং হাতে চলে আসছে। তার ডান কাঁধের রোটেটর কাফ এবং কেপসুলের পরীক্ষা করে দেখলাম কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু রোগী অনেক কষ্ট পাচ্ছে। এরপর তার নেক বা ঘাড় পরীক্ষা করে দেখলাম অনেক অসুবিধা আছে যেমন- ফরোয়ার্ড হেড পোশ্চার আছে, রাউন্ডেড শোল্ডার আছে। ডান এবং বাম দিকে ঘাড়ের রোটেশন অনেক কমে গেছে। ডান দিকে নেক মাসেলে এবং ট্রাপিজিয়াস মাসেলে অনেক ব্যথা। এছাড়াও তার মিডিয়ান নার্ভ টাইট হয়ে আছে। এই রোগীকে আমরা যতই শোল্ডারের(কাঁধ) চিকিৎসা করি না কেন ব্যথা তার যাবে না। তার অসুবিধা হচ্ছে ঘাড়ে। সুতরাং ঘাড়ের সঠিক চিকিৎসা করে দিলে রোগী ভালো বোধ করবে ইন শাহ আল্লাহ। তার চিকিৎসা পদ্ধতি হবে- ওয়াক্সপ্যাক দিয়ে নেক ও ট্রাপিজিয়াস মাসেলকে স্ট্রোকিং করে দিতে হবে। এরপর আল্ট্রাসাউন্ড দিতে হবে। তারপর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার অন্যতাম মোডালিটিস লো-লেভেল লেজার থেরাপি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। স্ট্রেসিং এই চিকিৎসায় অন্যতম রোল প্রদান করবে। সুতরাং নিয়ম অনুযায়ী স্ট্রেসিং করতে হবে। মনে রাখবেন, আমাদের সমস্ত শরীরে ফাসা এবং মাসেল অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যখনই কোন রুগীর এইরকম অসুবিধা হয় এবং দীর্ঘদিন যাবৎ সঠিক চিকিৎসা হয় না, তাদের ফাসাগুলো মাসেলের সঙ্গে টাইট হয়ে যায়। অবশ্যই এই টাইট ফাসা এবং মাসেলকে ফিজিওথেরাপি বিজ্ঞানীদের নিয়ম অনুযায়ী রিলিজ করতে হবে। এরপরে নেক মাসেল-এর শক্তি বাড়াতে হবে। রেঞ্জ বা মুভমেন্ট বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, নেক-কে স্ট্যাবেলাইজড করতে হবে। উপুর হয়ে এবং চিৎ হয়ে শুয়ে সঠিক নিয়মে নেকের পেছনের এবং সামনের মাসেলকে শক্তিশালী করতে হবে। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের দেয়া উপদেশ অনুযায়ী নিয়মিত এক্সারসাইজ সঠিকভাবে করতে হবে। বসা এবং শোয়ার সময় ভঙ্গি মেনে চলতে হবে। যে কাজ করলে কষ্ট বেড়ে যায় ঐ কাজ করবেন না। গরম সেক এবং গরম পানি দিয়ে কিছুদিন গোসল করতে হবে। ফার্মবেড-এ ঘুমাবেন এবং যেভাবে ঘুমালে কষ্ট না হয় সেভাবে ঘাঁড়, মাথা রেখে ঘুমাবেন। ধুমপান বর্জন করুন।
ঘাঁড় ব্যথার জন্যে অনেক লোকই তার দৈনিন্দন জীবনের কাজ সঠিকভাবে করতে পারছে না এবং আর্থিক ক্ষতি সাধনও হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, ৬৭-৭১% লোক ঘাঁড় ব্যথায় ভুগে থাকেন। এই ঘাঁড় ব্যথায় বেশিরভাগ ভুগেন মহিলা, উন্নত দেশের লোক এবং যারা শহরে বাস করেন অধিকাংশ লোকের ঘাঁড়ের ব্যথা যেকোন সময় হতেই পারে এবং কম বয়সী ও বেশি বয়সেও হতে পারে। তবে ৩৫ কিংবা তার উর্ধে¦ বয়সী লোকদের বেশি দেখা যায়।
এই ঘাঁড় ব্যথা মাস্কুলোস্কেলিটাল রোগের মধ্যে অন্যতম রোগ। ইহা একটি গ্লোবাল বার্ডেন ডিজিজ। আমাদের দেশে যারা এই রোগে আক্রান্ত হয় তাদের মধ্যে- টেবিলে বসে যারা কাজ করে বা পড়াশুনা করে, গৃহিনী, শিক্ষক, কম্পিউটার ওয়ার্কার, ফিমেল অফিস ওয়ার্কার এবং আরও অনেকেই।
যে সমস্ত রুগীরা ঘাঁড় ব্যথায় ভুগেন তাদের ট্রাপিজিয়েস মাসেল অধিকাংশ সময়ই বিরামহীনভাবে কাজ করে। ঘাঁড় ব্যথার কারণের জন্যে অধিকাংশ সময় এই ট্রাপিজিয়াস মাসেল-কে দ্বায়ী করা হয়। ট্রাপিজিয়াস মাসেল-এর এরকম কাজ দিনের পর দিন মাসেলের বায়োমেকানিক্যাল মেটেরিয়াল-এর পরিবর্তন ঘটায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ট্রাপিজিয়াস মাসেল-এর কার্যকারীতা এবং ঘাঁড় ব্যথার মধ্যে সাদৃশ্য খুজে পাওয়া যায়।
সুপ্রিয় পাঠক মনে রাখবেন, বিভিন্ন কাজের জন্যে ঘাঁড় ব্যথা হতে পারে যেমন- যারা বেশি কম্পিউটারে কাজ করে তাদেরও ঘাঁড় ব্যথা হতে পারে। পঞ্চাশ ভাগ ওয়ার্কারদের কাজের সঙ্গে ঘাঁড়ের ব্যথার সম্পর্ক রয়েছে। যারা বিভিন্ন ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন তাদের ঘাঁড়ের ব্যথার প্রবণতা অনেক বেশি। যেমন- অফিসে যারা কাজ করেন তাদের ঘাঁড়ের ব্যথা অন্যাদের তুলনায় ৫০-৬০% বেশি হয়।
ঘাঁড়ের ব্যথা প্রতিরোধ, চিকিৎসার চেয়ে অনেক উপকারী। যেমন- সার্ভাক্যাল কলার ব্যবহার করার সময় সতর্কতা মেনে চলতে হবে, কারণ কলার ব্যবহার করলে অনেক সময়ই নেকের বা ঘাঁড়ের মবিলিটি কমে যায় এবং মাংস দূর্বল হয় যাহা ঘাঁড়ের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়, সঠিকভাবে ঘুামনো, কম্পিউটার-এ কাজ করার সময় যেন কম্পিউটার স্ক্রীন এবং আই লেভেল সঠিক থাকে। একই অবস্থায় বেশিক্ষন কাজ না করা, কখনই যেন মাথা ও চোয়াল(চিন) কাঁধ থেকে সামনে চলে না আসে। কাজের মাঝে ভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সঠিক ভঙ্গিতে ফোনে কথা বলা এবং কান এবং কাঁধের মাঝে টেলিফোন ব্যবহার করা যাবে না, প্রচুর পানি পান করা, হাতে ওজন ব্যবহার করার সময় সঠিক নিয়ম মেনে চলা, মাথা- ঘাঁড় ও কাঁধের সঠিক ভঙ্গি মেনে চলা, ঘাঁড়ের মাংসের ট্রিগার পয়েন্ট রিলিফ করা, হুইপ্লাস প্রতিরোধ করা, প্রতিদিন ঘাঁড়ের মাংসের নিয়মিত স্ট্রেসিং ও স্ট্রেন্দেনিং করা।
খাদ্য তালিকায় একটু পরিবর্তন আনতে হবে যেমন- প্রচুর পানি খেতে হবে, দিনে ২ গ্লাস দুধ- খাবরের ১ ঘন্টা পূর্বে অথবা খাবারের ২ ঘন্টা পরে দুধ খাবেন। দুধের বিকল্প হিসেবে তিল বর্তা খেতে পারেন। গরুর কলিজা, প্রতিদিন ১টি করে পূর্ণ সিদ্ধ ডিম-এর সাদা অংশ, পনির, ১ চা-চামচ আঁদার রস ও ১ কোয়া রসুন নিয়মিত প্রতিদিন খেতে হবে। সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা যারা এই রোগে ভুগছেন তারা উক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে আশা করি দ্রুত আরোগ্য লাভ করবেন।
আমরা বিভিন্ন গবেষণা পড়ে জানতে পেড়েছি যে, এখনও এমন ঔষধ তৈরি হয় নাই যে ঔষধ খেলে আপনার মাংস পেশী লম্বা হবে, শক্তিশালী হবে এবং আপনার জয়েন্ট মবিলিটি বেড়ে যাবে এবং আপনার এন্টিরিওর হেড পোশ্চার করেকশন হবে। মনে রাখবেন, ফিজিওথেরাপি উক্ত অসুবিধার চিকিৎসার জন্য একমাত্র মেডিসিন সুতরাং সম্পূর্ণ চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে সঠিক মোবালাইজেশন, স্ট্রেসিং এবং স্ট্রেন্দ্রেনিং এর মতো চিকিৎসা করতেই হবেই।
ব্যাকপেইন বিশেষজ্ঞ
লেজার ফিজিওথেরাপি সেন্টার
পান্থপথ, ঢাকা।
০১৭৬৫ ৬৬ ৮৮ ৪৬
০১৭৮৫ ৯৯ ৯৯ ৭৭