11/02/2026
*গণতন্ত্র : জন্ম, বিরতি, কামব্যাক-একটা লম্বা নাটক*
-
খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে (around 508 BC), এথেন্সে মানুষজন একটার পর একটা শাসনব্যবস্থা ট্রাই করে ক্লান্ত।
রাজতন্ত্র গেলো, অভিজাততন্ত্র এলো, একনায়কতন্ত্রও ঘুরে গেল-কিন্তু সুখ নাই।
তখন এথেন্স ভাবলো,
“একজনের মাথা কেন কাজ করবে? সবার মাথা একসাথে লাগাই।”
এই নতুন আইডিয়াটার নাম দেওয়া হলো demokratia
(demos = জনগণ, kratos = ক্ষমতা)।
তবে এখানেই ছোট্ট কিন্তু আছে।
এই “জনগণ” মানে কিন্তু সবাই না।
বাদ পড়ে গেলো-
নারী
দাস
বিদেশি
প্রাচীন গ্রিসে “জনগণ” বলতে বোঝাতো শুধু নিজ দেশের স্বাধীন পুরুষ নাগরিকদের।
মানে, গণতন্ত্রের জন্মটাই হলো limited edition হিসেবে।
এই গণতন্ত্রের পুরো ক্রেডিট একা কাউকে দেওয়া যায় না।
তবে দিতে হলে সবচেয়ে বেশি নাম আসে ক্লেইস্থেনিস-এর।
তিনি ক্ষমতাকে কিছু অভিজাত পরিবারের ড্রয়িংরুম থেকে তুলে এনে সাধারণ নাগরিকদের হাতে দেওয়ার প্ল্যান করলেন।
এক কথায়-power decentralization, ancient version।
কিন্তু সবাই এতে খুশি ছিল না।
প্লেটো, এরিস্টটল আর আরও অনেক দার্শনিক এই আইডিয়াটাকে ভালো চোখে দেখেননি।
তাদের ভয় ছিল-
“যদি আবেগপ্রবণ সংখ্যাগরিষ্ঠ আইন না মেনে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটা রাষ্ট্র না, জনতার হট্টগোল হয়ে যাবে।”
এরিস্টটল তো সরাসরি বলেই ফেললেন-
এই ধরনের গণতন্ত্র হলো শাসনের corrupt form।
তিনি বরং পছন্দ করতেন Polity-
যেখানে আইন চলে, মধ্যবিত্ত শক্তিশালী, আর কেউ একা মাতব্বর না।
এরপর ইতিহাসে ঢুকলো রোমানরা।
রোম গণতন্ত্র একেবারে উঠিয়ে দেয়নি ঠিকই,
কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাকে এমন দুর্বল করলো যে সব ক্ষমতা গিয়ে জমা হলো একজনের হাতে।
Republic থেকে Empire-
গণতন্ত্র থাকলো, কিন্তু কাগজে-কলমে।
(এই দৃশ্যপট আমাদের বাঙালিদের জন্য অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত।)
এরপর ইউরোপে রাজতন্ত্র আবার ফুলে-ফেঁপে উঠলো।
রাজারা ঘোষণা করলেন-
“আমরা ঈশ্বরের প্রতিনিধি। প্রশ্ন করা নিষেধ।”
আর জনগণ বললো-
“ঠিক আছে।”
(কারণ বিকল্প তখনো আবিষ্কার হয়নি।)
কিন্তু ১৬-১৭ শতকে মানুষ হঠাৎ করে বই পড়তে শুরু করলো-যা ইতিহাসে প্রায়ই বিপ্লব ডেকে আনে।
লোকজন ভাবলো,
“মগজ তো আমাদেরও আছে।”
John Locke বললেন-
শাসকের ক্ষমতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে।
রাজা যদি প্রজার জন্য কল্যাণকর না হয়?
-তাকে সরিয়ে দেওয়াটা অন্যায় না।
Montesquieu বললেন "
এক হাতে সব ক্ষমতা দিলে abuse হবেই।"
তাই ক্ষমতা ভাগ করো:
আইনসভা, নির্বাহী, বিচার বিভাগ।
আর Rousseau যোগ করলেন-
সার্বভৌমত্ব আসলে জনগণেরই।
রাজা ultimate boss না -জনগণই।
এই সব চিন্তার ফলেই
১৭৭৫ এর আমেরিকান বিপ্লব আর
১৭৮৯ এর ফরাসি বিপ্লব।
আমেরিকানদের দাবি ছিল খুব সোজা :
“ভোটাধিকার দাও, ট্যাক্স নাও।”
No representation, no taxation.
ফ্রান্সে অবস্থা ছিল আরও নাটকীয়।
এলিট শ্রেণির জৌলুশে চোখ ধাঁধিয়ে যায়,
আর চোখ কচলে তাকালে দেখা যায় -সাধারণ মানুষ খেতে পায় না।
এর মধ্যে Marie Antoinette এর নামে চালু হলো বিখ্যাত উক্তি-
“রুটি না থাকলে কেক খাও।”
(তিনি সত্যি বলেছিলেন কি না, ইতিহাসবিদরা আজও তর্ক করেন।)
জনগণ ক্ষেপে গেলো।
Bastille দখল হলো।
রাজা Louis XVI-এর শিরচ্ছেদ হলো।
ঘোষণা এলো-
Liberty, Equality, Fraternity।
তবে গল্প এখানেই সুখের না।
অঢেল রক্তপাত, শাসনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার পর
Napoleon ক্ষমতায় এলেন।
গণতন্ত্র আবার বলা চলে ছুটিতে গেলো।
ফরাসি বিপ্লবের পর গণতন্ত্র একদিনে ফেরেনাই।
নেপোলিয়নের ছায়ার ভেতর হাঁটতে হাঁটতে ১৯শ - বিশ শতকে পুরুষের সাথে নারী, শ্রমিক, প্রান্তিক মানুষরাও ঢোকে তালিকায়। গণতন্ত্র তখন শুধু ভোট দেওয়ার দিন না-
আদলত -সংবাদমাধ্যম -নাগরিক অধিকার -সব মিলিয়ে একটা প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।
তবে সমস্যা শেষ হয়নাই।
আধুনিক সমাজে এখনো ভোট আছে -তবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আদৌ আছে কিনা -তা আলোচনার বিষয়। আবার সেই আলোচনায় বসততেও আমরা আদৌ কতটুকু স্বাধীন -তাও প্রশ্নবিদ্ধ!
এখন গণতন্ত্র মানে শুধু রাজসভায় চিৎকার বা ব্যালট বাকশ না। মোবাইল স্ক্রিনে , কমেন্ট বক্সে অথবা হ্যাশট্যাগে সরকারের বা বিশ্বের বাঘাবাঘা নেতার তোয়াক্কা না করে আমরা মত প্রকাশ করি।
কখনো যুক্তি যেতে, কখনো আবেগ। তবে মত প্রকাশ হচ্ছে, হবে। এখনকার পৃথিবীতে এরিস্টোক্রেসি, মনার্কি বা ডিকটেটরশিপ চালায়ে রাখা কঠিন। নিজের ভালো এখন পাগলেও বোঝে।
সমস্যা হয়ে যায় তখন যখন জনগণকেই ভুল বোঝানো হয়। কোনটা তাঁর জন্য ভালো সেটা সে বুঝতে অপারগ হয়। জ্ঞানের অভাব- অথবা অতি আবেগে-জনগণ ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। তখন মনে হয়, এরিস্টটলের ভয় খুব অযৌক্তিক ছিলো না।
এখনো আড়াইহাজার বছর পর, সেই এথেন্সে যেই শব্দের জন্ম হয়েছিলো, এই বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষের সেই শব্দ নিয়ে অনেক কৌতূহল, অনেক আশা, অনেক অনুযোগ।
গণতন্ত্র কিন্তু একটাই প্রশ্ন করে যায়-
" আমি কি জনগণের হাতে আছি, নাকি তাদের নামে অন্য কারো হয়ে গেছি?"
~The accidental Sage