08/03/2026
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত দ্বিচারিতা চোখে পড়ে। এখানে নারীর ত্যাগ কে পূজা করা হয়, কিন্তু নারীর আত্মসম্মান কে দেখা হয় অবাধ্যতা বা হুমকি হিসেবে।
এদেশে সেই নারীই আদর্শ যিনি নিজের ইচ্ছা, ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত ভালো লাগাকে পরিবারের জন্য বিসর্জন দিতে পারেন। আমরা সেই নারীকে মাথায় তুলে রাখি, যে মুখ বুজে সব সহ্য করে।
আসলে এই মায়া বা শ্রদ্ধা যতটা না ঐ নারীর প্রতি, তার চেয়ে বেশি তার নতজানু স্বভাবের প্রতি।
কারণ, তার এই ত্যাগ সমাজকে কোনো প্রশ্ন করে না।
এই ত্যাগের মহিমা কেবল মানসিক বা সামাজিক শোষণে সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারীর শরীরের ওপরও এক ভয়াবহ আঘাত হানে। আমাদের দেশের ঘরে ঘরে আজও এক অলিখিত নিয়ম চলে। সবার শেষে নারী খাবেন, মাছের বড় টুকরোটি বা মাংসের বড় অংশটি স্বামী বা সন্তানের পাতে তুলে দিয়ে নিজে পড়ে থাকা সামান্য খাবার দিয়ে তৃপ্তির অভিনয় করাকেই আমরা আদর্শ নারীর গুণ বলে মানি।
এই নীরব বিসর্জনই তাকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ অপুষ্টির চক্রে। নিজে না খেয়ে বা পুষ্টিকর খাবারগুলো পরিবারের পুরুষ সদস্যদের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে তারা প্রজনন স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে হাড়ের ক্ষয়জনিত নানা জটিলতায় পড়েন।
গবেষণা বলে, বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক নারী রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া এবং ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগেন। পুরুষের তুলনায় নারীর হাড়ের সমস্যা এবং অপুষ্টিজনিত ক্লান্তি অনেক বেশি হওয়ার পেছনে এই তথাকথিত সংসারের জন্য ত্যাগী হওয়ার সংস্কৃতিই দায়ী।
বিপত্তিটা ঘটে তখন, যখন একজন নারী নিজের অধিকার নিয়ে সচেতন হন। যখন তিনি নিজের বাউন্ডারি সেট করেন বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন।
যে নারী নিজের মত প্রকাশ করেন, তাকে বলা হয় অহঙ্কারী।
যে নারী নিজের ক্যারিয়ার বা স্বপ্নকে অগ্রাধিকার দেন, যে নারী মাছের মাথা নিজের পাতে তুলে নেন তাকে বলা হয় স্বার্থপর।
যে নারী মাথা উঁচু করে কথা বলেন, তাকে দেখা হয় সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক প্রকার হুমকি হিসেবে।
পড়াশোনা, চাকরি বা আধুনিকতা কোনো কিছুই আমাদের মজ্জাগত এই নারীবিদ্বেষকে পুরোপুরি দূর করতে পারছে না।
বরং শিক্ষিত সমাজেই এই বিদ্বেষ আরও সুক্ষ্ম ও ভয়ংকর। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারীকে দমিয়ে রাখতে চরিত্রহনন থেকে শুরু করে তাকে বেয়াদব তকমা দেওয়া সবই আমাদের চারপাশের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র।
যতদিন আমরা নারীর ত্যাগ কে মহিমান্বিত করে তাকে শোষণ করার প্রক্রিয়া চালু রাখব এবং তার ব্যক্তিত্ব কে ভয় পাব ততদিন আমরা একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারব না।
আমাদের দরকার এমন এক সমাজ, যেখানে নারীকে শুধু ত্যাগী হিসেবে নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে এবং তার আত্মসম্মানসহ গ্রহণ করার মানসিকতা থাকবে।
©পুষ্টিবিদ হেলেনা আক্তার