23/05/2019
এটা একজন নন-মেডিক্যাল প্রাক্তন ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছাত্রের লেখা....
পড়ে দেখতে পারেন।
"বাঙ্গালির বুদ্ধি-শুদ্ধি জীবনেও হবে না।
একবারও ভেবে দেখেছেন বিষয়টা? মানুষ গুলো সারাদিন বসে আছে, সবাই তার কাছে আসতেছে বলতেছে, আমার পেটে ব্যথা, আমার মাথা ঘুরায়, আমার হাগা হচ্ছে না, আমার ডাইরিয়া, আমার চুল্কায়,আমার কুঁচকিতে ঘা,আমার বিচি ফুলে গেছে টাইপ কথাবার্তা। জীবনের প্রতিটা দিন মানুষগুলো অন্যের অসুখের কথা চুপচাপ শোনে। আমাকে আপনাকে, চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করে, যেন আমরা ভাল থাকি, সুস্থ্য থাকি। এরা যখন ডিউটিতে থাকে তখনতো করেই, ডিউটি ছাড়াও এখন মোবাইলের যুগ। দিন নাই, রাত নাই "দোস্ত বা ভাই বা আপু আমার গলায় মাছের কাটা ফুটছে, সকালে হাগা ক্লিয়ার হয় নাই পেটটা ভারী হয়ে আছে, আমার শরীর ম্যাজম্যাজ করছে কি করব" টাইপের ফোন দিনে একটাও পায় না এমন ডাক্তার খুঁজে পাওয়া বিরল। এসব কল না ধরলেও বিপদ, এমনিতেই পেশাগত কারনে এরা পারিবার বা বন্ধুদের সাথে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না, এসব কল না ধরলে তো আরও মার্কামারা সমাজবিচ্যুত হয়ে যাবে।
এতকিছু করার পরও ওরা খারাপ আমাদের কাছে। তারপরও কিন্তু কিছু একটা হলেই ওদের কাছেই দৌড়াতে হয় আপনি যত বড় কুতুবই হন না কেন। হাগা বন্ধ হলেও ডাক্তার, হাগা বারবার হলেও ডাক্তার। আপনার সমস্যাটা হয়ত সিরিয়াস, আপনি ভুগছেন। কিন্তু এটাও মাথায় রাইখেন শুধু আপনি না, যারা যাচ্ছে হসপিটালে সবার অবস্থাই আপনার মত। ঐ ডাক্তারগুলো সারাদিন এসব নিয়েই আছে। তারাও টায়ার্ড হতে পারে। তারাও আপনার বাড়াবাড়িতে বিরক্ত হতে পারে।
একবার আমার এক বন্ধুকে মহসীন হলের মাঠে কোপাইল চাপাতি দিয়ে। নিয়ে গেলাম ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে। ওর সারা শরীর রক্তে ভেজা, আমাদের জামাকাপড়ও ওর রক্তে চিটচিট করতেছে। কোথাও লাল-লাল মাংস দেখা যাচ্ছে,কোথাও সাদা হাড়। ঢাকা মেডিকেলে গেছি, ঢাকা ভার্সিটির ছেলে মেয়ে আমরা সব। স্বভাবতই গিয়েই হৈ চৈ শুরু করে দিলাম। ওটি তে নিতে দেরী হচ্ছে কেন? ব্লিডিং বন্ধ হচ্ছে না কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন ডাক্তার এসে বলল আপনি আসেন আমার সাথে, আমরা দুইজন ওটিতে ঢুকলাম। দেখি ওটিতে একসাথে দুইটা অপারেশন চলছে। একটা এক্সিডেন্ট কেস। একজনের একটা হাত কেটে ফেলে রাখা একপাশে, চার পাঁচজন সার্জন চেষ্টা করছে তার পা দুটোকে বাঁচাতে। আরেকজনের মুখে চোখ, নাক, মুখ কোনটা যে কোথায় তা বোঝা যাচ্ছে না ঠিকমত। হয়ত ভালমত তাকালে আলাদা করে দেখতে পারতাম। কিন্তু তাকানোর শক্তি বা সাহস আমার ছিল না। আমাকে জিজ্ঞেস করল বলেন এদের আগে আপনার বন্ধুর সেলাইটা করে দেব? আমি উত্তর না দিয়ে বের হয়ে আসলাম। এরা ডাক্তার আমার আপনার মতই মানুষ। এদেরও বিরক্ত লাগে, রাগ হতে পারে, রোগ হতে পারে, খারাপ লাগতে পারে। ভেবে দেখেন অফিসে কতজন লোকের সাথে আপনাকে ডিল করতে হয়? সবাই আপনার কাছে তাদের সমস্যা নিয়ে আসে কি? তারপরও একটা সময়ের পর রাগ হয়, বিরক্ত লাগে। আর ডাক্তারদের অফিসে সবাই নিজেদের সমস্যা নিয়েই যায়।
কিছুদিন আগে মামাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম ল্যাব-এইডে। মামা শুরু করল এভাবে "ডাক্তার সাহেব অমুক ইঞ্জিনিয়ার আমার বন্ধু, সে আমাকে আপনার কথা বলল। তাই আপনার কাছে আসলাম।" ডাক্তার বলল অনেক রোগী দেখিতো ঠিক সেভাবে মনে পড়ছে না। জিজ্ঞেস করল আপনার কি হয়েছে সেটা বলেন। মামা বলে "আমার গ্যাস, ১৯৯২ সালে একবার এন্ডসকপি করেছিলাম,অমুক ইঞ্জিনিয়ার আমার বন্ধু, তার বাড়ি অমুক জায়গায়। সে আমাকে আপনার কথা বলল। তাই আপনার কাছে আসলাম।" ডাক্তার বলল "এত আগে! রিসেন্ট কোনো কিছু কি করা হয়েছে? কি ঔষধ খাচ্ছেন?" মামার উত্তর "অমুক ইঞ্জিনিয়ার আমার বন্ধু, সে অমুক খানে চাকরি করে, সে আমাকে আপনার কথা বলল। তাই আপনার কাছে আসলাম।" আমি নিজেই বিরক্ত। ডাক্তারের কথা আর কি বলব। এরা ডাক্তার। এরা বিরক্ত হলে দুনিয়া উলটে যায়। এরা প্রতিদিন এমনই সব রোগী সামলায়। একবার ভেবে দেখেন আপনি একদিনও পারবেন কিনা? না চিকিৎসা করতে হবে না, শুধু ধৈর্য ধরে মানুষের সমস্যা গুলো শুনবেন।
আমরা পয়দা হই ডাক্তারদের হাতে, সারাজীবন তো লেগেই আছে, মরার সময়ও এই মানুষগুলো আমাকে আপনাকে আরও কিছু দিন বাঁচিয়ে রাখতে জান প্রাণ দিয়ে লড়াই করে। একটা মানুষ আপনার সেবা করছে আর আপনি তার সাথে দূর্ব্যবহার করছেন, আপনার মত কৃতঘ্ন মানুষের সেবা করাটা তাদের জন্য কষ্টকর হওয়ারই কথা।
- সংগৃহীত।