09/04/2026
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশুরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ শাকিল আহমেদ স্যার চমৎকারভাবে হামের টিকা ক্যাম্পেইন বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মিজেলস আউটব্রেক রেসপন্স গাইডলাইন ২০২২ এবং ইমিউনোলজিক্যাল বেসিস অফ ইমিউনাইজেশন মডিউল ৭ এর আলোকে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যা সাধারণ মানুষের জানা জরুরী।
১) আমার বাচ্চাকে কি চলমান হামের টিকা ক্যাম্পেইনে টিকা দেবো?
- আপনার বাচ্চার বয়স যদি ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস (৫ বছর) এর মাঝে হয় তাহলে অবশ্যই টিকা দেবেন। আগে হামের টিকা যে কয় ডোজই দেয়া থাকুক তার সাথে এর সম্পর্ক নেই এমনকি আগে হাম হয়ে থাকলেও চলমান ক্যাম্পেইনে টিকা দিয়ে দেবেন।
২) আমার বাচ্চার ৯ মাস ও ১৫ মাসে দুই ডোজ হামের টিকা পেয়েছে। আবারও কি এই ক্যাম্পেইনে টিকা দেবো?
- হ্যাঁ দেবেন, কোন অসুবিধা নেই। ৬০ বছর ধরে এই টিকা সারা পৃথিবীতে চলছে এবং এটি নিরাপদ টিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
৩) আমার বাচ্চার ৯ মাসে প্রথম ডোজ পেয়েছে, এখন ১১ মাস। ১৫ মাসে ২য় ডোজ পাবার কথা। তাকে কি এখন টিকে দেবো?
- হ্যাঁ দেবেন, ১১ মাসে এখন টিকা দেবেন, ১৫ মাসের টা ১৫ মাসে থাকবে আগের মতই। কারন এখন সারাদেশে হামের আউটব্রেক চলছে। এই সময়ে আক্রান্তের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এটি নিয়মিত ডোজের পাশাপাশি অতিরিক্ত ডোজ হিসেবে দেয়া হচ্ছে।
আউটব্রেক পরিস্থিতিতে টিকাদানের সাধারণ নিয়ম অনেকক্ষেত্রে পরিবর্তন করা হয়। যেমন হামের টিকার প্রথম ডোজ দেয়া হয় ৯ মাসে। এর আগ পর্যন্ত বাচ্চা সুরক্ষিত থাকে টিকা নেয়া মায়ের কাছ থেকে আসা এন্টিবডি দিয়ে কিন্তু তা ক্রমশ কমতে থাকে ৩ মাসের পর। ৯ মাসের আগে টিকা দিলে টিকার ইমিউনাইজেশন রেসপন্স একটু কম হয় ৯ মাসের তুলনায়। তাই ৬ মাসে টিকার রেসপন্স কিছুটা কম হলেও আউটব্রেক পরিস্থিতিতে তা বাচ্চাদের অনেকাংশে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান শিডিউল (৯ মাস ও ১৫ মাস) চালু রাখতে হবে পুর্ণমাত্রায় সুরক্ষার জন্য। অর্থাৎ ৬ মাসে টিকা নেয়া বাচ্চা ৩ ডোজ টিকা পাবে।
৪) আমার বাচ্চা ৮ মাস ১০ দিনে টিকা নিয়েছে। পরের ডোজ কি ৯ মাসে নেবে?
- একটি কথা মনে রাখতে হবে দুটি টিকার ডোজের মাঝে ব্যবধান থাকতে হবে ২৮ দিন। যেমন কেউ ৮ মাস ১০ দিন বা ২০ দিনে টিকা দিলে তার পরের ডোজ ৯ মাসে হবে না, তার কিছুদিন পরে হবে (ন্যুনতম ২৮ দিন হিসাব করে)।
৫) ব্লাড ট্রান্সফিউশন এর ক্ষেত্রে টিকা নেয়া যাবে?
- কেউ যদি ব্লাড ট্রান্সফিউশন/প্লেটিলেট/প্লাজমা ইত্যাদি দিলে স্বাভাবিক সময়ে টিকাদান এর সময় কিছুটা পেছানো হয়। কিন্তু আউটব্রেক পরিস্থিতিতে এটিও শিথিল। অর্থাৎ ব্লাড প্রোডাক্ট ট্রান্সফিউশনের কারনে টিকাদান দেরি করা যাবে না।
৬) বাচ্চা স্টেরয়েড পাচ্ছে কিংবা কেমোথেরাপি নিচ্ছে, তারা টিকা নিতে পারবে?
- কোন বাচ্চা যদি হাই ডোজ স্টেরয়েড পান কিংবা ক্যান্সারের জন্য কেম থেরাপি নিতে থাকে, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এর সরাসরি পরামর্শ মেনে টিকা নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৭) আমার বাচ্চার জ্বর/সর্দি কাশি সেক্ষেত্রে টিকা নিতে পারবে?
- অল্প জ্বর বা সর্দি কাশি হলে নিতে পারবে। কিন্তু অনেক জ্বর, হাসপাতালে ভর্তি হবার মত অসুস্থতা থাকলে বা এই মুহুর্তে শরীরে হাম থাকলে এই মুহুর্তে হামের টিকা নেয়া যাবে না।
মিজেলস তথা হামের টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই সামান্য। অন্যান্য টিকার মতই কোন কোন বাচ্চার এই টিকা নেবার পরে টিকাদানের স্থানে হালকে ফুলে যেতে পারে, ব্যথা হতে পারে, হালকা জ্বর আসতে পারে, শরীরের কোথাও কোথাও র্যাশ হতে পারে, এগুলো মিজেলস ভ্যাকসিনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
হামের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। চিকিৎসকেরা আক্রান্ত রোগীকে ভিটামিন এ দেন হামের প্রভাব থেকে চোখ রক্ষা করতে ও নিউমোনিয়া থেকে সুরক্ষা বাড়াতে। সুতরাং সবচেয়ে বিচক্ষণ কাজ হচ্ছে টিকা দেয়া। আপনার বাচ্চার বয়স ৬ মাস থেকে ৫ বছর হলে অবশ্যই চলমান ক্যাম্পেইনে টিকা দেবেন আগে বা পরের নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে। এতে আপনার বাচ্চা যেমন সুরক্ষা পাবে তেমনি হার্ড ইমিউনিটি বৃদ্ধির কারনে সারাদেশের সকল বাচ্চা সুরক্ষা বলয়ে চলে আসবে।
স্যারের ভিডিও থেকে লিখেছেন
ডা. মোঃ মারুফুর রহমান
চিকিৎসক ও গবেষক
এমবিবিএস, এমপিএইচ, এমএসসি, পিএইচডি