06/01/2026
বহদ্দারহাটের ‘সেফ আইডিয়াল হেলথ কেয়ার’-এ শিশু রোহানের নিথর দেহটি আজ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক ভয়ংকর আয়না। কোনো পূর্ব-পরীক্ষা ছাড়াই তাকে ওটিতে নেওয়া, অ্যানেস্থেশিয়ার পর রহস্যজনক মৃত্যু এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য গোপন—এই চিত্রনাট্য আমাদের দেশে নতুন নয়। খৎনা বা ছোট কোনো সার্জারির নামে অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে একের পর এক শিশু হত্যার মহোৎসব চলছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানে নয়; ট্র্যাজেডি হলো আমাদের তথাকথিত 'এলিট' চিকিৎসক মহলের রহস্যময় নীরবতায়।
∆ অ্যানেস্থেশিয়া হত্যাকাণ্ড ও পেশাদারী নীরবতা
বিগত কয়েক বছরে অ্যানেস্থেশিয়া-সংক্রান্ত অবহেলায় অসংখ্য শিশুর প্রাণ গেছে।
প্রশ্ন ওঠে—
অ্যানেস্থেশিয়া কে দিল?
মনিটরিং ছিল কি?
বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট উপস্থিত ছিলেন তো?
আশ্চর্যের বিষয়, এই মৃত্যুগুলো নিয়ে এমবিবিএস মহলের সম্মিলিত বিবেক নড়ে না। কোনো জাতীয় আত্মসমালোচনা নেই, দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের কোনো আন্দোলন নেই।
বরং তাদের সমস্ত শক্তি ও আন্দোলন ব্যয় হয়—
√ প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ডিএমএফদের 'অযোগ্য' প্রমাণ করতে।
√ ডিএমএফ প্র্যাকটিস বন্ধ করার অযৌক্তিক দাবিতে।
√ নিজেদের সিস্টেমের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে আড়াল করতে।
∆ গিল্ড মানসিকতা বনাম রোগীর নিরাপত্তা
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের মূল ক্যান্সার কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রি নয়; সমস্যা হলো— জবাবদিহিহীন ক্ষমতা, গিল্ড মানসিকতা (Guild Mentality) এবং নির্বাচিত নীরবতা। অ্যানেস্থেশিয়ায় শিশু মারা গেলে আপনাদের ঘুম ভাঙে না, কিন্তু ডিএমএফদের অধিকারের কথা শুনলে আপনাদের রাজপথ উত্তপ্ত হয়। মনে রাখবেন—ডিএমএফ বন্ধ করলে শিশু মৃত্যু বন্ধ হবে না। স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল,ট্রেনিং এবং দায়বদ্ধতা ছাড়া কোনো ডিগ্রিই রোগীকে নিরাপত্তা দিতে পারে না।
> একটি কঠোর বাক্য বলি আগে নিজের ঘর পরিষ্কার করুন, শিশু মৃত্যুর দায় নিন; তারপর অন্যকে অযোগ্য বলার নৈতিক অধিকার দাবি করুন।
>
∆ টাস্ক-শিফটিং এবং গ্লোবাল হেলথ রিয়ালিটি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্বীকৃত 'Skill Mix' এবং 'Task Shifting' মডেল আজ সারা বিশ্বে সমাদৃত। উন্নত দেশগুলো (যেমন: যুক্তরাজ্য,চীন, নেদারল্যান্ডস) আজ প্রাইমারি কেয়ারে গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের কগনিটিভ বার্ডেন কমিয়ে মিড-লেভেল প্র্যাক্টিশনারদের ওপর দায়িত্ব দিচ্ছে।
এতে দুটি লাভ হয়:
১. রোগী দ্রুত এবং মানসম্মত প্রাথমিক সেবা পায়।
২. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জটিল রোগ, সার্জারি ও গবেষণায় মনোনিবেশ করার সুযোগ পান।
বাংলাদেশে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ নেই, টারশিয়ারি কেয়ার ভেঙে পড়ছে—সেদিকে নীতিনির্ধারকদের নজর নেই। উল্টো ৫০ বছর ধরে প্রান্তিক মানুষের সেবা দেওয়া ডিএমএফদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
ফলাফল? রোগীরা বাধ্য হয়ে হাতুড়ে বা কোয়াকদের কাছে যাচ্ছে। ডিএমএফ বন্ধ করা মানে রোগীর জীবন বাঁচানো নয়, বরং তাকে মৃত্যুর মুখে যেতে উৎসাহীত করা।
∆ ডিএমএফ বা মিড-লেভেল সহকারী চিকিৎসকরা কোনো দয়া নয়, বরং সিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য—প্রান্তিক ও গ্রামীণ মানুষের জন্য ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা নিশ্চিত করা। ডিএমএফরা আছে বলেই এখনো গ্রামের হতদরিদ্র মানুষটি কোনোমতে সেবা পাচ্ছে।
স্বাস্থ্যখাতে বাজেট সাশ্রয় এবং সেবার মানোন্নয়ন সিস্টেম ঠিক করলে হয়, কোনো ক্যাটাগরি 'অফ' করলে নয়। ডিগ্রি দিয়ে নয়, দায়বদ্ধতা দিয়ে চিকিৎসকের মর্যাদা বিচার করুন। রোহানদের রক্ত যেন আমাদের বিবেককে অন্তত একবার সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।