08/01/2026
Qus.
সর্দি বা কফ জিনিসটা আসলে কি? এটা শরীরের ভিতরে নিজে নিজে কেন উৎপন্ন হচ্ছে?
Ans.
সর্দি বা কফ আমাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হলেও, এটি আসলে শরীরের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি আপনার শরীরের ভেতরকার 'ক্লিনিং এজেন্ট' বা পরিষ্কারক।
নিচে এটি কেন এবং কীভাবে তৈরি হয় তার সহজ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. সর্দি বা মিউকাস আসলে কী?
সর্দি (Mucus) মূলত পানি, লবণ, প্রোটিন এবং কিছু অ্যান্টিবডি দিয়ে তৈরি একটি আঠালো পিচ্ছিল পদার্থ। আমাদের নাক, মুখ, গলা এবং ফুসফুসের ভেতরের দেয়ালে এক ধরণের ঝিল্লি (Membrane) থাকে যা সব সময় এই রস নিঃসরণ করে।
২. এটি কেন উৎপন্ন হয়?
শরীর মূলত তিনটি প্রধান কারণে নিজে নিজে সর্দি বা কফ তৈরি করে:
প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে: আপনার শ্বাসনালী যেন শুকিয়ে না যায়, সেজন্য এটি লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে।
ফাঁদ হিসেবে: আমরা যখন শ্বাস নিই, বাতাসের সাথে অনেক ধুলোবালি, জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস) এবং ক্ষতিকর কণা ভেতরে ঢোকে। সর্দি এই ময়লাগুলোকে আঠার মতো আটকে ফেলে যাতে সেগুলো ফুসফুসে পৌঁছাতে না পারে।
জীবাণু ধ্বংস করতে: সর্দিতে এমন কিছু এনজাইম এবং অ্যান্টিবডি থাকে যা ভেতরে ঢোকা ক্ষতিকর ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলতে সাহায্য করে।
৩. অসুস্থ হলে সর্দি বেড়ে যায় কেন?
যখন আপনার শরীরে ঠান্ডা লাগে বা কোনো ইনফেকশন হয়, তখন শরীর বুঝতে পারে যে শত্রু (জীবাণু) সংখ্যায় বেড়ে গেছে। তখন শরীর লড়াই করার জন্য অতিরিক্ত সর্দি তৈরি করে যাতে বেশি বেশি জীবাণু আটকে ফেলা যায় এবং শরীর থেকে বের করে দেওয়া যায়।
নাক দিয়ে পানি পড়া: এটি মূলত নাক পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া।
কফ (Phlegm): যখন ফুসফুস বা শ্বাসনালীতে প্রদাহ হয়, তখন সেখানে ঘন মিউকাস তৈরি হয়। কাশি দেওয়ার মাধ্যমে শরীর সেই আটকে পড়া জীবাণু ও ময়লাগুলোকে বাইরে বের করে দেয়।
৪. রঙের পরিবর্তন কী বোঝায়?
স্বচ্ছ (Clear): এটি স্বাভাবিক। শরীর ঠিকঠাক কাজ করছে।
সাদা বা হলদেটে: শরীর জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে (শ্বেত রক্তকণিকা কাজ করছে)।
সবুজ: এটি নির্দেশ করে যে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব শক্তভাবে লড়াই করছে (মৃত শ্বেত রক্তকণিকার কারণে রঙ সবুজ হয়)।
একটি মজার তথ্য: একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন প্রায় ১ থেকে ১.৫ লিটার মিউকাস তৈরি করে, যার বেশিরভাগই আমরা অজান্তে গিলে ফেলি এবং পেটের এসিড তা হজম করে ফেলে!
Qus.
তাহলে আমরা সর্দি হলে সর্দির ওষুধ খাই কেন? সর্দি তো ভালো জিনিস।
Ans.
আপনার পর্যবেক্ষণ একদম ঠিক! সর্দি বা কফ আসলে শরীরের একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। কিন্তু তবুও কেন আমরা ওষুধ খাই, তার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ আছে:
১. সর্দি যখন কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়:
সর্দি শরীরের জন্য ভালো হলেও, যখন এটি অতিরিক্ত পরিমাণে উৎপন্ন হয়, তখন তা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দেয়।
যেমন শ্বাসকষ্ট: অতিরিক্ত সর্দির কারণে নাক বন্ধ হয়ে যায়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
ঘুমের ব্যাঘাত: রাতে নাক বন্ধ থাকলে বা অনবরত কাশি হলে আপনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না, যা শরীরকে আরও দুর্বল করে দেয়।
কাজের অসুবিধা: অনবরত নাক দিয়ে পানি পড়া বা হাঁচি দেওয়া কাজের মনোযোগ নষ্ট করে।
২. ওষুধ আসলে কী কাজ করে?
সর্দির ওষুধ আসলে রোগ সারায় না (কারণ সর্দি সৃষ্টিকারী ভাইরাস মারার ক্ষমতা সাধারণ সর্দির ওষুধের নেই), এটি কেবল উপসর্গ (Symptoms) কমায়:
ডিকনজেস্ট্যান্ট (Decongestant): এটি নাকের ভেতরের ফোলা রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে, ফলে নাক বন্ধ ভাব কমে এবং শ্বাস নেওয়া সহজ হয়।
অ্যান্টিহিস্টামিন (Antihistamine): এটি শরীরকে সংকেত দেয় যাতে সর্দি বা পানি পড়া কমে যায় এবং হাঁচি বন্ধ হয়।
এক্সপেক্টোরেন্ট (Expectorant): এটি ঘন কফকে পাতলা করে দেয় যাতে কাশির মাধ্যমে তা সহজে শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারে।
৩. শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া
অতিরিক্ত সর্দি-কাশির কারণে শরীর খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ওষুধ খেয়ে যখন এই উপসর্গগুলো একটু শান্ত হয়, তখন আপনি ভালোমতো বিশ্রাম নিতে পারেন।
আর পর্যাপ্ত বিশ্রামই আসলে শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
তাহলে ওষুধ কি সবসময় খাওয়া উচিত?
না। যদি সর্দি খুব সামান্য হয় এবং আপনার কাজে সমস্যা না করে, তবে ওষুধ না খেয়ে গরম পানি, আদা চা বা তুলসি পাতা খাওয়া ভালো। এতে শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাধা পায় না।
সংক্ষেপে: আমরা সর্দির ওষুধ খাই রোগ সারানোর জন্য নয়, বরং নিজেদের আরামদায়ক রাখতে এবং দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নিতে।
Qus.
দৈনিক যে এক লিটার সর্দি তৈরি করে আমাদের শরীর। তাতে শরীরের পানিশূণ্যতা তৈরি হয়না?
Ans.
খুবই চমৎকার এবং বুদ্ধিদীপ্ত একটি প্রশ্ন! দৈনিক প্রায় ১ থেকে ১.৫ লিটার মিউকাস বা সর্দি তৈরি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের শরীর কেন শুকিয়ে যায় না বা পানিশূন্যতা তৈরি হয় না, তার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করে:
১. অধিকাংশ সর্দি আমরা পুনরায় 'রিসাইকেল' করি
আপনি জেনে অবাক হতে পারেন যে, আমাদের নাক এবং শ্বাসনালীতে যে সর্দি তৈরি হয়, তার প্রায় সবটুকুই অজান্তে আমাদের গলার পেছনে চলে যায় এবং আমরা তা গিলে ফেলি।
এই সর্দি পাকস্থলীতে যাওয়ার পর সেখানে থাকা হজমকারী এনজাইম এবং অ্যাসিড একে আবার ভেঙে ফেলে।
সর্দির মধ্যে থাকা পানি এবং প্রোটিন শরীর পুনরায় শুষে নেয়। অর্থাৎ, শরীর যা তৈরি করছে, তা আবার শরীরের ভেতরেই ফিরে যাচ্ছে। একে বলা যায় শরীরের একটি চমৎকার 'ওয়াটার রিসাইক্লিং সিস্টেম'।
২. সর্দি ৯৫% পানি দিয়ে তৈরি
সর্দি বা মিউকাসের গঠনের প্রায় ৯৫% থেকে ৯৮% শতাংশই পানি। বাকি অংশটুকু প্রোটিন (Mucin), লবণ এবং অ্যান্টিবডি। যেহেতু সুস্থ অবস্থায় এই পানিটুকু শরীর থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাচ্ছে না (বরং পাকস্থলীতে গিয়ে পুনরায় রক্তে ফিরে যাচ্ছে), তাই পানিশূন্যতা হওয়ার সুযোগ থাকে না।
কিন্তু অসুস্থ হলে কেন সাবধান থাকতে হয়?
স্বাভাবিক অবস্থায় পানিশূন্যতা না হলেও, যখন আপনি অসুস্থ হন (সর্দি-কাশি বা ফ্লু হয়), তখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলে যায়:
পানি শরীর থেকে বেরিয়ে যায়: অসুস্থ হলে আমরা নাক ঝাড়ি, থুতু ফেলি বা কাশির সাথে কফ বের করে দেই। এতে শরীর থেকে পানি এবং প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট কমে যেতে থাকে।
নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ক্ষতি: সর্দি বা নাক বন্ধ থাকলে আমরা মুখ দিয়ে শ্বাস নিই, এতে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
সর্দি ঘন হয়ে যাওয়া: পানিশূন্যতা হলে সর্দি আরও আঠালো এবং ঘন হয়ে যায়, যা শরীর থেকে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রয়োজনীয় পরামর্শ: এজন্যই সর্দি হলে চিকিৎসকরা প্রচুর পরিমাণে পানি এবং তরল খাবার খেতে বলেন। এতে সর্দি পাতলা থাকে এবং শরীর সহজেই জীবাণুগুলোকে বাইরে বের করে দিতে পারে।
Qus.
সর্দি গিলে ফেলা কি ক্ষতিকর?
Ans.
এক কথায় বলতে গেলে— না, সর্দি গিলে ফেলা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। আসলে আমরা যখন সুস্থ থাকি, তখনও সারাদিন ধরে তৈরি হওয়া মিউকাস বা সর্দি অবচেতনভাবেই গিলে ফেলি। তবে অসুস্থ অবস্থায় যখন সর্দি বেড়ে যায়, তখন এটি গেলার ব্যাপারে আমাদের মনে দ্বিধা তৈরি হয়।
বিজ্ঞান কী বলে এবং কেন এটি ক্ষতিকর নয়, তার কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. পাকস্থলীর এসিডের ক্ষমতা
সর্দির কাজই হলো বাতাস থেকে ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ধুলোবালি আটকে ফেলা। আপনি যখন এই সর্দি গিলে ফেলেন, তখন সেটি সরাসরি আপনার পাকস্থলীতে চলে যায়।
পাকস্থলীতে থাকা অত্যন্ত শক্তিশালী হাইড্রোক্লোরিক এসিড সেই জীবাণুগুলোকে সাথে সাথেই ধ্বংস করে ফেলে। ফলে সেই জীবাণুগুলো আর আপনাকে নতুন করে অসুস্থ করতে পারে না।
২. শরীরের রিসাইক্লিং পদ্ধতি
আগের আলোচনায় যেমনটি বলেছি, সর্দি মূলত পানি এবং প্রোটিন দিয়ে তৈরি। এটি গিলে ফেললে আপনার শরীর সেই পানি এবং উপাদানগুলো আবার শুষে নেয়। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা এবং রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া।
৩. কোনো নতুন ইনফেকশন হয় না
অনেকে ভাবেন সর্দি গিলে ফেললে হয়তো পেটে ইনফেকশন হতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সর্দি গেলার কারণে ডায়রিয়া বা পেটের অন্য কোনো সমস্যা হওয়ার প্রমাণ নেই। তবে অতিরিক্ত সর্দি পাকস্থলীতে গেলে কারও কারও ক্ষেত্রে সাময়িক বমি ভাব বা অস্বস্তি হতে পারে।
কিছু প্রয়োজনীয় সতর্কতা:
সর্দি গিলে ফেলা ক্ষতিকর না হলেও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা ভালো:
অস্বস্তি হলে বের করে দিন: যদি আপনার সর্দি খুব ঘন বা আঠালো হয় এবং কাশি দিয়ে বের করে দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তবে বের করে দেওয়াই ভালো। এটি আপনার বুক বা গলা পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করবে।
রক্ত বা দুর্গন্ধ: সর্দির সাথে যদি রক্ত আসে বা খুব দুর্গন্ধ থাকে, তবে তা গিলে না ফেলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পানিশূন্যতা এড়ানো: সর্দি গিলে ফেললেও অসুস্থ অবস্থায় শরীর থেকে অনেক তরল খরচ হয়, তাই এই সময়ে বেশি করে পানি পান করা জরুরি যাতে সর্দি পাতলা থাকে।
একটি মজার বিষয়: অনেক শিশু সর্দি ঝাড়তে পারে না বলে সব সময়ই তা গিলে ফেলে, এবং এটি তাদের শরীরের কোনো ক্ষতি করে না।
Popular Diagnostic Center Ltd. Noakhali Branch