04/10/2024
পটভূমি: ৯০-এর দশক
ধরুন, আজ মঙ্গলবার। বিটিভিতে একটি মর্মস্পর্শী নাটক দেখানো হলো যেখানে একটি শিক্ষিত যুবক চাকরি না পেয়ে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই নাটকটি দেখল বাংলাদেশের প্রায় সকল মানুষ। তারা গভীরভাবে অনুভব করল সেই যুবকের দুঃখ-কষ্ট, হতাশা এবং জীবনের ট্র্যাজেডি। সবার মনে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হলো—সহানুভূতি এবং সমব্যথা। যেন তারা সবাই এই যুবকের যন্ত্রণার সাথী হয়ে গেছে। একসময়কার এই গণমাধ্যমের শক্তি ছিল অবিশ্বাস্য। সবাই একই নাটক, একই কাহিনি, একই সমস্যা দেখে একই রকমভাবে প্রতিক্রিয়া করত। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা যেন একটা সম্মিলিত প্রবাহে চলত। সবার চিন্তার মধ্যে একটি মিল ছিল, মতামতগুলোও এক ধরনের অভিন্নতার দিকে ঝুঁকত। ফলে, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ এবং সংযোগ অনেক বেশি দৃঢ় ছিল।
পটভূমি: বর্তমান সময়
ধরুন, আজ মঙ্গলবার। আবারও বিটিভিতে একটি করুন নাটক দেখানো হলো যেখানে একটি শিক্ষিত যুবক চাকরি না পেয়ে জীবনের হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। তবে এবার ছবিটা ভিন্ন। নাটকটি হয়তো বিটিভিতে চলছে, কিন্তু কতজন তা দেখল? খুব কম মানুষই হয়তো জানল নাটকের কথা, আর দেখল তো তার চেয়েও কম।
এই সময়ে মানুষ এখন বিভিন্ন মাধ্যমে বিভক্ত। কেউ হয়তো হেডফোনে ইংরেজি গান শুনছে, কেউ হিন্দি গানে বিভোর হয়ে আছে। কেউ বাংলা গান শুনে মুগ্ধ, আবার কেউ শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শুনছে ধর্মীয় আলোচনা—গান শোনা কি বৈধ, না হারাম? কেউ ইউটিউবে ঘুরছে, কিভাবে ধনী হওয়া যায়, সেই ভিডিও দেখে। কেউ শুনছে, ধনী না হওয়ার নানা গুণের কথা। অন্য কেউ বিশ্ব রাজনীতির আলোচনা নিয়ে মগ্ন, আবার কেউ বিজ্ঞানের অগ্রগতির খোঁজ নিচ্ছে।
এই সময়ে মানুষ কী শুনছে, কী নিয়ে ভাবছে, কেউই তা ঠিকমতো জানে না। একই বাড়িতে থাকা মানুষও একে অপরের চিন্তা বা অনুভূতির স্রোতের সঙ্গে আর পরিচিত নয়। এমনকি একই বিছানায় থাকা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাদের চিন্তার গতিপথ একেবারে আলাদা। এই ভিন্নতার ফলে মতের অমিল আরও প্রকট হচ্ছে, মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব দেখা দিচ্ছে। যার প্রভাব সমাজে, পরিবারে—সব জায়গায় পড়ছে। মানুষের মধ্যে ক্রমশ একে অপরের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব বাড়ছে, আর এই বিচ্ছিন্নতার ফলাফল হচ্ছে নানামুখী সংঘাত।
এভাবেই দিন দিন আমরা একে অপরের থেকে মানসিকভাবে আরও দূরে সরে যাচ্ছি।