20/01/2026
বিটরুট এর উপকারীতা :
ইদানীং দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে বিটরুট পাউডার। দেহের শক্তি বাড়াতে কিংবা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে বিটরুট পাউডার কাজে আসে বলে দাবি করেন। উপকারিতার প্রচলিত তালিকাটাও বেশ লম্বা। আদ-ই কি এতটা উপকারী বিটরুট পাউডার? তা নিয়ে নিম্নে আলোচনায় বুজতে পারা যাবে ।
বিটরুট এর পরিচিত : বিটরুট নামের গাঢ় গোলাপি বা লালচে রঙের সবজিটি এখনও আমাদের দেশে খুব পরিচিত না। বাজারে দেখলেও কিনতে চান না অনেকে। শীতকালে এ সবজির উৎপাদন বেশি হলেও বর্তমানে সবসময়ই এ সবজির দেখা মেলে। বিভিন্ন পুষ্টিগুণ ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন এ সবজিটিকে সুপারফুডও বলা হয়ে থাকে।
বিটরুটের পুষ্টি উপদান: মৌসুমি সবজি হিসেবে বিটরুট দারুণ। এতে আছে ভিটামিন ‘এ’, আয়রন, ফোলেট, পটাশিয়াম এবং আঁশ। খানিকটা ভিটামিন ‘সি’ও রয়েছে। তাই সঠিক উপায়ে গ্রহণ করা হলে তা শরীরের অনেক উপকারেই আসবে। এই যেমন ভিটামিন ‘এ’ ত্বক এবং চোখের জন্য উপকারী। দেহে রক্ত তৈরির জন্য প্রয়োজন আয়রন আর ফোলেট। অর্থাৎ রক্তশূন্যতা এড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে বিটরুট। তবে এখানে একটি বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন, বিটরুট কিংবা অন্যান্য যেকোনো উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে আয়রন পেতে হলে সঙ্গে অবশ্যই ভিটামিন ‘সি’জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই কেবল দেহে সঠিকভাবে শোষিত হবে এই আয়রন। ত্বকের বয়সজনিত দাগছোপ এবং বলিরেখা এড়াতেও সাহায্য করে বিটরুট
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে:
বিটরুটে পাবেন নাইট্রেট। এই নাইট্রেট আমাদের দেহে ঢুকে পরিণত হয় নাইট্রিক অক্সাইডে। জানেন নিশ্চয়ই, রক্তচাপ ঠিক রাখতে এর ভূমিকা দারুণ। নাইট্রিক অক্সাইডের প্রভাবে আমাদের রক্তনালি ঠিকঠাক থাকে। ফলে সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক দুই ধরনের রক্তচাপ থাকে নিয়ন্ত্রণে। বিটরুট শরীরের রক্তপ্রবাহ আরও ভালো করে। ফলে আমাদের হৃৎপিণ্ড হয় শক্তিশালী এবং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি যায় কমে।
ওজন কমায়:
১০০ গ্রাম সেদ্ধ বিটে পাবেন ৪৪ ক্যালরি, ১ দশমিক ৭ গ্রাম প্রোটিন, ০ দশমিক ২ গ্রাম ফ্যাট ও ২ গ্রাম ফাইবার। সেদ্ধ বিটরুট খেলে পাবেন প্রচুর পুষ্টি, কিন্তু এতে ক্যালরি থাকবে কম। অর্থাৎ পুষ্টি ঠিকঠাকমতো পাবেন আর ওজনও বাড়বে না।
শক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়:
যাঁরা অ্যাথলেট বা নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়াম করেন, তাঁরা বিটরুটের জুস খেতে পারেন নিয়মিত। অ্যাথলেটদের প্রচুর শক্তির দরকার। বিটে থাকা নাইট্রেট শরীরের কোষে শক্তি উৎপাদক মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। আর এতে শারীরিক কর্মক্ষমতাও বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিটের জুস শরীরের সহনশীলতা ও কার্ডিওরেসপিরেটরি (শ্বাসপ্রশ্বাসে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত) কর্মক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া ব্যায়ামের সময় শরীরে অক্সিজেন ব্যবহারের যে প্রক্রিয়া, তা আরও গতিশীল করে।
প্রদাহ কমায়:
বেশির ভাগ রোগবালাইয়ের মূল কারণ প্রদাহ। শরীরের রোজকার নানা ছোটখাটো সমস্যা সেরে না উঠলে মারাত্মক প্রদাহের রূপ ধারণ করে। আর বিটরুট অ্যান্টি–ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহরোধী গুণে ভরপুর। বিটের দারুণ গাঢ় রঙের নেপথ্যে আছে ‘বিটালেইন’ নামের রঞ্জক উপাদানটি। নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ বিটালেইনে থাকে প্রদাহরোধী উপাদান। ফলে প্রদাহ থেকে দূর থাকতে চাইলে বিটরুট খান।
অন্ত্র সুস্থ ও সবল রাখে :
ভালো হজম ও সুস্থ লিভারের জন্য দরকার ফাইবার বা আঁশ। যা বিটরুটে পাবেন প্রচুর পরিমাণে। বিটরুট শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়। যার ফলে আপনি থাকবেন নীরোগ। আমাদের শরীরে সুগার বা শর্করার মাত্রা কমবেশি হলে কী সমস্যা হতে পারে, তা তো সবার জানা আছে। বিটরুটের রস রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য যা জরুরি দরকার। রোজকার জীবনে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় আমাদের, তাই প্রচুর শক্তিও দরকার। বিটরুট খেলে শরীরে সারা দিন শক্তি স্থিতিশীল থাকে।
মস্তিষ্ক সুস্থ রাখে:
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্ক দুর্বল হতে থাকে। বিটরুট মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। ফলে বেড়ে যায় স্মৃতিশক্তি। অর্থাৎ বিটরুট মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতেও দারুণ কার্যকর
আঁশ কথন:
আঁশের উপকারিতা তো বহুমাত্রিক। আঁশজাতীয় খাবার হজম হতে সময় লাগে। ফলে এ–জাতীয় খাবার খাওয়ার পর পেট ভরা থাকে বেশ অনেকটা সময়। তাই ক্ষুধাও অনুভূত হয় না। অর্থাৎ ‘ডায়েট কন্ট্রোল’ বা খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আঁশসমৃদ্ধ খাবার থেকে উপকার পাবেন। পরোক্ষভাবে ওজন কমাতে সহযোগিতা করে এসব খাবার। কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করতে পর্যাপ্ত আঁশ গ্রহণ তো প্রয়োজন সবারই। রক্তের খারাপ চর্বি কমাতেও সাহায্য করে আঁশ। সুস্থ থাকতে তাই আপনাকে আঁশসমৃদ্ধ খাবার খেতেই হবে।
যেভাবে পাবেন উপকার:
বিটরুটের এত সব উপকারিতা পুরোপুরিভাবে পাবেন, যদি আপনি তা কাঁচা গ্রহণ করেন। রান্না করতে গেলে কিছু পুষ্টি উপাদান হারিয়ে যেতে পারে। বরং অন্যান্য কাঁচা উপকরণের সঙ্গে মিলিয়ে সালাদ হিসেবে খেতে পারেন। সালাদেই যোগ করে নিতে পারেন খানিকটা লেবু বা ভিটামিন ‘সি’জাতীয় অন্যান্য ফল। তাহলে দেহে আয়রন শোষিত হবে ঠিকঠাক। আবার চাইলে রস করেও খেতে পারেন বিটরুট। বিটরুট, গাজর, শসা, কমলা, পালংশাক আর আদার রস একসঙ্গে পানীয় হিসেবে খেতে পারেন। কিন্তু রস করে খাওয়া হলে অবশ্য আঁশের উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হবেন। তবে বাকি উপকার মিলবে। কিন্তু বিটরুট যদি চূর্ণ করে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্য এর পুষ্টি উপাদানের অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে প্রক্রিয়াজাত করার সময়। তাই বিটরুট পাউডার খেলে কতটা উপকার মিলবে, সে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। পাউডার যদি নিতেই হয়, তাহলে তা নিতে হবে বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে, তৈরির সময় যাঁদের বিটরুট পাউডারে অধিকাংশ পুষ্টি উপাদান ঠিক থাকে। তবে সেখান থেকেও কিন্তু আঁশের উপকার মিলবে না। সত্যিকার অর্থে বিটরুটের সব পুষ্টি পেতে হলে আপনাকে তা কাঁচা অবস্থায়ই গ্রহণ করতে হবে।
ভেঙে যাক ভুল
বিটরুট খেলে লিভার ভালো থাকে কিংবা এটি শক্তিবর্ধক—এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত নয়। লিভারের কোনো নির্দিষ্ট রোগকে প্রতিরোধ করতে কিংবা দেহের শক্তি বাড়াতে এর আলাদা কোনো ভূমিকা নেই। তবে রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত ব্যক্তির হিমোগ্লোবিনের ঘাটতিটা পূরণ করা গেলে তিনি সবল হয়ে ওঠেন। সেই হিসেবে বলা যেতে পারে বিটরুট সেই রোগীদের জন্য শক্তিবর্ধক। তবে আদতে এটি শক্তি বাড়ানোর কোনো ‘টনিক’ নয়। সরাসরি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কিংবা ডায়াবেটিস প্রতিরোধেও এর কোনো প্রভাব নেই।
সুস্থ থাকতে কাঁচা সবজি হিসেবে রোজ বিটরুট খেতে পারেন, এমনকি মৌসুমজুড়েই। মাঝারি আকারের একটি বিটরুট খেতে পারেন আপনি। আকার বড় হলে অর্ধেকটা খাওয়া ভালো।