20/08/2022
শিশু এ্যাজমা এবং বড়দের এ্যাজমা চিকিৎসা কি ভিন্ন ভিন্ন?
এটি খুবই সাধারণ প্রশ্ন। বয়স ভেদে এবং একসাথে দেহে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর (Co- Morbid Conditions) উপস্থিতির কারনে একই বয়সের এবং একই রোগের চিকিৎসা দু'জন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তারতম্য হতেই পারে। তদ্রূপ শিশু ও বয়স্কদের এ্যাজমা চিকিৎসায়ও কিছু পার্থক্য থাকবে। তবে মূলনীতি (Principle) কিন্তু একই থাকবে। সেজন্য বিশ্বের এ্যাজমা চিকিৎসা বিষয়ক সেরা সংগঠন GINA (GLOBAL INITIATIVE FOR ASTHMA) প্রতিনিয়ত এ্যাজমা চিকিৎসা বিষয়ে গাইডলাইন প্রকাশ করে থাকে। আগ্রহী যে কেউ সেটি দেখে নিতে পারেন। তবে মূল কথা চিকিৎসার মূলসূত্র একইরকম হবে শিশুও বয়স্ক এ্যাজমা চিকিৎসায়। আর এটি চিকিৎসকমাত্রই জানেন এ্যাজমা চিকিৎসার প্রধাণতম ওষুধ ইনহেলার এবং স্টেরয়েড (Inhaled Steroid)।
শুধু আমাদের দেশেই নয় বিশ্বের সর্বত্রই স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের প্রতি একধরণের ভীতি যেমন আছে তেমনি এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারও খুব কম হয় না। যে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার জন্য এই ভীতি সেটা কিন্তু মুখে সেব্য কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে নেবার স্টেরয়েড। ইনহেলার স্টেরয়েডের মাত্রা এতই কম যে এটি শ্বাসনালী বা ফুসফুসের বাইরে তেমন একটা যায় না ফলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ও দেখা দেয় না। সেদিক থেকে এটি যথেষ্ট নিরাপদ। তবে ওষুধ বলে কথা -- বিচার, বিশ্লেষণ, সতর্কতা অবলম্বন অবশ্যই থাকবে।
দ্বিতীয় বিষয় হলো সারা বিশ্বেই ইনহেলার ওষুধের একটা ভীতি আছে আমাদের দেশে আরও বেশি। ইনহেলার ওষুধ মানুষ সহজে গ্রহণ করতে চায় না।কেন -- তার ব্যাখ্যা যার যার নিজস্ব। কেউ কেউ মনে করেন এটি একবার নিলে আর ছাড়া যাবেনা- সারাজীবন নিতে হবে। কেউ মনে করেন এটিতে আসক্তি সৃষ্টি হবে, কেউ মনে করেন এটি একেবারে শেষ চিকিৎসা তাই আগে অন্য চেষ্টা করে দেখা যাক-- ইত্যাদি নানারকম অদ্ভুত ও কুসংস্কার অনেকের মনেই আছে, যার একটি সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ধারণা নয়। এরও বড় কারন ইনহেলার ওষুধের প্রচলন খুব প্রাচীন নয় এবং অনেকেই এটা দেখেনও নাই। ফলতঃ অনেকেই এই নতুন ধরনের ইনহেলার ওষুধের চিকিৎসা গ্রহণ করতে গড়রাজি হন। বিশেষ করে শিশুদের বাবা-মা এব্যাপারে বেশ উৎকন্ঠিত থাকেন - না জানি কী হয়! ফলে তাঁদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন এবং শিশু চিকিৎসা দেওয়ার সময় বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিলে তাঁরা নিশ্চয়ই গ্রহনে রাজি হবেন।
পক্ষান্তরে --
শিশু এ্যাজমা চিকিৎসায় ইনহেলার এর চেয়ে নেবুলাইজারের প্রতি বিশেষ ঝোঁক লক্ষ্য করছি (ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ) যেটার মাধ্যমে শিশুরা Definitive বা আবশ্যকীয় ও প্রয়োজনীয় ওষুধটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ফলাফল আশানুরূপ হচ্ছে না। কারন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি করা হয় এ্যাকিউট (Acute) বা তীব্র শ্বাসকষ্ট থাকা অবস্থায় এবং তখন যে ওষুধ দিয়ে নেবুলাইজ করা হয় তা সাময়িক উপসমকারী বা (Reliever) ওষুধ তাতে প্রতিরোধী বা Preventer ওষুধ থাকে না। ফলে বারবার নেবুলাইজ করছেন একটু রিলিভ পাচ্ছেন কিন্তু রোগটির জন্য নির্দিষ্ট করা চিকিৎসা বা Definitive Treatment দেয়া হচ্ছে না। ফলে বারবার তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে, কয়েকদিন পরপরই নেবুলাইজ করতে হচ্ছে। কিন্তু রোগটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ Control/ Remission) আসছে না। এখানে উল্লেখ্য যে শিশুদের এ্যাজমা ২-৫ বছর সঠিকভাবে চিকিৎসা করলে ৬০-৮০% নিরাময় হয়।
কয়েকদিন পূর্বে আট বছর বয়সের একজন শিশুকে নিয়ে বাবা-মা এসেছেন যার এ্যাজমা আছে এবং দিনে ২-৩ বার বাসার কাছেই ফার্মেসী থেকে নেবুলাইজ করাচ্ছেন বিগত প্রায় পনের দিন যাবৎ। কিন্তু শিশুটি Inhaled Steroid বা অন্য কোন ওষুধ পাচ্ছেনা।অত্যন্ত হৃদয় বিদারক মনে হলো বিষয়টি। এখন পাড়ায় মহল্লায় প্রায় ফার্মেসীতে নেবুলাইজার মেশিন আছে এবং ফার্মেসীর লোকজন নেবুলাইজ করতে শিখে গেছেন এবং নেবুলাইজ করছেন। এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনুমোদন করে কিনা ভেবে দেখবার বিষয়। আবার অনেকেই ঘরে নেবুলাইজার মেশিন কিনে নিয়েছেন শুধু শিশু নয় বয়স্ক ব্যক্তিদেরও শ্বাসকস্ট হলে এ্যাজমা সিওপিডি (ASTHMA/COPD) যাইহোক নেবুলাইজ করছেন। করোনাকালে চিকিৎসকগন কোভিড বা অন্য কোন শ্বাসকষ্টের রোগীদের পরামর্শ দিয়েছেন তারাও অনেকে কিনে নিয়েছেন। চিকিৎসক এর ব্যবস্থা অনুযায়ী করা হলে সেটা ঠিকই আছে।
যাইহোক লেখার মূল বিষয়টি হচ্ছে শিশু এ্যাজমা চিকিৎসায় যেন গ্রামার মেনে দুই বছর থেকে তদূর্ধ্ব শিশুদের Inhaled Steroid দিয়ে নিয়মানুযায়ী সঠিক চিকিৎসা করা হয় তার উপর গুরুত্ব আরোপ করা এবং মুখে সেব্য কিংবা ইনজেকশন স্টেরয়েড যথাসম্ভব বর্জনের আহ্বান জানানো। পাঁচ বছরের বেশি বয়সের শিশুরা শিখিয়ে দিলে ইনহেলার টানতে পারে। তার চেয়ে কম বয়সীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের স্পেসার / মাস্কসহ স্পেসার SPACER with/ out Mask ফার্মেসীতে পাওয়া যায়। উপযুক্ত ক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহার করার আহ্বান জানাচ্ছি।
শিশুদের এ্যাজমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় কারন এটা সম্বন্ধে অনেক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে -- যেমন দাদি নানিরা বলবেন ছোটবেলায় একটু শ্বাস- কাশ, ঠান্ডার দোষ থাকেই, বয়স হলে ঠিক হয়ে যাবে। কথাটি আংশিক সত্য কেননা যে কোন সমাজে ১০-২০% শিশুর এ্যাজমা থাকে তবে সকলেই যে মারাত্মক তাতো নয়। কিন্তু যাদের মারাত্মক বা গুরুতর তাদের সঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হলে যে জটিলতা দেখা দেয় তা কিন্তু মারাত্মক। বিশেষ করে BRONCHIECTASIS নামের একটি জটিলতা হতে পারে শিশু এ্যাজমা চিকিৎসা না করা হলে কিংবা সঠিকভাবে না করা হলে। এটি একবার হলে আর সারানো সম্ভব হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফুসফুসের সার্জারী করে কেটে ফেলতে হয়। সবচেয়ে বড়কথা সকল শিশু এ্যাজমা রোগীরই স্কুল - খেলাধূলা - শারীরিক বৃদ্ধি - মানসিক স্বতঃস্ফূর্ততা এগুলোতে বিঘ্ন ঘটে। তাই সকলের উচিৎ শিশু এ্যাজমা অত্যন্ত যত্নের সাথে চিকিৎসা করানো এবং যেসকল কারনে এ্যাজমা বৃদ্ধি পায় যেমন অতিমাত্রায় ঠান্ডা / গরম,ধূলাবালি ও অ্যালার্জি সৃষ্টি করে এমন খাবার পরিহার করা।
সকল শিশুর কল্যাণ হোক।
ধন্যবাদ।