18/05/2025
জিলহজ্জ মাসের ফজিলত ও কিছু আমল---------
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে -
والفجروليالعشر
শপথ ভোর বেলার, শপথ দশ রাত্রির। - সূরা ফজর : ১-২
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. ও মুজাহিদ রাহ. সহ অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও মুফাসসিরের মতে এখানে দশ রাত্রির দ্বারা যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ রাতকেই বুঝানো হয়েছে। হাফেয ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, এটিই বিশুদ্ধ মত । -তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৫৩৫-৫৩৬
হাদীস: হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল যিলহজ্বের দশ দিন। জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহর রাস্তায়ও কি তার সমতুল্য নেই ? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায়ও তার সমতুল্য নেই, তবে ঐ ব্যক্তি, যার চেহারা ধূলিযুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছে । - মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১১২৮; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস : ২০১০।
অন্য বর্ণনায় হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত হয়েছে– যিলহজ্বের দশ দিনের চেয়ে কোনো দিনই আল্লাহর নিকট উত্তম নয়। - সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস : ২৮৪২
হাদীস: হযরত (আব্দুল্লাহ) ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই । সাহাবায়েকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তম ) নয় ? তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও নয়। তবে হ্যাঁ, সেই ব্যক্তির জিহাদ এর চেয়ে উত্তম, যে নিজের জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছে, তার পর কোনো কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি । - সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২৪৩৮; সহীহ বুখারী, হাদীস : ৯৬৯; সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৭৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৭২৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৯৬৮; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩২৪।
মাসআলা: জিল্লহজ্জ মাসের প্রথম দশকের রাত্রগুলো বছরের অন্যান্য রাত্রের তুলনায় উত্তম।- (মারাকিল ফালাহ্)।
জিলহজ্জ মাসের চাঁদ ওঠার পর শরীরের নখ – চুল ইত্যাদি কর্তন না করা :-
হাদীস: ৪৯৬১ : হজরত উম্মে সালমা (রা:) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যখন জিলহজ্জ মাস শুরু হয় আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা রাখে, সে যেন নিজের চুল বা শরীরের কোন কিছুই না কাটে । - মুসলিম শরীফ ইস: সে: ৭/২৩।
৪৯৬৩ নং: হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা জিলহজ্ব মাসের নতুন চাঁদ দেখতে পাও এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা রাখে সে যেন তার চুল, নখ ইত্যাদি কর্তন করা থেকে বিরত থাকে। - মুসলিম শরীফ ইস: সে: ৭/২৪।
৪৯৬৫ নং: হাদীসে আছে, “সে যেন জিলহজ্ব মাসের নতুন চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত নিজের চুল না কাটে এবং নখ না কাটে । ”—মুসলিম শরীফ ইস: সে: ৭/২৪।
# # উপরোক্ত আমল ধনী-গরীব উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। কারণ হাদীস শরীফে বলা হয়েছে “তোমাদের কোন ব্যক্তি কোরবানী করার ইচ্ছা করে, তাহার উচিত সে যেন কোরবানী না করা পর্যন্ত স্বীয় চুল-কেশ ইত্যাদি কর্তন না করে।”
সুতরাং কুরবানী করার ইচ্ছা বা নিয়ত ধনী-গরীব সকলেই করতে পারে। অতএব, যে ব্যক্তিই কুরবানী করার ইচ্ছা করবে সেই ব্যক্তিই উপরোক্ত আমল করতে পারবে এবং এর ফজিলত সে ব্যক্তিও অর্জন করবে।
হাদীস ১৩১ : শাইবান ইবনু ফাররূখ (রহঃ) ..... ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা ভালো এবং মন্দ উভয়টিকে লিপিবদ্ধ করেন। অতঃপর তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি কোন ভালো কাজ করার ইচ্ছা করে অথচ তা এখনও বাস্তবে পরিণত করেনি, তার জন্যে আল্লাহ নিজের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ সাওয়াব লিপিবদ্ধ করেন। আর যদি সে কোন ভালো কাজ করার ইচ্ছা করে এবং তা বাস্তবেও পরিণত করে, তখন আল্লাহ নিজের কাছে দশ থেকে সাতশ’ বা আরো অনেক গুণ বেশী সাওয়াব লিপিবদ্ধ করেন। আর যদি সে কোন মন্দ কাজ করার ইচ্ছা করে এবং তা বাস্তবে পরিণত না করে, তখন আল্লাহ নিজের কাছে একটি পরিপূর্ণ সাওয়াব লিখেন, কিন্তু যদি সে মন্দ কাজটি বাস্তবে পরিণত করে, তখন আল্লাহ তা’আলা কেবলমাত্র একটি পাপই লিপিবদ্ধ করেন। - সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৩৮, ইসলামিক সেন্টারঃ ২৪৬।
হাদীস : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে‘ আস রা: হইতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আল্লাহতায়ালা কুরবানীর দিনকে (১০ই জিলহজ্ব) এ উম্মাতের জন্য ‘ঈদ’হিসেবে পরিগণিত করেছেন। এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আমি যদি মাদী ‘মানীহা’ (দুধ পান করা বা মাল বহন করার শর্তে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অন্যের পশু প্রতিপালন করা ) ছাড়া অন্য কোন পশু না পাই। তবে কি তা দিয়েই কুরবানী করব ? তিনি বললেন; না; তবে তুমি এদিন তোমার চুল, নখ কাটবে। তোমার গোঁফ কাটবে। নাভীর নীচের লোম কাটবে। এটাই আল্লাহর নিকট তোমার পরিপূর্ণ কুরবানী - (তাহকীক মিশকাতুল মাসাবীহ ২/৪২৪-৪২৫/হা-১৪৭৯ (৩), সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ,)
# # উক্ত হাদীস শরীফের একজন রাবী ইসা ইবনে হেলাল আস সাদাফী সম্পর্কে তাকরীবুত তাহযীব কিতাবে বলেন, “ইসা ইবনে হেলাল আস সাদাফী রহ: ( তাবেয়ী ) সত্যবাদী ছিলেন। -- তাকরীবুত তাহযীব, জীবনী নং : ৫৩৩৭”
# # ইমাম ইবনে হিব্বান রহ: তার লিখিত ‘আসসিকাত’ কিতাবে ইসা ইবনে হেলাল আস সাদাফী রহ: এর জীবনী উল্লেখ করেছেন।
# # আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ: ইমাম নাসায়ীর সনদে উপরোক্ত হাদীসটি উল্লেখ করার পর বলেছেন হাদীসটি সহীহ। – নুহবাতুল আখবার ১৪/৫২০।
# # ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম হাকিম নাইসাবুরী রহ: বলেন সনদটি শক্তিশালী বা সনদটি হাসান। - মুসনাদে আহমদ ১১/১৩৯ টীকা।
# # আবু দাউদের টীকায় উক্ত হাদীসের সনদকে শায়খ শুয়াইব আরনাউত রহ: শক্তিশালী বলেছেন।
# # শায়খ মুহাম্মাদ আহম্মেদ শাকের মুসনাদে আহমদ – এর ৬৫৭৫ নং: হাদীসের টীকায় বলেন হাদীসটির সনদ সম্পূর্ণ সহীহ।
সালাফদের আমল :-
# # ওলীদ বিন মুসলিম বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আজলানকে যিলহজ্বের দশকে (১ হইতে ১০ তারিখ) চুল কাটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, আমাকে নাফে রাহ: বলেছেন যে, “আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা: এক নারীর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। মহিলাটি যিলহজ্বের দশকের ভেতর তার সন্তানের চুল কর্তন করছিল। তখন তিনি বললেন, যদি ঈদের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তবে বড় ভাল হত।– মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৭৫৯৫।
# # এ সম্পর্কে আরেকটি বর্ণনা হল—মুতামির ইবনে সুলাইমান আততাইমী রহ: বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি যে, ইবনে সীরীন রাহ. যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা অপছন্দ করতেন। এমনকি এই দশকে ছোট বাচ্চাদের মাথা মুন্ডন করাকেও অপছন্দ করতেন। - আল মুহাল্লা, ইবনে হাযম ৬/২৮।