29/04/2026
"স্যাকারিনের আকস্মিক আবিষ্কার ও বিতর্কিত ইতিহাস"
স্যাকারিন একটি কৃত্রিম মিষ্টিকারক উপাদান এবং চিনির চেয়ে প্রায় ৩০০
থেকে ৫০০ গুণ বেশি মিষ্টি। এটি আবিষ্কার করেন (১৮৭৯ সালে) রুশ বংশোদ্ভূত রসায়নবিদ Constantin Fahlberg, যিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের Johns Hopkins University–এর Prof. Ira Remsen-এর গবেষণাগারে কাজ করছিলেন। তিনি কয়লার
আলকাতরা (coal tar) থেকে প্রাপ্ত জৈব যৌগ (coal tar derivatives) নিয়ে গবেষণা করছিলেন। একদিন কাজ শেষে ল্যাব থেকে বাড়ি ফিরে হাত ভালোভাবে না ধুয়ে খাবার খাওয়ার সময় খাবারে অস্বাভাবিক তীব্র মিষ্টি স্বাদ অনুভব করেন - যা চিনি থেকেও বহু গুণ বেশি মিষ্টি।
বিষয়টি তাকে বিস্মিত করে!!
তিনি বুঝতে পারেন, ল্যাবে কাজ করার সময় তার হাতে লেগে থাকা রাসায়নিক পদার্থ থেকেই এই মিষ্টি স্বাদ এসেছে। পরে তিনি গবেষণাগারে ফিরে গিয়ে যে রাসায়নিকগুলো (Chemical Compounds) নিয়ে কাজ করছিলেন সেগুলো পরীক্ষা করেন এবং আবিষ্কার করেন যে একটি নির্দিষ্ট যৌগই এই তীব্র মিষ্টি স্বাদের জন্য দায়ী।
উক্ত যৌগটিকে "ortho-benzoic sulfimide" হিসেবে নাম করন করা হয় যা পরে স্যাকারিন (Saccharin) নামে পরিচিত হয় এবং এটি বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম মিষ্টিকারক হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
ফাহলবার্গ (Fahlberg), Prof. Ira Remsen –এর তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় যৌগটি আবিষ্কার করলেও, Prof. Remsen-এর অজান্তে Fahlberg গোপনে নিজের নামে পেটেন্ট করে নেন এবং জার্মানিতে স্যাকারিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেন। এতে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করেন। Prof. Remsen দাবি করেন এটি যৌথ গবেষণার ফল এবং Fahlberg তার নৈতিক অধিকার
লঙ্ঘন করেছেন, যার ফলে তিনি তার প্রতি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন Fahlberg পেটেন্টটি নিজের নামে নিয়ে বাণিজ্যিক সুবিধা নিলেও, বৈজ্ঞানিক মহলে Prof.Remsen-এরই বেশি প্রশংসা করা হয়।
১৮৮০-এর দশকে স্যাকারিন প্রথমবার শিল্প পর্যায়ে উৎপাদন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এটি চিনির বিকল্প মিষ্টিকারক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগী এবং যাদের চিনি (sugar) নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়,তাদের মধ্যে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
পরবর্তীতে ১৯০৭ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে স্যাকারিন নিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে বিতর্ক শুরু হয়, যেখানে এর নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে সরকারি ও বৈজ্ঞানিক মহলে মতভেদ দেখা দেয়। তৎকালীন মার্কিন খাদ্য নিয়ন্ত্রক Dr. Harvey W. Wiley স্যাকারিনকে একটি কৃত্রিম রাসায়নিক হিসেবে সমালোচনা করেন এবং এর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Roosevelt (১৯০১-১৯০৯সাল পর্যন্ত
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন), যিনি নিজেও ডায়াবেটিস রোগী ছিলেন এবং স্যাকারিন ব্যবহার করতেন, তিনি এর পক্ষে অবস্থান নেন। ফলে স্যাকারিন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ না হলেও, এর ব্যবহার ও বাজারজাত করণের ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং মহামন্দার যুগে চিনি সংকটের কারণে
স্যাকারিনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এরপর ১৯৫০–এর দশকে এটি অন্যান্য কৃত্রিম মিষ্টিকারক যেমন Cyclamate -এর সাথে মিশিয়ে ডায়েট সফট ড্রিংকসে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ১৯৬৯ সালে Cyclamate নিষিদ্ধ হলে স্যাকারিন আবারও নজরদারিতে আসে।
১৯৭৭ সালে কানাডার একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ইঁদুরের ওপর খুব উচ্চ মাত্রায় স্যাকারিন প্রয়োগ করলে মূত্রাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
এই ফলাফলের ভিত্তিতে মার্কিন খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন - “ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন” (FDA) স্যাকারিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেয়। তবে পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়, কারণ ইঁদুরে ব্যবহৃত মাত্রা ছিল মানুষের স্বাভাবিক গ্রহণমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। জনগণের প্রতিবাদ এবং বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের চাপে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা হয়নি। এর পরিবর্তে একটি সমঝোতা হিসেবে স্যাকারিন পণ্যের ওপর সতর্কীকরণ লেবেল (warning label) বাধ্যতামূলক করা হয়, যেখানে উল্লেখ ছিল যে পরীক্ষাগারে প্রাণীদের ওপর গবেষণায় ক্যান্সারের ঝুঁকি দেখা গেছে।
পরবর্তীতে দীর্ঘ গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে এই ঝুঁকি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কারণ এটি ইঁদুরের নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় (Physiological) কারণে হয়েছিল। অবশেষে ২০০০ সালে স্যাকারিনকে সম্ভাব্য কার্সিনোজেন বা ক্যান্সার-সৃষ্টিকারী পদার্থের তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
২০০১ সালে মার্কিন খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (FDA) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণার ভিত্তিতে এটিকে মানুষের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ !! হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।