05/04/2026
যে ভুলের কারণে মাকে হারিয়েছি.....
আমার মায়েরা ৮ বোন। ২০০৮ সালের দিকে আমার ছোট মাসির ওভারিয়ান ক্যান্সার ধরা পড়ে। আমি তখন এমবিবিএস পাস করেছি। রংপুর মেডিকেলে ট্রেনিং করি এফসিপিএস এর। মাসি তখন খুব অসুস্থ। পেটে প্রচুর পানি জমে। কয়েকদিন পর পর পানি বের করতে হয়। মাসি একদমই নড়াচড়া করতে পারেন না। আমি ৭ দিন পর পর পেটের পানি বাসায় গিয়ে বের করি। শেষের দিনগুলোতে পানি বের হতো না, রক্ত কমে যেতো। এসব দেখে আমি খুব ভয় পেতাম। ভাবতাম আমার মায়ের যদি এমন হয়। বিভিন্ন ভাবে জেনেছি আমার আরো ২ মাসি ওভারিয়ান ক্যান্সারে মারা গেছেন। আমি প্লান করে রেখেছিলাম মার অপারেশন করে ওভারিগুলো কেটে ফেলবো। কিন্তু এরপর আমি ভুলে যাই। এই ভুল আমার মাকে আমার জীবন থেকে কেড়ে নেয়।
২০১৩ সালে মা একবার অসুস্থ হোন, খুবই অসুস্থ। চরম এক যুদ্ধের পর মা সুস্থ হোন। আমি ভেবেছিলাম এরপর আর মার কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু ২০১৬ সাল, অক্টোবর মাস, মা ফোনে বলল- পেট ভরা ভরা লাগে, ক্ষুধা লাগে না। আমি রংপুরে আসতে বলি, মা ৭ দিন পর আসতে চায়, এরপর বলে- তুই ইন্ডিয়া থেকে ঘুরে আয় তারপর যাবো, এরপর বলে দুর্গাপূজার পর যাবো। এভাবে ২৫ দিন পর মা আসেন। আল্ট্রা করেই বোঝা যায় মার পেটে পানি জমেছে। এটা দেখেই আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। আমার মনে আছে সেদিন ছিল বুধবার, এরপর মায়ের পেটের সিটিস্ক্যান করা হয়, পেটের পানি বের করা হয়। পেটের পানির পরীক্ষা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে পেটের পানির প্রাথমিক রিপোর্ট আসে যক্ষা রোগের মতো। আমি খুশিতে আত্নহারা হয়ে যাই। শুক্রবার সকালে মাকে যক্ষার ঔষধ খাওয়াই। এরপর মাকে নিয়ে মন্দিরে যাই। দুপুর ১টায় ডাঃ আহসান হাবিব স্যার পেটের পানি আবারো টেস্ট করে আমাকে ফোন দেন, ভয়ে ভয়ে ফোন ধরি। স্যার জানান- পেটের পানিতে ক্যান্সার সেল পাওয়া গেছে। এরপরও আমি আশায় থাকি, মার অপারেশনের পর বায়োসপি ঢাকায় পাঠানো হয়। আমি শিউর হবার জন্য ২ জায়গায় রিপোর্ট করাই। আমার ইমেইলে বায়োপসি রিপোর্ট এসেছে। আমি তখনো আশায় ছিলাম পূর্বের সব রিপোর্ট ভুল প্রমাণ করে বায়োপসিতে যক্ষা আসবে। ভয়ে ভয়ে ইমেইল খুললাম- আমার সব আশা নিরাশায় পরিণত হলো। মার পৃথিবীতে বেঁচে থাকার দিন গোনা শুরু হলো।
মা চলে গেছেন অনেকদিন হলো। আমার ভুলগুলো আমাকে খুবই পীড়া দেয়। মনে হয় একটা যদি সুযোগ পেতাম যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও সব ভুল শোধরায়ে মাকে ফিরিয়ে আনতাম।
আমার দিদিদের আর সে ভুল করতে দেই নাই। দিদিদের মেনোপজ হবার পরই দুজনের ওভারি অপারেশন করে নিয়েছি।
যাদের পরিবারে ওভারিয়ান বা স্তন ক্যান্সার আছে তারা মায়ের, বোনের যত্ন নিন। তাদের ক্যান্সার স্ক্রিনিং করুন। চিকিৎসকের পরামর্শমতো ক্যান্সার প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিন।