06/04/2026
আসহাবে সুফফার একজন খুবই গরীব সাহাবি রাবিআ বিন কাব আল আসলামি রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি আহলুস সুফফার সদস্য ছিলেন। মসজিদে নববির পেছন দিকে একটা অংশ ছিল, যেখানে বসবাসকারীদের আহলুস সুফফা বলা হতো। আহলুস সুফফার সাহাবাগণ ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই কপর্দকশূন্য। আমরা প্রায়ই বলি না যে “হাতে টাকা-পয়সা নাই,” “অভাবে আছি” ইত্যাদি? আমাদের বলার অর্থ হলো, “আমার পকেটে বেশি টাকা নেই, কিন্তু বাপের টাকা দিয়ে আরামেই চলছি।” কিন্তু এই আহলুস সুফফার মানুষগুলোর কাছে সত্যি সত্যিই কোনোই টাকা-পয়সা ছিল না। মসজিদে থাকছেন, সতর ঢাকার মতো পোশাক কিনবেন, সেইটুকু আর্থিক সামর্থ্যও নেই। আপনি মসজিদে নববিতে সালাত আদায় করছেন, কিন্তু আপনার সতর ঢাকার মতো সামর্থ্য নেই! ভাবতে পারেন?
আল্লাহর রাসূল তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য যখন ঘর থেকে বের হতেন, রাবিআ বিন কাব আল-আসলামি নবিজির জন্য ওযুর পানি নিয়ে আসতেন। এমনি একদিন রাবিআ ওযুর পানি নিয়ে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাবিআর দিকে তাকালেন। তাঁর গরিবি হালত দেখে নবিজির মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
— “রাবিআ, কিছু একটা চাও।”
— “হে আল্লাহর নবি! আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই।”
নবিজি যেন ইঙ্গিতে বোঝাতে চাচ্ছেন, আরে! আমি আখিরাতের কথা বলছি না। এখানে দুনিয়ায় কী চাও? স্ত্রী লাগবে না? অথবা একটা ঘর? বলো, কিছু একটা চাও। রাবিআ নবিজির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই। আর কিছু না।”
আচ্ছা ভাবুন তো আপনি বিল গেটসের সাথে একটা রুমে বসে কথাবার্তা বলছেন। সে আপনার অবস্থা দেখে দুঃখ পাচ্ছে। তারপর হঠাৎ বলল—“আপনি এই চেকটাতে যেকোনো একটা টাকার পরিমাণ লেখেন তো। আমি সাইন করে দিই।” সেখানে এই তরুণ সাহাবি প্রস্তাব পেলেন স্বয়ং আল্লাহর নবির কাছ থেকে। যে নবি কেবল দুআ করলে, আল্লাহ্ আসমান থেকে স্বর্ণের বৃষ্টি বর্ষণ করিয়ে ছাড়তেন, সেই নবি রাবিআকে বলছেন কিছু একটা চাইতে। কিন্তু গরীব এই সাহাবির জীবনে শুধু একটিই চাওয়া—জান্নাতে যেন নবিজির সাথে থাকতে পারেন।
যেখানে আমরা বলি জান্নাতে কোনোরকমে ঢুকতে পারলেই হলো! সেখানে এই মানুষগুলোর চিন্তাভাবনা কেমন ছিল দেখুন। দুনিয়ায় যার কিছুই নেই, একেবারে নিঃস্ব, অসহায়—সেই মানুষটি আপনার আমার মতো শুধু কোনোমতে জান্নাতে যেতে চান না। তিনি চান জান্নাতে যেন নবিজি তাঁর সঙ্গী হয়।
রাবিআর এই চাওয়া শুনে নবিজি (সা.) বললেন,
— “হে রাবিআ! তুমি বিরাট এক জিনিস চেয়েছ। বেশি বেশি সিজদার মাধ্যমে তোমার এই অনুরোধ পূরণে আমাকে সাহায্য করো।” অর্থাৎ বেশি বেশি সালাত পড়ো।
আরেকজন সাহাবি একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যতক্ষণ আপনার সাথে থাকি, ততক্ষণ আমার মন-মেজাজ খুব ভালো থাকে। আর যখনই ঘরে ফিরে যাই, তখনই আপনাকে মিস করতে শুরু করি। তারপর আমি পরিবারকে ছেড়ে আবার আপনার কাছে ফিরে আসি। আপনার উপর চোখ পড়তেই আমার অন্তরে প্রশান্তি ফিরে আসে। কিন্তু হঠাৎ আমার মাথায় চিন্তা ভর করল যে, একদিন তো আপনি মারা যাবেন, আর আমিও মারা যাব। আর তখন আপনি থাকবেন জান্নাতের উঁচু স্তরে নবিদের সাথে। আর আমি যদি কোনোমতে জান্নাতে যেতে পারিও, আমি তো আর আপনার সমকক্ষ হতে পারব না, জান্নাতে গেলেও হয়তো নিচু কোনো স্তরে থাকব। ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাত কী করে আমার কাছে জান্নাত হবে, যদি সেখানে আপনাকে না পাই?”
সাহাবির কথা শুনে কিছু সময়ের জন্য নবিজি নির্বাক হয়ে গেলেন। আসমান থেকে জিবরিল আলাইহিসসালাম নেমে এলেন। তিনি বললেন, “আপনার উম্মাতকে বলে দিন, তারা যাকে ভালোবাসে, জান্নাতে তাদের সাথেই থাকবে।” আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আল্লাহর কসম! এই হাদিসটি আমাদের সবথেকে প্রিয়। কারণ আল্লাহর কসম! আমরা রাসূল (সা.), আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এর চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবাসতাম না।”
আকাশের ওপারে, অনিন্দ্য সুন্দর জান্নাতে, আল্লাহ্ যেন আমাদেরকেও একটি করে ঘর বানিয়ে দেন। যে ঘরের পাশেই কোথাও প্রিয় নবিজিও থাকবেন। কোথাও থাকবেন আবু বকর (রা.), কোথাও উমর (রা.)। আমরা সেদিন বলব, দুনিয়াতে আপনাদেরকে আমরা ভালবাসতাম। জান্নাতে এসে একদিন আপনাদের সাথে মিলিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।
আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে কবুল করেন। আমীন।
© Bujhtesina Bishoyta