29/12/2025
ডা. পদবি বনাম ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্র
— একটি গবেষণাধর্মী, বিশ্লেষণমূলক ও আত্মসমালোচনামূলক নিবন্ধ
কলমে:
হাকীম মনোওয়ার হোসাইন সোহেল
মনোয়ার মেডিকেল হল
জালালাবাদ হাউস, জিন্দাবাজার, সিলেট
─────────────────────────────
ভূমিকা: ইউনানি চিকিৎসা—একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান
─────────────────────────────
ইউনানি চিকিৎসা বিজ্ঞান মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ও পরীক্ষিত
চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি কোনো লোকাচার বা কুসংস্কারভিত্তিক
চিকিৎসা নয়; বরং মানবদেহ, প্রকৃতি ও পরিবেশের পারস্পরিক
সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি সুসংগঠিত বিজ্ঞান।
মিজাজ, আখলাত (চার রস), অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বভাব ও রোগের
কারণ-কার্য সম্পর্ক: এই সবকিছু মিলেই ইউনানি চিকিৎসার ভিত্তি।
─────────────────────────────
ইতিহাসের আলোকে “ডাক্তার” বনাম “হাকীম”
────────────────────────────
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হিপোক্রেটিস, জালিনুস কিংবা ইমাম ইবনে
সিনা (রহ.)—কেউই “ডাক্তার” ছিলেন না; তারা ছিলেন “হাকীম”।
“ডাক্তার” শব্দটি আধুনিক ইউরোপীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার ফসল,
যার উদ্ভব ব্রিটিশ শাসনামলে এই উপমহাদেশে ঘটে।
অতএব হাকীম পদবি কোনো কম মর্যাদার নয়; বরং এটি ছিল
চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পরিচয়।
────────────────────────────────────────────
বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বৈততা: ইবনে সিনাকে মানি কিন্তু ইউনানিকে নয়!
──────────────────────────
বর্তমান চিকিৎসা অঙ্গনে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়।
অনেক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক ইউনানি চিকিৎসাকে অবৈজ্ঞানিক
বলে দাবি করলেও ইবনে সিনাকে সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদ হিসেবে
স্বীকার করেন। অথচ তারা অনুধাবন করেন না—ইবনে সিনা
ইউনানি চিকিৎসা ধারারই সর্বোচ্চ প্রতিনিধি।
এই অবস্থান আসলে জ্ঞানের নয়, বরং ধারণাগত বিভ্রান্তির ফল।
─────────────────────────────
ডাক্তার পদবি প্রসঙ্গ: অধিকার না বিভ্রম?
─────────────────────────────
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় “ডাক্তার” পদবি একটি ক্ষমতা,
সম্মান ও কর্তৃত্বের প্রতীক। ইউনানি চিকিৎসকদের এই পদবি
পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—
আমরা কি শুধুই পদবি চাই, নাকি চিকিৎসা বিজ্ঞানের পূর্ণ
দায়িত্ব ও দক্ষতাও অর্জন করতে প্রস্তুত?
আইনগত বঞ্চনার পাশাপাশি আত্মসমালোচনার এই জায়গাটিও
আমাদের দেখতে হবে।
─────────────────────────────
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি, মানের অবনতি
────────────────────────────
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে বহু ইউনানি ও আয়ুর্বেদ শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অবকাঠামো, চাকচিক্য ও
প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ঘটলেও পাঠ্যক্রম, গবেষণা ও
ব্যবহারিক দক্ষতায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
শিক্ষা যখন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন চিকিৎসা
শিল্পে প্রকৃত দক্ষতা জন্মায় না।
─────────────────────────────
ঔষধ শিল্প ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বাস্তবতা
────────────────────────────────────────────
আজ ইউনানি চিকিৎসায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ ক্রমবর্ধমান।
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়—এর বেশিরভাগই
প্রকৃত ইউনানি ঔষধের ফল নয়।
বাজারে প্রচলিত বহু তথাকথিত ইউনানি ঔষধ কেমিক্যাল
সংমিশ্রণে তৈরি, যেখানে কমিশননির্ভর বিক্রয় ব্যবস্থা
চিকিৎসাকে পণ্যে পরিণত করেছে।
এর দায় এড়ানোর সুযোগ আমাদের নেই।
─────────────────────────────
ভেষজ জ্ঞানের অবক্ষয় ও আত্মবিস্মৃতি
─────────────────────────────
ইউনানি চিকিৎসার প্রাণ হলো ভেষজ।
কিন্তু আমরা আজ ভেষজ চিনি না, সংগ্রহ করি না,
পরীক্ষা করি না, ওষুধ প্রস্তুত করতে পারি না।
আরও ভয়াবহ হলো যারা প্রকৃতভাবে এই কাজ করতে চান,
তাদের আমরা উৎসাহ না দিয়ে বাধাগ্রস্ত করি।
এটাই আমাদের আত্মবিস্মৃতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
─────────────────────────────
নেতৃত্ব সংকট: কে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইউনানি চিকিৎসাকে?
─────────────────────────────
যে পেশার নেতৃত্ব সেই পেশার লোকের হাতে না থাকে,
সে পেশা কখনো এগোতে পারে না।
বর্তমানে ইউনানি চিকিৎসার নেতৃত্বে দেখা যায়
ঔষধ কোম্পানির মালিক, অ্যালোপ্যাথিক ও হোমিও
প্র্যাকটিশনার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কিংবা
রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তির আধিক্য।
প্রকৃত ইউনানি হাকীম সেখানে সংখ্যালঘু।
─────────────────────────────
বৈজ্ঞানিক দক্ষতার প্রশ্ন: আমরা কেন পিছিয়ে?
────────────────────────────────────────────
আমরা ডাক্তার শব্দের মর্যাদা চাই,
কিন্তু Anatomy, Physiology, Pathology,
Pharmacology, Biochemistry, Gynecology,
Medicine ও Surgery-এর মতো মৌলিক বিষয়ে
আমাদের দখল কেন এমবিবিএস চিকিৎসকদের সমমানের নয়?
এই প্রশ্নের জবাব আমাদেরই খুঁজতে হবে।
বিজ্ঞান চর্চা ছাড়া কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাই টিকে থাকে না।
─────────────────────────────
উপসংহার: পথ কোনদিকে?
─────────────────────────────
ইউনানি চিকিৎসার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আত্মসমালোচনা,
শিক্ষা সংস্কার, ভেষজ গবেষণা এবং নৈতিক নেতৃত্বের উপর।
শুধু পদবি নয়, প্রয়োজন যোগ্যতা ও দায়িত্ব।
সত্যকে গ্রহণ করলে তবেই সংস্কার সম্ভব।
ইনশাআল্লাহ, সেই পথেই রয়েছে সম্মান, কল্যাণ ও মুক্তি।
কালেক্ট করেছি আমি Hakim Jamil Ahmad