22/12/2025
ব্র্যান্ড স্কুল নয়, সন্তানের মেধাই আসল
ঢাকা শহরের কিছু নামডাকওয়ালা স্কুল–কলেজ...........—দীর্ঘদিন ধরে ‘সেরা’ তকমা পেয়ে এসেছে। ফলে প্রতি বছর অসংখ্য অভিভাবক সন্তানকে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়—স্কুলের নাম নয়, ফলাফলই শিক্ষার আসল প্রমাণ।
মেডিকেল, বুয়েট বা শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখলে দেখা যায়, অনেক সময় মফস্বল বা প্রায় অখ্যাত কলেজ থেকেও অসাধারণ সাফল্য আসে। যেমন—উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে এককভাবে ৪৫ জন শিক্ষার্থী মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, শিক্ষাগত উৎকর্ষ কোনো ব্র্যান্ডের দান নয়; এটি আসে নিয়মিত পড়াশোনা, শৃঙ্খলা ও সুস্থ একাডেমিক পরিবেশ থেকে।
ভারতের কোটা শহরেও কোনো নামী স্কুল নেই, তবু সেখান থেকেই সবচেয়ে বেশি IIT ও AIIMS শিক্ষার্থী বের হয়। কারণ সেখানে আছে লক্ষ্যভিত্তিক প্রস্তুতি ও পড়ালেখার সংস্কৃতি—হাইপ নয়।
এসএসসি পরীক্ষাতেও আমরা দেখি, বোর্ডে প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ঢাকার আলোচিত স্কুল থেকে আসে না। তবু সামাজিকভাবে এই স্কুলগুলোকেই ‘সেরা’ ধরে নেওয়া হয়—যা বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় মেলে না।
শিক্ষার বড় সমস্যা হলো—অযৌক্তিক ভর্তি প্রতিযোগিতা, বড় ব্যাচ, স্কুলভিত্তিক কোচিং আর ক্লাস জাম্পের প্রবণতা। দ্বিতীয় শ্রেণি শেষ করে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি—শিশুর শেখার স্বাভাবিক স্তরকে ভেঙে দেয়। অথচ শেখা একটি ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া। ফিনল্যান্ডের মতো সফল শিক্ষা ব্যবস্থা তাই বলে—
“কোনো শিশুকে তার বোঝার চেয়ে দ্রুত এগোতে বাধ্য করা উচিত নয়।”
বাস্তবে দেখা যায়, যেসব সাধারণ স্কুলে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, যেখানে শ্রেণিকক্ষই শেখার কেন্দ্র—সেখান থেকেই ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল আসে। কারণ সেখানে ভিত্তি গড়া হয় শুরু থেকেই।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
“শিক্ষা সেই যা মানুষকে মুক্ত করে।”
ভয়, তুলনা আর অমানবিক প্রতিযোগিতার শিক্ষা কখনো শিশুকে মুক্ত করতে পারে না।
তাই শ্রেষ্ঠ স্কুল সেটি নয়, যার গেটে সবচেয়ে বড় ভিড়; শ্রেষ্ঠ স্কুল সেটিই, যেখানে শিশুর ভিত মজবুত হয়, শেখার আনন্দ তৈরি হয় এবং মানুষ হওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
যারা নামী স্কুলে সুযোগ পাননি—তারা যেন হতাশ না হন। সন্তানের ভবিষ্যৎ কোনো একটি স্কুলের ভেতর আটকে থাকে না। এলাকার একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে, অভিভাবক হিসেবে আপনি যদি সন্তানের পাশে দাঁড়ান—তাহলেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হয়। কারণ কোনো স্কুলই আপনার মতো করে আপনার সন্তানকে বুঝবে না।
শিশু গড়ে ওঠে সম্পর্ক, ভালোবাসা ও সুস্থ পরিবেশে—শুধু সিলেবাসে নয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, সাধারণ স্কুল থেকেও অসাধারণ মানুষ তৈরি হয়।
অতএব, হাইপের পেছনে না ছুটে, তুলনার ফাঁদে না পড়ে, সন্তানের শেখার গতি ও প্রকৃতিকে সম্মান করুন।
স্কুল হবে সহযাত্রী—আর অভিভাবক হবেন সন্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাবিক।