26/01/2026
🌸🍀মায়ের গল্প-১ 🌸🍀
আজ মায়ের শরীর খারাপ । তারপরও মা সবার জন্য রান্না করে একটু শুতে গেলেন । নাহ, আজ তাঁকে কেউ ডাকেনি । মায়ের আজ বেশ বিশ্রাম হলো ।
রাতে মা খাবার খেতে রান্নাঘরে ঢুকলেন। দেখলেন শুধু ভাত পড়ে আছে অল্প । ক্ষুধার কষ্ট চলে গিয়ে মায়ের বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠলো । মা একে একে সবার ঘরে গেলেন । ছেলে, মেয়ে, স্বামী সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত । সবাই তার দিকে এক পলক তাকালো মাত্র । অন্ধকার বসার ঘরে গিয়ে বসলেন তিনি । হু হু করে উঠলো বুকটা । সে বহুকাল আগের কথা, মায়ের একটা বাপের বাড়ি ছিলো । মনে হলো,আজ খেতে গিয়ে তার কথা কারও মনে পড়েনি! সেই বহুকাল আগে বাবার পাশে গিয়ে না বসলে বাবা খাওয়াই শুরু করতেন না । একদিন বাবার উপর রাগ করে ঘুমিয়ে ছিলেন, মা এসে বললো ,খেতে আয়, তুই না খেলে বাবা খাবেন না তো। অগত্যা উঠতেই হলো । কত কথা আজ মনে পড়ছে!
মা আবার রান্না ঘরে ঢুকলেন । শুধু ভাত নিয়ে বসলেন। ভাতে আঙুল নাড়াতে নাড়তে মায়ের চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়লো ভাতের উপর । বিশ বছর!! সমস্ত কষ্ট, সব অভিমান জমে জমে এক পাহাড় সমান হয়েছে বুকের ভেতর । বলা হয়নি কাউকে । সবাই বলেন, তোমার আবার কিসের কষ্ট , কিসের অভাব ?কষ্টের কত প্রকার হয়, সে খবর কেউ জানে?
প্রতিদিন সবাইকে খাবার দিয়ে মা ডাইনিং টেবিলের এক কোণে বসে পড়েন । আগের দিনের ভাত, তরকারি দিয়ে খেয়ে উঠেন । নিজের সংসারের কিছুই নষ্ট করা যায় না ।
বিয়ের পর মাকে বলা হলো, তোমার চাকরি করার দরকার নেই । ঘরটা সামলাও । এখন সবাই বলে, সারাদিন বাসায় বসে বসে কি করো? মেয়ে বলে, মা, তুমি house wife । তুমি তো বেকার ।মা জানি কোথাও পড়েছিলেন, housewife সবচেয়ে highest paid job হওয়া উচিত!! housewife সবচেয়ে difficult job !
মা সেই কবেই সব বিসর্জন দিয়েছেন । কিন্তু এখনও একটু যত্ন, একটু ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে । মা জানেন, মায়েদের কিছু চাইতে নেই । তারপরও অযত্ন, অবহেলায় এখনও মায়ের বুকে ব্যথা হয়, এখনও মায়ের চোখে জল আসে ।
সেই ব্যথা, সেই চোখের জল কেউ দেখে না । দেখলেই বা কার কি আসে যায়!
ঘর , বর আর সংসার নিয়ে থাকতে থাকতে মায়ের সব বন্ধুরা হারিয়ে গেছে । মা বড্ড একা । মাঝে মাঝে মায়ের রাগগুলো ,কষ্টগুলো, কাউকে বলতে ইচ্ছে করে । মার আজ কেউ নেই ।বোনেরা ব্যস্ত, ভাইয়েরা ব্যস্ত । মন খারাপের কথা বললে তারা বলেন, যা একটু বেড়িয়ে আয় । যা একটু পার্লারে যা । মা তো বাহিরটা চেনেন না । একা বেরোনোর অভ্যাসটাই তো হারিয়ে ফেলেছেন সেই কুড়ি বছর আগে!!
মায়ের অজান্তেই পৃথিবীটা ছোট হয়ে গেছে ।
হুম , মায়ের ভাত খাওয়া শেষ হলো । চোখের জল প্রতিবারের মতো এমনিই বন্ধ হলো । রান্না ঘর গুছিয়ে মা ঘুমাতে গেলেন । মা যে চাকরিটা করেন, সেটা সবার আগে শুরু হয়, সবার পরে শেষ হয় । সেই চাকরির বেঁধে দেয়া working hours নেই । কোনও বেতন নেই, কোনও praise নেই, কারও কোন কৃতজ্ঞতা বোধ নেই । মাঝে মাঝে থাকে বাঁধ ভাঙা তিরস্কার!!
এটা আমাদের মায়ের গল্প নয়, আসলে বাঙালি মায়ের গল্প । গল্প বলবো না, চিরায়ত সত্য ।এত দেশের মানুষ দেখেছি, প্রতিনিয়ত দেখছি, একটা কথা না বললেই নয়, বাঙালি মায়েরা আলাদা, তাই ওদের গল্পটাও আলাদা , ওদের সত্যটাও আলাদা , ভীষণ কঠিন ।
✍️✍️✍️✍️✍️✍️ আবার কথা হবে আরেক বাঙালি মায়ের গল্প নিয়ে , যাদের খুব কাছ দেখেছি, দেখছি ✍️✍️✍️✍️✍️