09/11/2025
নভেম্বরের শুরুতে এসেও সারা দেশে ডেঙ্গুর অবস্থা ভয়াবহ।
ডেঙ্গু রোগ দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে, অর্থাৎ ডেঙ্গু ভাইরাস এবং তার বাহক এডিস মশাও দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে, আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য ডেঙ্গু এবং এডিস মশার বিবর্তন সম্পর্কে জানতে হবে৷
অতীত জানলে ভবিষ্যৎ অনুমান করতে সুবিধা হয়।
মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের সাথে এডিস মশা আর ডেঙ্গু ভাইরাস সহ-বিবর্তিত হয়েছে। Co-evolution এর চমৎকার উদাহরণ এই ডেঙ্গু৷
এডিস মশার পূর্বপুরুষ (মশার ক্ষেত্রে পূর্বমহিলা, মহিলা এডিস মশাই দুষ্টু) আফ্রিকার রেইনফরেস্টে বাস করত, যেখানে তারা বন্য প্রাণীর রক্ত খেত এবং গাছের ফাঁপা অংশে জমে থাকা পানিতে ডিম দিত।
কিন্তু প্রায় ৪,০০০–৫,০০০ বছর আগে, যখন আফ্রিকায় মানব বসতি এবং গ্রাম গড়ে উঠতে শুরু করল, তখন এডিস মশা ধীরে ধীরে মানুষের পরিবেশে অভ্যস্ত হতে শুরু করে, লোমহীন মানুষকে কামড়াতে সুবিধা।
এডিস মশা এই পর্যায়ে তিনভাবে অভিযোজিত হলো।
1. Habitat shift: বন থেকে শহর ও গ্রামাঞ্চলের পানির পাত্রে — যেমন হাঁড়ি, কলস, টব — প্রজনন শুরু।
2. Host preference shift: বন্য প্রাণী থেকে মানুষের রক্তে বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়।
3. Behavioral adaptation: দিনে কামড়ানো শুরু করে, কারণ রাতে মানুষ ঘুমায়, আগুন ও ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানো শুরু করে।
সভ্যতার ক্রমঅগ্রগতির সাথে সাথে এই “urban adaptation” বা গৃহস্থালী অভিযোজনই তাকে পৃথিবীর অন্যতম সফল মশায় পরিণত করেছে।
ইতিহাসে এডিস মশা আর মানুষ আসলে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে।
মানুষ ঘর বানিয়েছে, পানি সংরক্ষণ করেছে, শহর গড়েছে, এডিসকে নতুন ব্রিডিং স্পট দিয়েছে।
মশারি, স্প্রে, জেনেটিক কন্ট্রোলের মাধ্যমে মশার ওপর সিলেক্টিভ প্রেসার তৈরি করেছে।
মশা ধীরে ধীরে ইনসেক্টিসাইডের বিরুদ্ধে resistance genes তৈরি করেছে।
দিনেও কামড়ানোর অভ্যাস তৈরি করে মানুষের ঘুমের সময় এড়িয়ে যাচ্ছে।
মানুষের গন্ধে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ও কার্বন ডাই-অক্সাইড সেন্সর রিসেপ্টরগুলোতে জিনগত পরিবর্তন এসেছে, ফলে মানুষের গন্ধে সহজে আকৃষ্ট হয়। কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে তুলনামূলক ভারী, পায়ের দিকে জমে থাকায় মশারা পায়ে কামড়ায় বেশি, ওখানে হাত পৌছায় না, মারা কঠিন হয়।
এইভাবে মানুষ ও এডিস একে অপরের সাথে co-evolve করছে — একপক্ষ নতুন প্রতিরক্ষা তৈরি করে, আরেকপক্ষ নতুন আক্রমণ কৌশল।
এখন আসি ভাইরাসে, যারা এই মশাকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে।
আফ্রিকায় ডেঙ্গু ভাইরাস (DENV) মূলত প্রাইমেট ভাইরাস ছিল।
মানুষ ও এডিসের সম্পর্ক নিবিড় ওয়ার পর ভাইরাস host jump করে মানুষের শরীরে আসে।
বর্তমানে ৪টি সেরোটাইপ (DENV-1 থেকে DENV-4) আছে, আর একে অপরের থেকে অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট এর মাধ্যমে আলাদা হয়েছে। অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট আর শিফিট কী জিনিস পরে একবার আলোচনা করব, খুবই মজার জিনিস।
যাই হোক, একজন মানুষ একবার এক সেরোটাইপ দিয়ে ডেঙ্গু হলে পরে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে অ্যান্টিবডি-ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট (ADE) হয়ে রোগ আরও মারাত্মক হতে পারে।
এটাও এক ধরনের কো-ইভোলিউশন — ভাইরাস হোস্টের ইমিউন সিস্টেমকে ধোঁকা দিতে শিখছে।
চিকুনগুনিয়া ভাইরাস (CHIKV) এটি RNA ভাইরাস, এবং RNA ভাইরাসের মিউটেশন রেট অত্যন্ত বেশি।
ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, ২০০৫ সালে ভারত মহাসাগরীয় প্রাদুর্ভাবের সময় CHIKV এর E1-A226V mutation দেখা যায় — যা মশার Aedes albopictus প্রজাতির সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
অর্থাৎ ভাইরাসও vector adaptability বাড়িয়ে নিজের বেঁচে থাকার পথ তৈরি করছে।
এই ভাইরাস তার বাহক মশার শক্তিও বাড়িয়ে তুলেছে, কী ভয়াবহ ব্যাপার!
অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, "মানুষ মশা ভাইরাস"
সবাই একে অপরের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় ক্রমশ বিবর্তিত হচ্ছে।
আমরা মানুষরা এডিস মশার এই বিবর্তন সম্পর্কে জেনে মশার আবাসস্থল ধ্বংস করতে শুরু করলাম, জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া শুরু করলাম।
মশারা বিপদে পড়ল।
তারাও বিবর্তির হলো, আগে তারা ৭ দিনের জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ত, এখন এরা ৩ দিনের জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে, আগে এরা বেশি উড়তে পারত না, বড়োজোর ২-৩ তলা, এখন ১০-২০ তলাতেও উড়তে পারে। এরা লিফট, সিড়ি, বাতাসের প্রবাহ ব্যবহার করে এত উপরে উঠে আসে। এরা ছাদে জমে থাকা পানির গন্ধ পায় অনেক দূর থেকে। ঢাকায় এবং সিংগাপুরে ১৮ তলার উপরেও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছে।
এমনকি, এরা এখন সামান্য পানিতেও ডিম পাড়ে, মাত্র এক চামচ পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। চুইংগামের খোসায় যে ৫ মিলি পানি জমে থাকে, সেই পানিতেও এরা এখন ডিম পাড়তে পারে।
আরও ভয়ানক ব্যাপার, এরা এতই বিবর্তিত হয়েছে, এরা পানি ছাড়াও শুকনা টব, ভাঙা হাড়ির ধারে ডিম পাড়া শুরু করেছে, এদের ডিম আবার ৬ মাস তাজা থাকে, এই ছয় মাসের মধ্যে সামান্য পানির ছোঁয়া পেলেই দ্রুত ডিম ফুটে লার্ভা বেরিয়ে পড়ে।
সামনে কত ভয়ানক দিন আসছে, তা আমাদের বুঝতে হলে মশা এবং ভাইরাসের ইভোলিউশন সম্পর্কে আমাদের পূঙ্খানুপুঙ্খ জানতে হবে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে।
#জেনেটিক্স #ইভোলিউশন #জিনের_ভূত_ভবিষ্যৎ