21/03/2024
স্রস্টা তার সৃস্টির রুপ, রস,শব্দ, গন্ধ, ও স্শর্শের জন্য যে পাঁচটি ইন্দ্রীয় দিয়েছন তার মধ্যে দৃষ্টিময় চোখ সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্ব এতই বেশী যে, স্বয়ং ইশ্বরই অন্য ইন্দ্রিয় গুলোর সেবায় একটা বা দুটা লাগালেও মস্তিষ্ক থেকে আসা বারটি স্নায়ুর পাঁচটিকেই চোখের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।এই চোখে না দেখতে পারার বেদনা দৃস্টিহীন মানুষ ছাড়া সঠিক উপলব্ধি করতে পারেননা।চক্ষু বিজ্ঞানীরা সারা পৃথিবীর মানুষের কত মানুষ এবং কোন কারণে অন্ধ, তা নির্ণয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন করে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রতিকারের দিকে নজর দিচ্ছেন।আমরা ভাবি ছানি অন্ধত্বের সবচেয়ে বড় কারণ।কিন্তু ছানির তো এখন সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা আছে ,ফেকো করে লেন্স লাগালেই আবার দেখতে পাবেন। কিন্তু গ্লুকোমা বড় নির্দয়,জ্যোতি যেটুকু কেড়ে নেবে তার কিঞ্চিতও ফেরৎ দেবেনা। এই গ্লুকোমা কিন্তু প্রতিরোধ করা যায়। শুধুমাত্র সচেতনতা প্রয়োজন।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মর্মোপলব্ধি করেছেন বলে অন্যান্য রোগের বেলায় কেবল ‘দিবস’ আছে আর গ্লুকোমার জন্য পুরো একটা সপ্তাহ “গ্লুকোমা সচেতনতা সপ্তাহ” ঘোষণা করেছেন।সেটা হলো প্রতি বছর ১০ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ। এই সপ্তাহটা ৪০ এর বেশী বয়সী মানুষের মনের মধ্যে গেঁথে দেয়া দরকার যাতে তারা প্রতি জেলায় যেখানে গ্লুকোমা স্ক্রিনিং হচ্ছে সেখানে গিয়ে বিনা মুল্যে দৃষ্টিশক্তি, চোখের প্রেসার ও চোখের নার্ভের মাথাটার সাথে সাদা জায়গাটার( কাপ)রেসিও
মেপে নিয়ে আসেন। এই রেসিও ১০ঃ৩ স্বাভাবিক। যেমন বগুড়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ১৪ মার্চ সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত চল্লিশোর্ধ সবার সেবা দিব। কারুর গ্লুকেমা ধরা পড়লে পরবর্তী একদিন ধার্য করা হবে। নিশ্চিত হওয়ার পরীক্ষাগুলো ৫০% ছাড় দিয়ে করার পরে চিকিৎসা দেয়ার জন্য।
সারা পৃথিবীতে ৮ কোটি মানুষ এই মুহুর্তে গ্লুকোমায় ভুগছেন।আমাদের দেশেও একটা সার্ভে হয়েছে।এখনো ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায়। তবে আমরা যা দেখতে পাই তাতে ৪০ উর্দ্ধ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩%।এই মুহুর্তে দেশে গ্লুকোমার রুগি প্রায় ৩০ লাখ।তার মধ্যে ১০ লাখই চিকিৎসার বাইরে চলে গেছেন।গ্লুকোমা যখন এতই নির্মম তার ব্যাপারে
একটা সার সংক্ষেপ আলোকপাত করা যেতে পারে।
চোখের বাইরের তিনটি দেয়াল ছাড়া কোন রক্ত নালী নেই। অথচ কর্ণিয়া, লেন্স, ভিট্রাসের মত গুরুত্বপূর্ণ অংশ রযেছে। তাদের পুষ্টির জন্য রক্তের নির্যাস থেকে একটা জলীয় পদার্থ পুষ্টির সব উপাদান নিয়ে তৈরী হয়, তার নাম ‘একোয়াস হিউমার’। যে পরিমান তৈরী হচ্ছে তা কাজ শেষে বেরিয়ে যাবার রাস্তাও রয়েছে। এই পানিটা অনবরত সারকুলেট করছে একটা গ্লোবের মধ্যে যার পিছনে রয়েছে মস্তিষ্ক থেকে আসা অপটিক নার্ভ যা কিনা ১২ লক্ষ সুতার মত নার্ভ ফাইবারের একটা বন্ডিল।পানির একটা প্রেসার চোখে থাকা তাই বাঞ্চনীয়। সেটা কত? ১০ থেকে ২২ মি মি অফ মার্কারী। এই ২০/২২ প্রেসার উৎরে নার্ভ থেকে আসা রক্তনালিগুলো কিন্তু পুষ্টি দিয়ে চলেছে। এখন ধরুন প্রেসারের কারণ যে নির্যাস বা ‘একোয়াস’ তা বেরুতে বাধা পাচ্ছে, তাহলে প্রেসার বাড়বে। প্রেসার বাড়লে চারিদিকের শক্ত দেয়াল বা সামনের কর্নিয়া সামলে নিলেও বেচারী দুর্বল নার্ভটার সুতোগুলো চাপের ফলে শুকোতে থাকলো। আমাদের দৃষ্টিকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি, একটা সম্মুখ দৃষ্টি (সামনে দেখা) আর একটা পার্শ দৃষ্টি ( সামনে তাকালেও পাশে দেখতে পারা) । সামনে দেখার ম্যাকুলার নার্ভ ফাইবারগুলোর রক্ত সঞ্চালন ভালো বেশী বলে সামনের দৃষ্টিটা ধ্বংসযজ্ঞ শেষ না হওয়া অব্দি ভালো থাকে, গ্লুকোমার রুগীরা ভাবেন দেখতে পাচ্ছিইতো।কিন্তু সেটা টানেল ভিশান, শুধু সামনে দেখা।পাশ দিয়ে গরু ছাগল রিকসা ভ্যান গেলেও দেখতে পাননা।কিছুদিন পরে যখন সেটাও শেষ হয়ে যায় তখন তিনি পুরো অন্ধ এবং সবরকম চিকিৎসার বাইরে।এই চিকিৎসার বাইরে চলে যাওয়ার সংখ্যা দেশে ১০ লাখের উপরে।
একটু একটু করে অন্ধ হওয়াকে বলা হয় ‘ওপেন এ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা, (খোলা কোন)বা চোরা গ্লুকোমা। আর একটা আছে যেখানে পানি প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। রুগী হঠাৎ দেখতে পায়না। প্রথমে কোন গোল আলোর দিকে তাকালে ঝাড় বাতির মত রংধনু দেখতে পায়।তারপরে অন্ধ।ব্যাথা এত অস্বাভাবিক যে বমি করা, বিছানায় গড়াগড়ি ক'রে তবে ডাক্তারের কাছে আসা।এটা ডাকাত গ্লুকোমা।(সুক্ষ্ম কন গ্লুকোমা।) তবে এতে রুগি দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ পায়, কারন তাকে ডাক্তারের কাছে আসতে বাধ্য হতে হয়।।
জন্মগতভাবে মাতৃগর্ভে শিশুর চোখের গঠন যথেষ্ট না হলে পানি যাবার রাস্তা খোলেনা, প্রেসার বাড়ে,জন্মেই অন্ধ। এই চোখগুলো দেখতে ষাড়ের চোখর মত বড়বড়, কালো মনি ঘোলা, কারন এগুলো তখনো নরম। প্রসারের তোড়ে পানি ঢুকে যায়।১৫ থেকে ৩৫ বছরেও মুক্ত কোণ গ্লুকোমা হয়, সেটা ‘জুভেনাইল গ্লুকোমা’। লেন্সের পুরুত্ব যদি এত বড় হয় যে পানি যাবার রাস্তা ছোট বা বন্ধ করে দেয়, তাতেও গ্লুকোমা হয়। ছানি সময়মত না সরালে, আঘাত লেগে, বারবার চোখের ভিতরে ইনফ্লামেশান হলে চোখের প্রেসার বাড়ে।অনিয়ন্ত্রিত দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকলে চোখের মধ্যে রক্তক্ষরন হয়, তার ফলে পানি যাওয়ার পথ নতুন রক্তনালীতে আটকে দেয় তখন যে গ্লুকোমা হয় তা সারানো বেশ কঠিন।
গ্লুকোমা যে দৃষ্টি নেয় তা ফেরৎ আনা যায়না যা থাকে সেটুকু ধরে রাখাটাই চিকিৎসা।তাই যদি হয়, তাহলে গ্লুকোমাকে চোখের জ্যোতি নিতে দেব কেন। এটাই গ্লুকোমার সচেতনতা বাড়িয়ে চল্লিশের উপরের সব মানূস যেন বছরে একবার চোখের ডাক্তার দেখান তার সপ্তাহ পালন।প্রথমেই সচেতন হ’লে গ্লুকোমার ভালো ভালো ওষুধ আছে যা প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে আছে কিনা যেমন রুটিন করে দেখতে হয়, গ্লুকোমা ধরা পড়লেও তাই।
কোন এক পর্যায়ে যদি ওষুধে প্রেসার কন্ট্রোল হচ্ছেনা ডাক্তার মনে করেন তাহলে এর অপারেশার রয়েছে। অপারেশানের ফলাফল ভালো। প্রাথমিক পর্যায়ে লেজার অপারেশান, না হলে পরে সার্জিকাল। তবে প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে।
এখন কত প্রেসার কার জন্য স্বাভাবিক সেটা ডাক্তার বুঝতে পারবেন। যাদের চোখের নার্ভ ২০/২২ ও সহ্য করতে না পেরে ক্ষয়ে যেতে থাকে, তাকে বলা হয় ‘নরমোটেনসিভ গ্লুকোমা’। তাদের প্রেসার ৮/১০ এ নামিয়ে রাখাটিই নিয়ম।অনেকের চোখের প্রেসার ২৫/৩০ অথচ নার্ভ এত শক্ত যে ক্ষয়ে যায়না, গ্লুকোমা নেই। তাদের ভবিষ্যতে বয়স বাড়ার ফলে নার্ভ যখন দুর্বল হতে থাকবে তখন গ্লুকোমা হতে পারে। সুতরাং প্রেসার কমিয়ে রাখতে হবে।গ্লুকোমাতে পার্শ দৃস্টি আগে নস্ট হয়।ক্ষতিটা ডাক্তাররা চোখের প্রেসার,কর্ণিয়ার পুরুত্ব, নার্ভের মাথাটার সাথে মাঝের সাদার রেসিও,ফিল্ড এনালাইসস, গোনিওস্কোপ এবং ও সি সি টি (কর্ণিয়ার পুরুত্ব) পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন।রুগী কিন্তু নির্ণিত হবার আগে এসে বলেনা যে তার গ্লুকোমা হয়েছে।বড় জোর বলে আমার বংশে ওমুক গ্লুকোমায় অন্ধ।
গ্লুকোমার সঠিক কারণ নির্ণয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন।যতটুকু জানা যায় তাতে একটা বংশগত ধারা পরিলক্ষিত হয়,অর্থাত জেনেটিকাল। জন্ম ত্রুটির কারণে শিশু গ্লুকোমা হয়।আঘাত,হাই মাওপিয়া (যারা মাইনাস লেন্সে পরেন), ডায়াবেটিস, দীর্ঘদিন ধরে কোন কারনে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা, ছানি ইত্যাদিতে সেকেন্ডারী গ্লুকোমা হয়।
যেহেতু গ্লুকোমার হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি ফেরৎ পাওয়া যায়না, তাহলে হারাবার আগেই সচেতন হতে হবে।কিছু কিছু লক্ষন এরকম যে ঘনঘন চোখের পাওয়ার পাল্টে যাচ্ছে,সামনে তাকালেও পার্শ জ্যোতির কোথায়ও কালো ছায়া মনে হচ্ছে, বংশে গ্লুকোমা থাকলে, ডায়াবেটিস থাকলে , আঘাৎ লাগলে, আলোর চারিদিকে ঝাড়বাতির মত রংধনু দেখতে পেলে অবশ্যই চোখ দেখাতে হবে।
এবারে গ্লুকোমা সপ্তাহের শ্লোগান হলো “একসঙ্গে হাত ধরি, গ্লুকোমামুক্ত বিশ্ব গড়ি।”আমরা স্ক্রিনিং করছি, আপনারা শুধু সেবাটা নিয়ে আমাদের এ লক্ষে পৌঁছুতে সাহায্য করুন।
মধ্য যুগীয় কবি বড়ু চন্ডিদাসের কবিতা দিয়ে শেষ করি।তিনি শ্রী রাধার বরাত দিয়ে মৃত্যু রুপি কাককে বলছেন,
"সর্ব অঙ্গ খেয়োরে কাক (সর্ব অঙ্গ নাও হে মৃত্যু)
না রাখিও বাকি।
কৃষ্ণ (বিশ্ব) দরশন লাগি
রেখো দুটি আঁখি।"
সবাই সুস্থ ও দৃস্টিময় চোখ নিয়ে দীর্ঘজীবন ভালো থাকুন এই কামনা।
অধ্যাপক ডাঃ এন সি বাড়ই
গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ ও সার্জন।
নেত্রালয় আই কেয়ার সেন্টার
(ফায়ার সার্ভিসের সামনে)
ঠনঠনিয়া,বগুড়া।