25/09/2020
মদিনা শরিফের খুতবা
ডাক্তারিবিদ্যা ও চিকিৎসা গ্রহণের নীতিমালা
শায়খ ড. সালাহ বিন মুহাম্মদ আল-বুদাইর
মেডিকেল সায়েন্স বা চিকিৎসাবিজ্ঞান অন্যতম প্রধান উপকারী ও বিশাল প্রভাব বিস্তারকারী বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত। এতে দক্ষতা অর্জন করা উচ্চতম মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়। এখানে অতিক্রম করতে হয় দুর্গম পথ, দুরূহ সোপান ও কঠিন সিঁড়ি। মেডিকেলের ছাত্র এক্ষেত্রে একটি একটি করে ধাপ উঠতে থাকে এবং ওপরে আরোহণ করতে থাকে, একপর্যায়ে সে শীর্ষ স্তরে ও সুউচ্চ চূড়ায় পৌঁছে। নিরলস ধৈর্যশীল পরিশ্রমী ছাড়া তা কেউ অর্জন করতে পারে না। অবিচ্ছিন্নভাবে অবিরাম গতিতে ধারাবাহিক অধ্যবসায়ী ব্যক্তিই শুধু তা লাভ করতে পারে। ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন, ‘বিদ্যা দুই ধরনের, ধর্মবিষয়ক ব্যুৎপত্তিগত বিদ্যা ও শরীরবিষয়ক চিকিৎসাবিদ্যা।’ রবি (রহ.) বলেন, আমি শাফেঈ (রা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘হালাল-হারামের পরে চিকিৎসার চেয়ে বেশি অভিজাত বিদ্যার কথা আমার জানা নেই।’ বলা হয়ে থাকে, ‘ওই শহরে বাস করো না, যেখানে এরকম শাসক নেই, যে তোমাকে নিরাপত্তা দেবে, পানি নেই তা তোমার তৃষ্ণা মেটাবে, আলেম নেই, যে তোমাকে ফতোয়া প্রদান করবে এবং এমন ডাক্তার নেই, যে তোমার চিকিৎসা করবে।’
ইসলাম চিকিৎসার প্রতি চূড়ান্ত গুরুত্বারোপ করেছে। সহিহ বোখারির চিকিৎসা অধ্যায়, সহিহ মুসলিমের চিকিৎসা, রোগ-ব্যাধি ও রুকায়্যা অধ্যায়, সুনানে আবু দাউদের চিকিৎসা অধ্যায়, সুনানে তিরমিজিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর চিকিৎসা অধ্যায়, নাসাঈ (রা.) এর সুনানে কুবরার চিকিৎসা অধ্যায় ও সুনানে ইবনে মাজাহর চিকিৎসা অধ্যায় খুলে দেখুন।
বর্ণিত আছে, চিকিৎসক ইবনে মাসওয়াই যখন নবী করিম (সা.) এর এ হাদিসটি পাঠ করেন, ‘মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্রকে ভরপুর করেনি। আদম সন্তানের জন্য এ পরিমাণ খাবার যথেষ্ট, যা তার মেরুদ-কে ঠিক রাখে। যদি খেতেই হয় তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ তার খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ তার পানীয়ের জন্য আর এক-তৃতীয়াংশ তার নিঃশ্বাসের জন্য।’ তখন তিনি বলেন, ‘মানুষ যদি এ কথাগুলো কাজে লাগাত তাহলে তারা বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাপদ থাকত। হাসপাতালগুলো ও ফার্মেসিগুলো বন্ধ হয়ে যেত।’ আরবরা বলে, ‘দিনের সবচেয়ে উত্তম খাবার হলো তার প্রথমভাগের খাবার আর রাতের সবচেয়ে উত্তম খাবার হলো যা আলো থাকতে থাকতে খাওয়া হয়।’
অভিজ্ঞ দক্ষ নিপুণ ডাক্তার সূক্ষ্ম ওষুধের সন্ধান জানে। চোখের দুর্বল দৃষ্টির পর্দা বা ছানি সরাতে পারে। আল্লাহ ডাক্তারের অস্ত্রোপচারের ছুরিকে রহমত, তার জখমকে মুক্তি, তার ব্যান্ডেজকে উপহার, তার ট্যাবলেটকে আরোগ্যে পরিণত করে দিন।
আরবরা এমন চিকিৎসককে হাকিম ও মমতাবান বলে আখ্যায়িত করত। কেননা সে রোগীর প্রতি কোমল আচরণ করে, তার প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, তাকে অভয় দেয়।
একমাত্র আল্লাহই রোগীকে আরোগ্য দান করেন, তাকে সুস্থতা দেন। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া সব ডাক্তার মিলেও আরোগ্য সাধন করতে সক্ষম হবে না। কেননা, একমাত্র তিনিই আরোগ্যদাতা, তিনি রোগে আক্রান্ত করেন, ওষুধ দিয়ে সাহায্য করেন এবং আরোগ্য দিয়ে দয়া করেন। ‘ডাক্তার আমাকে আমার চোখের আরোগ্যের আশা দেন। আল্লাহ ছাড়া এর কোনো চিকিৎসক আছে?’
আরোগ্য অন্যতম মৌলিক নেয়ামত, রোগী যেহেতু সেটা আল্লাহর পক্ষ হতেই লাভ করে, ডাক্তারের কাছে নয়, তাই ইবরাহিম (আ.) বলেন, ‘আর আমি যখন অসুস্থ হই তিনি আমাকে আরোগ্য দান করেন।’ (সুরা শুআরা : ৮০)। সুহাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, সেই বালকের গল্প নিয়ে, যে অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করে তুলত এবং আল্লাহর হুকুমে যাবতীয় রোগের চিকিৎসা করত। বাদশাহর একজন সহচর এ কথা শুনতে পেল, সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে বালকটির কাছে অনেক উপহারসামগ্রী নিয়ে এসে বলল, তুমি আমাকে আরোগ্য দিতে পারলে এখানে যা আছে সব তোমার জন্য। তখন বালক বলল, ‘আমি কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। শুধু আল্লাহই আরোগ্য দেন। আপনি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন, তবে আমি আল্লাহর কাছে আরোগ্যের প্রার্থনা করব, তিনি আপনাকে আরোগ্য দান করবেন।’ লোকটা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহ তাকে আরোগ্য দিলেন, তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। (মুসলিম)।
ডাক্তার ও নার্সদের এত অবদান, যার পুরোপুরি বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া এখানে সম্ভব নয়। তাই আপনারা ডাক্তারদের মর্যাদা ও নার্সদের সম্মান রক্ষা করুন। তাদের প্রচেষ্টা ও ত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। তারা সবাই মিলে নির্বিকার চিত্তে মানুষকে মৃত্যুর তীব্রতা ও করোনা মহামারির যন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা দিতে একটি নিরাপদ দুর্গ ও সুউচ্চ চূড়া হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। ‘আপনারা নিজেদের সন্তানদের রেখে রোগীদের প্রাধান্য দিয়েছেন, আপনাদের থেকে ভালোবাসা ও পরার্থপরতা চেনা যায়।’
চিকিৎসা গ্রহণ করা মুস্তাহাব। চিকিৎসা না করলে তা যদি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় তখন চিকিৎসা করা ওয়াজিব বা আবশ্যক হয়ে যায়। উসামা ইবনে শারিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর, কেননা আল্লাহ যত রোগ দিয়েছেন তার সবগুলোর জন্য আরোগ্যের ব্যবস্থা করেছেন, তবে মৃত্যু ও বার্ধক্য ছাড়া।’ (আহমাদ ও ইবনে হিব্বান)। সুতরাং যখন চূড়ান্ত ফয়সালা চলে আসে আর নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়, তখন সব মেডিসিন ব্যর্থ হয় এবং সব ব্যবস্থা নস্যাৎ হয়ে যায়।
ডাক্তারের উচিত রোগীকে উৎসাহিত করা, সুস্থতার আশ্বাস দেওয়া, তার সঙ্গে কোমল স্বরে কথা বলা। তার বেদনা লাঘব করা। তার ব্যথা দূর করা। তার ভয়, আতঙ্ক, শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা তাড়ানো। বলা হয়, ‘চিকিৎসকের কোমল আচরণ অর্ধেক ওষুধ।’ রোগীর সামনে মুচকি হাসি দিলে তার ব্যথা লাঘব হয়। তার মনে তা আনন্দ দেয়। কঠিন হৃদয়ের কর্কশ নির্মম আচরণকারী ডাক্তার রোগীর কাছে আঘাতকারী ঝড়ের মতো, তা তার সামনের সব উৎপাটন করে, তার মনের আশা ধ্বংস করে দেয়। যে রোগীকে কোনো ভূমিকা ও প্রস্তুতি ছাড়াই ভয়ানক ব্যাধির কথা বলে আতঙ্কিত করে দেয়, সে রোগ আরও জটিল করে তোলে, ব্যাধি আরও বৃদ্ধি করে দেয়।
ডাক্তারের কর্তব্য হলো ধৈর্যশীল হওয়া, রোগীর অধিকার লক্ষ্য রাখা। আক্রান্ত রোগীর প্রতি সদয় হওয়া। হে চিকিৎসক সম্প্রদায়, আপনারা রোগীদের হাত ধরে তাদের ব্যথার অসুবিধা ও সংকীর্ণতা থেকে আশার প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যান। ডাক্তার রোগীকে তার নিজের জীবনের জায়গায় বিবেচনা করবে। তার ইজ্জত রক্ষা করবে, তার গোপনীয়তা বজায় রাখবে। তার দোষ আড়াল করবে। তার দুর্বলতা প্রচার করবে না, যা ফাঁস হলে রোগীর ক্ষতি হয়। রোগীর সতর উন্মোচন করবে না, তবে চিকিৎসার প্রয়োজনে করতে পারবে। রোগ নির্ণয় ও প্রেসক্রিপশন তৈরি করতে ডাক্তারের খুব চিন্তাভাবনা করে, গবেষণা করে ও যাচাই করে কাজ করতে হবে। সন্দেহ লাগলে পরামর্শ করবে। জলদি করবে না। যা ভালো করে পারবে না তা করতে যাবে না। অজ্ঞ লোকের দ্বারা চিকিৎসা করানো বৈধ নয়, তার কোনো জ্ঞান নেই, চর্চা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নেই। অজ্ঞ মূর্খ কেউ ডাক্তারি করতে গেলে সে মানুষকে ধোঁকা দিল। মানুষের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিল। আমর ইবনে শুয়াইব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে লোক ডাক্তারি করে অথচ তার ডাক্তারিবিদ্যা বিষয়ে কিছুই জানা যায় না, তার সব দায়ভার নিতে হবে।’ (আবু দাউদ ও নাসাঈ)।
বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় টেস্ট, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চেকআপের নাম করে রোগীদের স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগানো হারাম। বাণিজ্য ও রোগীদের টাকা মেরে খাওয়া ছাড়া যেগুলো করানোর আর কোনো উদ্দেশ্য ও কারণ নেই। রোগীদের যন্ত্রণা ও কষ্টকে পুঁজি করেই যে প্রাচুর্য গড়ে ওঠে তা কতই না জঘন্যতম প্রাচুর্য!
কোনো কোনো চিকিৎসক ও ফার্মেসির লোক রোগীদের জন্য অনেক উচ্চমূল্যের ওষুধ প্রদান করে, অথচ সে ওষুধের উপযুক্ত ক্রিয়াশীল অল্প মূল্যের বিকল্প আছে। তারা এটা করে ওষুধ কোম্পানির প্রচারণা ও নিজেরা কমিশন পাওয়ার উদ্দেশ্যে। রোগীর স্বার্থ না দেখে নিজের স্বার্থ দেখে। যাদের মনে দয়ামায়া বলতে কিছু নেই তারাই এটা করে থাকে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খুব কমই এমন হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সামনে বক্তব্য দিয়েছেন আর এ কথাটি বলেননি, ‘যার আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই। যার অঙ্গীকার পালন নেই তার দ্বীন নেই।’ (বায়হাকি)।
আপনারা ভ- ডাক্তারির বিষয়ে সতর্ক থাকুন, যারা বাটপারি করে ভেজাল ও বিকৃত ক্লিনিক খুলে বসে আছেন। অনুমোদন ছাড়া রোগী দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। তারা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকি ও হুমকির মুখে ফেলে দেন। আল্লাহ কোরআন দ্বারা জ্যোতিষী ও গণকদের মিত্রদের কর্মকা-কে বাতিল করে দিয়েছেন। তাই আপনারা গণক, জ্যোতিষী, মিথ্যুক, ভ- কবিরাজ ও ভিত্তিহীন ভবিষ্যদ্বাণী করে, যারা চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে ও মানুষকে ঠকায়, ব্ল্যাক ম্যাজিক করে, শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে ঝাড়ফুঁক দেয়, কুফরি করে তাবিজ-কবচ বিক্রি করে, তাদের থেকে সতর্ক ও সাবধান থাকুন।
১ সফর ১৪৪২ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন
মাহমুদুল হাসান জুনাইদ
সৌজন্যে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ