02/01/2026
আজ গ্রামের একজন পড়ালেখা না জানা ব্যক্তিও যে ডায়াবেটিস শব্দ টা জানেন, রোগটার নাম জানেন তার সম্পূর্ণ সফলতা ডা মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্যারের। লাখ লাখ মানুষের সুস্থ নিরাপদ জীবনের উসিলা হয়ে গেলেন তিনি।
কিংবদন্তি চিকিৎসক ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ১৩ জন রোগী দিয়ে শুরু, এখন সে সংখ্যা ৪০ লাখের ও বেশী।
বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর মতো অবদান আর কেউ রাখেননি। নিজের গোটা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন একটি দেশের মানুষ চিকিৎসা সেবা পাবে বলে। তিনি স্বপ্ন দেখে গেছেন, কাজ করে গেছেন নিরন্তর। মৃত্যুর আগে শেষ নিঃশ্বাস
অব্দি।
জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বাবা ছিলেন স্বল্প বেতনের এক ডাকঘরের পোস্টমাস্টার। বাড়ি থেকে তাঁদের নিকটতম স্কুলের দূরত্ব ও ছিল ৬ মাইল দূরে।
প্রতিদিন সেই স্কুলে হেঁটে যাতায়াত করতেন তিনি। সাংসারিক আর্থিক অভাব অনটনে বহু কষ্টে একটি বৃত্তি জোগাড় করে ফেলেছিলেন। কারণ সেকালে মুসলিম ছাত্রদের জন্য বৃত্তি পাওয়াও ছিল ভীষণ কঠিন।
১৯৩৮ এ কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিলেন তিনি। দেশভাগের সময় তিনি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন কলকাতা মেডিকেলে । দেশভাগের পর নিজের ভিটেমাটি ত্যাগ করে চলে এলেন ঢাকায়। তখন তাঁকে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন করা হয়।
এর দু বছর পর পূর্ণকালীন বৃত্তি নিয়ে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জনের জন্য পাড়ি জমান বিশ্বখ্যাত রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানে। সেখানে ডিগ্রি সম্পন্ন করে এফসিসিপি ডিগ্রির জন্য যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
তাঁর মেধা ও দক্ষতা দেখে তাঁকে রাখার জন্য মার্কিন সরকার বেতন ও প্রনোদনা হিসেবে মোটা অংকের অর্থ দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু নিজের বাংলাকে ভুলতে চাননি তিনি।
দেশে ফিরে এসে ডাঃ ইব্রাহিম ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফিজিশিয়ান হিসেবে যোগ দিলেন। অথচ ঢাকা মেডিকেলের তখনো ভঙ্গুর দশা। মাত্র ৫ বছর হয়েছে মেডিকেল হয়েছে।
ডাঃ ইব্রাহিমের প্রজ্ঞা ও মেধা কতোটা ছিলো তা অবর্ণনীয়। বাঙালি হয়েও সর্বোচ্চ যোগ্যতায় ভর করে চিকিৎসা গবেষণা কাউন্সিল, পাকিস্তানের বিজ্ঞান গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন অধ্যাপক ডাঃ ইব্রাহিম।
.
ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও সমাজসেবীদের সহযোগিতায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন 'পাকিস্তান ডায়াবেটিক সমিতি'।
পঞ্চাশের দশকেই ডাঃ ইব্রাহিম বুঝতে পেরেছিলেন, কিছুদিন পরই সময়ে ডায়াবেটিস হতে যাচ্ছে এদেশের মানুষের অন্যতম বড় শত্রু। দূরদর্শী মানুষটি তাই সত্তরের দশকেই প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস (বারডেম)।
কালের বিবর্তনে সেই বারডেমই আজ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশী রোগী এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন।
অথচ এই বিশাল বারডেম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ভীষণ স্বল্প পরিসরে। কারণ অর্থ এবং স্থান সংকট দুটোই ছিল। ১৯৫৭ সালে সেগুন বাগিচায় মাত্র ৩৮০ স্কয়ার ফুটের একটি টিনের ঘরে ২৩ জন ডায়াবেটিক রোগী নিয়ে বহির্বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডাঃ ইব্রাহিম।
ওখানে কেবল বহির্বিভাগ থাকার কারণ ছিলো ওখানে কোন রোগীর ভর্তির ব্যবস্থা ছিলোনা। জটিল রোগীদের হাসপাতালেই পাঠাতে হতো। ১৩ বছর পরে ১৯৭০ সালে কয়েকটি বিছানা এখানে যুক্ত করে কিছু রোগী রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন ডাঃ ইব্রাহিম। রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের জন্য এক টাকাও ফি নিতেন না ডাঃ ইব্রাহিম ডাঃ ইব্রাহিম চেয়েছিলেন কোন ডায়াবেটিক রোগী যেন বিনা চিকিৎসায় না মারা যায়।
দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৮০ সালে শাহবাগে নতুন আঙ্গিকে স্থাপিত হলো বারডেম। সেগুন বাগিচার হাসপাতাল এখানে সরিয়ে আনা হল। গোটা এশিয়া মহাদেশের এটিই ছিলো সর্বপ্রথম ডায়াবেটিসের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল।
শুধু হাসপাতালই না বারডেম, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য লোকবল তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বারডেম একাডেমি। ওখানে এখন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন ও মেটাবলিজম বিষয়ে এমফিল, এমডি ও পিএইচডি সহ ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি কোর্স পরিচালনা করা হয়।
আজকের বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক কিংবা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, সব ডায়াবেটিস হাসপাতালগুলো আজ জানান দেয় কতো বিস্মৃত পরিসরে চিকিৎসা সেবার দ্বার উন্মোচন করেছেন তিনি। ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল বারডেম জেনারেল হাসপাতাল।
রোগীদের আর্থিক অবস্থাভেদে ওষুধ ও চিকিৎসায় ২৫ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্তও ছাড় দেয়া হয়। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ও খাবারের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করে বারডেম কর্তৃপক্ষ। বারডেমে এখন মোট ৬০টির ও বেশী বিভাগে ছয়শোর বেশী চিকিৎসক, সাতশোর বেশী নার্স ও আড়াই হাজারেরও বেশি কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন।
যে ডায়াবেটিক সমিতি শুরুতে মাত্র ১৩ জন নিবন্ধিত রোগী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো সেই ডায়াবেটিক সমিতির বর্তমানে কার্ডধারী সেবাগ্রহীতার সংখ্যাই প্রায় ৪০ লাখ।
মানুষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার এক মহারথী ছিলেন অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম। যার ত্যাগ আর তিতিক্ষার সুফল যুগ যুগ ধরে ভোগ করছে এদেশের সাধারণ মানুষ। যে অসামান্য লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবাদপ্রতিম কিংবদন্তী অধ্যাপক ডাঃ ইব্রাহিম যাত্রা শুরু করেছিলেন সেই সৃষ্টিই রাখবে তাঁকে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়।
আজ কিংবদন্তি জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিমের ১১৪ তম জন্ম বার্ষিকী। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এই প্রবাদপ্রতিম কিংবদন্তি চিকিৎসকের প্রতি। 🙏 💕
সংগৃহীত।