27/11/2025
এক আল্লাহ—কিন্তু সৃষ্টি বহু স্তরে: “প্রথম সৃষ্টি” নিয়ে ভুল ধারণার বৈজ্ঞানিক-ইসলামী ব্যাখ্যা
ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনায় আমরা দেখি—কোথাও বলা হয়েছে আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি কলম (Qalam), কোথাও আরশ, কোথাও নূর, আবার কোথাও রূহ।
এতে অনেকেই বিভ্রান্ত হয় এবং জিজ্ঞেস করে—
“এত সব প্রথম সৃষ্টি—আল্লাহর কি একাধিক মুখ?” (নাউযুবিল্লাহ)
এমন প্রশ্ন মূলত জ্ঞান-ঘাটতি, সৃষ্টির স্তর বুঝতে না পারা, এবং ইসলামী তথ্যের গভীর লজিক না জানার ফল।
এই প্রবন্ধটির লক্ষ্য হলো—বিজ্ঞান, যুক্তি, ও ইসলামিক তত্ত্ব একত্রে ব্যবহার করে এই বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা।
১. আল্লাহ: সত্তা এক, বাণী এক, ইচ্ছা এক
আল্লাহর:
• মুখ এক
• আদেশ এক
• ইচ্ছা এক
• সত্তা এক
কিন্তু সৃষ্টি এক স্তরের নয়—বরং বহু স্তর (multi-layered creation) সমন্বয়ে গঠিত।
এক সত্তা থেকে বহু সৃষ্টি—এটা বিরোধ নয়, বরং সৃষ্টির পরিধি ও গভীরতার প্রমাণ।
২. “প্রথম সৃষ্টি” ভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে, একটাই প্রসঙ্গে নয়
ইসলাম বিভিন্ন ক্ষেত্র (domain) বা সৃষ্টির স্তর (layers of creation) ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছে:
• কলম (Qalam)
• আরশ (Arsh)
• নূর (Light)
• রূহ (Spirit)
কিন্তু এগুলো এক ক্যাটাগরির সৃষ্টি নয়।
যে প্রসঙ্গ বা যে সৃষ্টির সিস্টেমের কথা বলা হয়েছে—তার নিজস্ব “প্রথম সৃষ্টি” উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. ইসলাম অনুযায়ী — সৃষ্টি ধাপে ধাপে unfold হয়েছে
সৃষ্টির ধাপগুলো আলাদা আলাদা সিস্টেমের ভিত্তিতে:
(১) তাকদীর ও জ্ঞান সিস্টেম
➡️ প্রথম সৃষ্টি: কলম
কারণ তাকদীর এখান থেকেই লিখা হয়েছে যা কিছু ঘটবে।
(২) শাসন ও মহাজাগতিক কর্তৃত্ব সিস্টেম
➡️ প্রথম সৃষ্টি: আরশ
যেখানে আল্লাহর জুলুস, কুদরতের কেন্দ্র, এবং Divine Order প্রতিষ্ঠিত হয়।
(৩) এনার্জি ও আলো-ব্যবস্থা (Cosmic Light System)
➡️ প্রথম সৃষ্টি: নূর
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রাথমিক শক্তি উৎস।
(৪) জীবন ও চেতনা সিস্টেম
➡️ প্রথম সৃষ্টি: রূহ
মানব এবং জীব সৃষ্টির মূল বীজ।
➤ প্রতিটি সিস্টেমের নিজস্ব “first origin” রয়েছে।
এ কারণে আল্লাহ প্রতিটি সিস্টেমের “প্রথম” পৃথকভাবে বর্ণনা করেছেন—বিরোধ নয়, বরং স্তরভিত্তিক ব্যাখ্যা।
৪. কেন আলাদা আলাদা প্রথম সৃষ্টি থাকা যৌক্তিক?
এটা বোঝার জন্য একটি সহজ বৈজ্ঞানিক উদাহরণ:
বাড়ি নির্মাণের উদাহরণ
একজন ইঞ্জিনিয়ার বলবেন:
• ডিজাইনের দৃষ্টিতে প্রথম কাজ হলো পরিকল্পনা।
• কনস্ট্রাকশনের দৃষ্টিতে প্রথম হলো ফাউন্ডেশন।
• মেস্ত্রির দৃষ্টিতে প্রথম হলো ইট বসানো।
• ডেভেলপারের দৃষ্টিতে প্রথম হলো জমি কেনা।
এগুলো বিরোধ নয়।
বরং প্রতিটি ক্ষেত্রের ভিত্তি আলাদা।
ঠিক তেমনই—
তাকদীরে প্রথম = কলম
শাসনে প্রথম = আরশ
এনার্জিতে প্রথম = নূর
জীবনে প্রথম = রূহ
এটাই বাস্তব, গভীর, যৌক্তিক।
৫. একজন মানুষের একাধিক পরিচয় থাকে — অথচ সে এক সত্তা
অতি সহজ উদাহরণ:
একজন মানুষ—
• বাবার কাছে: ছেলে
• মায়ের কাছে: সন্তান
• রোগীর কাছে: চিকিৎসক
• ছাত্রের কাছে: শিক্ষক
• সমাজে: মানব
একই ব্যক্তি — কিন্তু পরিচয় ভিন্ন ভিন্ন সিস্টেম অনুযায়ী ভিন্ন।
তাই কেউ যদি বলে—
“একই মানুষ এত রকম পরিচয় বলছে—তাহলে তার কি বহু মুখ?”
এটা হাস্যকর ব্যাখ্যা।
৬. একই যুক্তি আল্লাহর ক্ষেত্রে — আরও শ্রেষ্ঠতর মাত্রায় প্রযোজ্য
কারণ:
• আল্লাহর সৃষ্টি সীমাহীন
• সৃষ্টির স্তর অসংখ্য
• প্রতিটি স্তরের প্রথম সৃষ্টি আলাদা
তাই আল্লাহ যখন ভিন্ন ভিন্ন first origin বর্ণনা করেন—
এটা জ্ঞানের বৈচিত্র্য
সৃষ্টির গভীরতার ইঙ্গিত
এবং বহুমাত্রিক সিস্টেমের ব্যাখ্যা।
৭. “আল্লাহর কি অনেক মুখ?” — এই প্রশ্নের কঠিন, যুক্তিনির্ভর উত্তর
**“না। আল্লাহর মুখ এক, বাণী এক।
কিন্তু সৃষ্টি বহু স্তরে, বহু ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে।
প্রতিটি ব্যবস্থার পৃথক প্রথম সৃষ্টি আছে—
আল্লাহ সেই সিস্টেমগুলোর ‘first’ আলাদা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।”**
৮. বিষয়টি ভুল বোঝা মানুষের ভুল—Religion বা Revelation-এর নয়
এখানে কোনো বিরোধ নেই।
সমস্যা শুধু:
• সৃষ্টির স্তর সম্পর্কে অজ্ঞতা
• প্রসঙ্গ না বুঝে বক্তব্য নেওয়া
• কোরআন-হাদীসের গভীরতা না জানা
আল্লাহর বাণী বিরোধী নয়—
মানুষের বোঝার সীমা সংকীর্ণ।
উপসংহার
সর্বশেষ সিদ্ধান্ত:
• আল্লাহ এক
• তাঁর মুখ, বাণী, ইচ্ছা—সব এক
• সৃষ্টির ব্যবস্থা বহু ও গভীর
• প্রতিটি ব্যবস্থার প্রথম সৃষ্টি আলাদা
• তাই ভিন্ন ভিন্ন first creation = ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ
• কোনো বিরোধ নেই—বরং মহাবিশ্বের বিস্ময়কর কাঠামোর ব্যাখ্যা