19/05/2026
"আমি জানি সে আমার জন্য ক্ষতিকর, তাও কেন তাকেই আমার এত মনে পড়ে?"
"এত কিছুর পরও কেন আমি তাকেই মিস করি?"
কোনো খারাপ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পর এই প্রশ্নটি অনেককেই প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। বাইরে থেকে মানুষ খুব সহজেই বলে ফেলে, "যে তোমাকে এত কষ্ট দিচ্ছে, তাকে ছেড়ে চলে আসছ না কেন?" অনেকে ভাবেন, ভুক্তভোগী হয়তো আর্থিকভাবে নির্ভরশীল, বা কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, অথবা সে খুব দুর্বল।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এমন নয়। অনেক সময় মানুষ কোনো বাহ্যিক বাধা ছাড়াই মানসিকভাবে একটা অদৃশ্য শিকলে বন্দি হয়ে পড়ে। একেই ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে 'ওয়েপনাইজড অ্যাটাচমেন্ট' (Weaponised Attachment) বা 'অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত আবেগীয় টান'।
💔মোহনার গল্প:
মোহনা কোনো দুর্বল বা পরনির্ভরশীল নারী ছিলেন না। তার চাকরি ছিল, নিজস্ব উপার্জন ছিল, বন্ধু-বান্ধব এবং একটি সুন্দর সামাজিক জীবনও ছিল। বাইরে থেকে তাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তিনি কোনো মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
শুরুতে তার সঙ্গী তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশেষ মানুষ হিসেবে অনুভব করিয়েছিল। মোহনা প্রতিটি ছোটখাটো পছন্দ-অপছন্দের খেয়াল রাখত সে। নিজের অতীতের কষ্ট, একাকীত্ব ও আবেগের দুর্বলতাগুলো লিসার সামনে প্রকাশ করে সে বলেছিল, "তোমার আগে আমি কাউকেই এত বিশ্বাস করতে পারিনি।"
মোহনার মনে তার জন্য গভীর মায়া এবং এক ধরণের দায়িত্ববোধ তৈরি হলো। সঙ্গী যখনই হঠাৎ রেগে যেত, কথা বলা বন্ধ করে দিত বা খারাপ ব্যবহার করত, মোহনা ভাবতেন— "ও আসলে ভেতরে ভেতরে খুব কষ্টে আছে, তাই এমন করছে।"
🔄 'দ্য সুইচ' (The Switch) বা আচরণের ওঠানামা
ধীরে ধীরে সম্পর্কের রূপ বদলাতে শুরু করল। কিছু দিন সে চমৎকার, রোমান্টিক এবং মোহনার প্রতি ভীষণ অনুগত থাকত। আবার কিছু দিন সে চরম নিষ্ঠুর আচরণ করত, অবহেলা করত এবং মোহনাকে খাটো করে কথা বলত।
ঠিক যখনই মোহনা মানসিকভাবে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন, তখনই সে আবার সেই আগের নরম ও অনুতপ্ত মানুষটি হয়ে ফিরে আসত। বলত, "আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমি বুঝতে পারি না কেন এমন করি। তুমি ছাড়া আমাকে বোঝার আর কেউ নেই।"
মোহনা থেকে গেলেন। কোনো বোকামির কারণে নয়, বরং তার স্নায়ুতন্ত্র (Nervous System) ততদিনে এই চক্রে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গীর একটুখানি ভালোবাসা হয়ে উঠেছিল তার মানসিক অশান্তির একমাত্র ওষুধ। ক্ষতিকর আচরণ করার পর সঙ্গী যখন আবার অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসত, লিসার মস্তিষ্ক তখন স্বস্তি অনুভব করত। একেই বলে ইন্টারমিটেন্ট রিইনফোর্সমেন্ট (Intermittent Reinforcement) বা 'আচরণের ওঠানামা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ'।
🕸️ আসক্তির মতো এক ফাঁদ
একটা সময় লিসা যখন বুঝতে পারলেন তিনি মানসিক নির্যাতনের শিকার, তখন সম্পর্ক থেকে বের হওয়াটাকে তার কাছে স্বাধীনতা মনে হয়নি, বরং মনে হয়েছিল তীব্র কোনো আসক্তি থেকে জোর করে দূরে থাকা (Withdrawal)। তার বুদ্ধি বলছিল এই মানুষটি বিপজ্জনক, কিন্তু তার শরীর ও মন তীব্রভাবে তাকেই চাচ্ছিল।
অপরাধী যখন ভালোবাসা দেয়, আবার কেড়ে নেয়, এবং পুনরায় সেটাকে ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে ফিরিয়ে দেয়— তখন ভুক্তভোগী সেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজের সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিতেও দ্বিধাবোধ করে না।
❌ ভুল ধারণা বনাম আসল সত্য
আমাদের সমাজ প্রায়ই ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে (Victim Blaming)। বলা হয়, তারা হয়তো 'সহ-নির্ভরশীল' (Codependent) বা তারা নিজেই কষ্ট পেতে পছন্দ করে। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই আবেগীয় টান ভুক্তভোগীর কোনো জন্মগত দুর্বলতা নয়; বরং অপরাধী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে, সুনিপুণ ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে এই টানটি তৈরি করে।
যেহেতু আমরা 'আবেগ ও টান'-কে ভালোবাসা বা রোমান্সের প্রতীক মনে করি, তাই এই ধরণের মানসিক নির্যাতনকে চট করে চেনা যায় না। কেউ তার অত্যাচারী সঙ্গীর জন্য কাঁদলে সমাজ ধরে নেয়, "তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই গভীর প্রেম আছে।" ফলে এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
💡 মনে রাখবেন:
ক্ষতিকর সঙ্গীকে মিস করার মানে এই নয় যে আপনি তার অন্যায়গুলোকে মেনে নিচ্ছেন।
কোনো অত্যাচারী মানুষ কেবল ভয় দেখিয়েই নিয়ন্ত্রণ করে না, অনেক সময় মায়া, দুর্বলতা এবং কান্নাকাটি করেও নিয়ন্ত্রণ (Coercive Control) করতে পারে।
এই চক্র থেকে বের হতে সময় লাগে। নিজের মনকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুন। আপনি কোনো ভুল করেননি, আপনি কেবল একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদের শিকার হয়েছিলেন।
💬 আপনার কি মনে হয়? আমাদের সমাজে এই ধরণের মানসিক নিয়ন্ত্রণকে কি আসলেই 'গভীর ভালোবাসা' বলে ভুল করা হয়? কমেন্টে আপনার মতামত জানান।