04/05/2026
রুকইয়াহর লেবাসে নব্য ফিতনা: সাইনবোর্ডধারী জাদুকর ও হাতুড়ে রাক্বীদের স্বরূপ উন্মোচন!
রুকইয়াহর মাধ্যমে রোগীর শারীরিক, মানসিক ও প্যারানরমাল (Paranormal) সমস্যার চিকিৎসা করা—একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নববী সুন্নাহ। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকইয়াহ করেছেন, করিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে এর তালিম দিয়েছেন। সহিহ বুখারিতে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হলে নিজেই সুরা ফালাক, সুরা নাস ও সুরা ইখলাস পড়ে শরীরে ফুঁ দিতেন এবং হাত বুলিয়ে দিতেন। কিন্তু আজ এই পবিত্র সুন্নাহকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে এক ভয়াবহ ফিতনা ঘনীভূত হয়েছে—যা উম্মাহর ঈমান ও আমলের জন্য রীতিমতো অশনিসংকেত।
একসময় যারা প্রকাশ্যে ভণ্ডামি, কবিরাজি এবং জাদুটোনার মাধ্যমে মানুষের ঈমান হরণ করত, তারা আজ খোলস পাল্টে এসেছে নতুন রূপে। অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, পুরোনো সেই জাদুকর, ভণ্ড মুদাব্বির এবং 'জিন হুজুর'রা এখন নিজেদের নামের আগে 'রাক্বী' বা 'বিশিষ্ট রাক্বী ও মুদাব্বির' শব্দগুলো বসিয়ে সাধারণ মুসলমানদের ধোঁকা দিচ্ছে। এই নব্য ফিতনার স্বরূপ উন্মোচন করা এবং উম্মাহকে সতর্ক করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথম ফিতনা: পুরোনো জাদুকরদের নতুন লেবাস
একসময় এই ভণ্ডরা মানুষের নাম ও মায়ের নাম নিয়ে 'হাজিরা' দেখত—অর্থাৎ জিনকে আহ্বান করে গায়েবের খবর জিজ্ঞাসা করত। জিনের সাহায্য নিয়ে 'জাদু দিয়ে জাদু কাটার' (নুশরাহ) মতো কুফরি কাজ করত। কথিত ইস্তিখারার নামে পেশেন্ট ও তার মায়ের নাম নিয়ে গায়েবের খবর দেওয়া, পেশেন্টের রোগ ও সমস্যা নির্ণয় করার শয়তানি ধোঁকাবাজি করত। এখানে স্পষ্ট করে রাখা ভালো—ইস্তিখারা স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো একটি পবিত্র সালাত যা প্রত্যেক মুসলমান নিজের দোদুল্যমান বিষয়ের ক্ষেত্রে যেখানে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না তা সমাধানের জন্য আদায় করে। সমস্যা হলো ভণ্ডদের সেই 'অন্যের পক্ষে ইস্তিখারা করে গায়েবের খবর জানিয়ে দেওয়া, রোগ নির্ণয় করার' মিথ্যা দাবি, যা পুরোপুরি বাতিল।
শরিয়তের অকাট্য বিধান অনুযায়ী, গায়েবের খবর জানার জন্য নাম বা মায়ের নাম জিজ্ঞেস করা কিংবা জিনের সাহায্য নেওয়া স্পষ্ট শিরক। আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার ঘোষণা করেছেন—
> ﴿قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ﴾
> "বলুন, আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।" (সুরা নামল: ৬৫)
জিনের আশ্রয়গ্রহণ সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন—
> ﴿وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا﴾
> "মানুষের মধ্যে কিছু পুরুষ জিনদের কিছু পুরুষের আশ্রয় নিত, ফলে তারা তাদের অহংকার ও পথভ্রষ্টতা বাড়িয়ে দিত।" (সুরা জিন: ৬)
জাদু সম্পর্কে সুরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—জাদু শেখানো ও শেখা উভয়ই কুফর। আর তাবিজ-কবচ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি তাবিজ ঝোলায় সে শিরক করল।" (মুসনাদে আহমাদ)
যখন সাধারণ মানুষ কুরআন ও সুন্নাহর আলো পেয়ে এই শিরকি কবিরাজি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করল, তখন এই ভণ্ডরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য নতুন এক চক্রান্তের আশ্রয় নিল। তারা বুঝে গেল, মানুষ এখন রুকইয়াহর দিকে ঝুঁকছে। আর ঠিক তখনই এরা নিজেদের আকিদা ও আমলে কোনো পরিবর্তন না এনে শুধু সাইনবোর্ড পাল্টে নিজেদের 'রাক্বী' হিসেবে দাবি করতে লেগে গেল। অথচ এদের অনেকেই এখনো পর্দার আড়ালে সেই পুরোনো তাবিজের কিতাব, জাদুর বই এবং তথাকথিত 'সোলেমানি আংটি'র (যা তারা দাবি করে সুলাইমান আলাইহিস সালামের আংটির অনুকরণে তৈরি এবং এতে নাকি অলৌকিক ক্ষমতা আছে—আগাগোড়া মিথ্যা ও শিরকি বিশ্বাস) মতো শিরকি বস্তুর রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় ফিতনা: ফোনের মাধ্যমে গুরু-নির্ভর প্রতারণার নয়া কৌশল
এই ভণ্ডদের প্রতারণা এখন এমন এক চরম ও জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছেছে যা শুনলে যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ শিউরে উঠবে। এই কবিরাজ, মুদাব্বির ও জাদুকররা এখন বিভিন্ন জায়গায় রীতিমতো 'রুকইয়াহ সেন্টার' খুলে বসেছে।
কোনো সহজ-সরল রোগী তাদের সেন্টারে গেলে তারা প্রেসক্রিপশনে (Prescription) রোগীর নাম ও বয়স লিখে নেয়, আর অত্যন্ত সুকৌশলে কথার ফাঁকে রোগীর মায়ের নামটিও জেনে নেয়। এরপর রোগীর সামনে থেকে একটু আড়ালে গিয়ে তারা ফোন দেয় তাদের মূল 'গুরু'কে—যিনি মূলত একজন বড় মাপের জাদুকর বা জিন হুজুর। ফোন দিয়ে রোগীর নাম ও মায়ের নাম জানিয়ে দেয়। অপরপ্রান্ত থেকে সেই ভণ্ড গুরু জিনের সাহায্যে কিংবা হাজিরা দেখে রোগীর একটি কথিত 'ডায়াগনোসিস (Diagnosis) রিপোর্ট' বলে দেয়। এরপর সাইনবোর্ডধারী সেই 'রাক্বী' ফিরে এসে রোগীর সামনে ২০-৩০ মিনিট নামমাত্র কুরআন পড়ার ভান করে এবং গুরুর বলে দেওয়া সেই ভুয়া রিপোর্টটি প্রেসক্রিপশনে লিখে রোগীকে ধরিয়ে দেয়।
অর্থাৎ রুকইয়াহর পবিত্র লেবাসের আড়ালে এরা মূলত সেই পুরোনো শিরকি হাজিরা এবং জিনের গণনার ব্যবসাই চালিয়ে যাচ্ছে। ভেতরের বাস্তবতা একটুও বদলায়নি; বদলেছে শুধু সাইনবোর্ড আর পরিভাষা। এটি প্রতারণা ও বাটপারির এক চরম ও নগ্ন রূপ—যা সাধারণ মুসলমানের ঈমান ও সম্পদ উভয়কেই বিনষ্ট করছে।
তৃতীয় ফিতনা: হাতুড়ে রাক্বীদের আবির্ভাব
ভণ্ডদের পাশাপাশি রুকইয়াহ সেক্টরে আরেক দল 'হাতুড়ে রাক্বী'র আবির্ভাব ঘটেছে—এদের রুকইয়াহ ও তিব্বে নববী (নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো চিকিৎসাপদ্ধতি) বিষয়ক জ্ঞানের অবস্থা মাকড়সার জাল থেকেও দুর্বল। এদের অবস্থা এতটাই করুণ যে, এরা না কোনো অভিজ্ঞ ও হাক্কানি আলেম ও রাক্বীর সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় ইলম অর্জন করেছে, না তিব্বে নববী বা রুকইয়াহর মৌলিক উসুল সম্পর্কে এদের কোনো গভীর জ্ঞান আছে। এদের অনেকেই হয়তো বাংলায় অনুবাদ করা দুই-চারটা চটি বই পড়েছে, ইউটিউবে কয়েকটা লেকচার শুনেছে, কিংবা নিজের কোনো আত্মীয়কে রুকইয়াহ সেন্টারে নিয়ে গিয়ে দূর থেকে দেখেছে কীভাবে রুকইয়াহ করা হয়। আর এই সামান্য দেখার ওপর ভর করেই এরা নিজেদের বিশাল বড় 'রাক্বী' হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বসেছে!
রুকইয়াহ করা অবশ্যই একটি মহৎ ও সুন্নাহসম্মত কাজ। কিন্তু একজন রাক্বী হওয়ার জন্য শরিয়তে কিছু সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্য থাকা ফরজ। একজন রোগীকে সামনে বসিয়ে তার সমস্যার কথা শুনে, তার শারীরিক, মানসিক ও প্যারানরমাল লক্ষণগুলো বিশ্লেষণ (Diagnosis) করে সমস্যার মূল কারণ (Root cause) বের করা এবং সে অনুযায়ী সঠিক প্রেসক্রিপশন দেওয়া কোনো ছেলেখেলা নয়। এর জন্য প্রয়োজন গভীর ইলম, তাকওয়া, অভিজ্ঞতা এবং কোনো বিজ্ঞ উস্তাদের দীর্ঘ সান্নিধ্য। অথচ এই হাতুড়ে রাক্বীদের না আছে রোগ-নির্ণয়ের কোনো শাস্ত্রীয় ও শরয়ী জ্ঞান, না আছে আদব-আখলাক। এরা রোগীর সামনে জোরে জোরে কুরআন পড়ে আর ভাবে এটাই বুঝি রুকইয়াহ। এদের ভুল রোগ-নির্ণয়ের কারণে অসংখ্য সাধারণ রোগী আর্থিক, মানসিক ও শারীরিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এদের সবচেয়ে বড় ঘাটতিটা হলো—এরা রোগ-নির্ণয়ের উসুলই জানে না। আর এর চেয়েও যে বিষয়টি আরো ভয়াবহ, সেটি হলো এদের প্রেসক্রিপশনের চেহারা। এরা প্রেসক্রিপশনে কেবলমাত্র কিছু কমন আমল লিখে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। যেমন—কুরআনের অমুক অমুক সূরা পাঠ করবেন, দৈনিক এতবার ইস্তিগফার করবেন, এতবার দরূদ শরিফ পড়বেন, অমুক ইউটিউব অডিও শুনবেন—ব্যাস, এতটুকুতেই এদের চিকিৎসা সীমাবদ্ধ। এই আমলগুলো যে খারাপ তা নয়, বরং এগুলো অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময়। কিন্তু সমস্যা হলো এগুলো প্রতিটি মুসলমানের জন্য নিত্যদিনের সাধারণ আমল—কোনো নির্দিষ্ট রোগের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নয়।
ডায়াগনোসিস করার পর পেশেন্টের মূল সমস্যাকে শিকড়সমেত উপড়ে ফেলার জন্য যে গভীর কাউন্সিলিং (Counseling) প্রয়োজন, সেটি এই হাতুড়েরা করতে অক্ষম। কোন ধরনের সমস্যার জন্য কোন ধরনের সাপ্লিমেন্ট (Supplement) ব্যবহার করতে হবে—সে ব্যাপারে এদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। কোন রোগের জন্য কোন ধরনের খলতা (Khalta—চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিশেষ মিশ্র ভেষজ প্রস্তুতি) প্রয়োগ করতে হয়, সেটিও এরা জানে না। পেশেন্টের লাইফস্টাইল (Lifestyle) সুন্নাহসম্মতভাবে ঢেলে সাজানোর জন্য খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, যিকর, পরিবেশ, পারিবারিক সম্পর্ক—এসব নিয়ে কী ধরনের পরামর্শ দিতে হবে, সেটাও এরা ধরতে পারে না।
মোটকথা, এরা শুধু কয়েকটি কমন আমলের কথা বলেই মনে করে দায়িত্ব শেষ। অথচ রোগের সাথে চিকিৎসার সামঞ্জস্য না থাকলে রোগ কোনোদিনই নির্মূল হয় না। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি দান করে গিয়েছেন—
> «لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ»
> "প্রত্যেক রোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট ঔষধ রয়েছে। যখন রোগের ওপর তার সঠিক ঔষধটি প্রয়োগ করা হবে, তখনই বিইজনিল্লাহি আজ্জা ওয়াজাল্লা রোগী সুস্থ হয়ে যাবে।" (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, রোগ-নির্ণয়ের পর ঠিক সেই রোগের উপযোগী নির্দিষ্ট চিকিৎসাই রোগ নির্মূল করে—কেবল সাধারণ আমল দিয়ে নয়। যে রাক্বী এই উসুল জানে না, সে যত আমল লিখে দিক না কেন, পেশেন্টের সময়, অর্থ ও আশা—তিনটিই নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না।
চতুর্থ ফিতনা: হ্যালুসিনেশনকে ওহী জ্ঞান করা
সবচেয়ে ভয়ংকর এবং একইসাথে হাস্যকর বিষয়টি ঘটে সেইসব কথিত 'বিশিষ্ট রাক্বী ও মুদাব্বির'-দের ক্ষেত্রে, যারা নিজেদের অনেক বড় আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করে। রুকইয়াহ চলাকালীন যখন জিনের আছর বা জাদুর কারণে রোগীর চোখের সামনে নানা অলীক দৃশ্যকল্প বা হ্যালুসিনেশন (Hallucination) ভেসে ওঠে, কিংবা রোগীর শরীরে আছরকারী জিন রোগীর জিহ্বা ব্যবহার করে নানা কথা বলতে শুরু করে, তখন এই অজ্ঞ ও অহংকারী হাতুড়েরা সেই হ্যালুসিনেশন বা জিনের মিথ্যাবচনকে ওহীর মতো অকাট্য সত্য বলে বিশ্বাস করে বসে! তারা ভাবে—তারা যেন তাদের 'আধ্যাত্মিক ক্ষমতা' দিয়ে গায়েবের পর্দা উন্মোচন করে ফেলেছে।
অথচ যাদের রুকইয়াহর প্রকৃত ইলম আছে, তারা ভালোভাবেই জানেন—পেশেন্টের শরীরে থাকা জিন-শয়তানরা চরম মিথ্যাবাদী এবং ধোঁকাবাজ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা শয়তানের চারিত্রিক স্বরূপ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় ও প্রতারণা করে (সুরা ইবরাহিম: ২২)। রোগীর মস্তিষ্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে রাক্বীকে বোকা বানানো শয়তানের একটি সাধারণ কৌশল মাত্র। কিন্তু নিজেদের ইলমের স্বল্পতা ও অজ্ঞতার কারণে এই হাতুড়েরা সেই শয়তানি ধোঁকাকেই 'অলৌকিক ক্ষমতা' ভেবে বসে এবং সাধারণ মানুষকেও বিভ্রান্ত করে। ফল হিসেবে দেখা যায়—একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অহেতুক মারাত্মক জাদুগ্রস্ত বা জিনগ্রস্ত বলে দাগিয়ে দিয়ে তাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, পরিবারে অশান্তি লেগে যায়, এবং পেশেন্ট আজীবন ভুল চিকিৎসার চক্করে ঘুরতে থাকেন।
পঞ্চম ফিতনা: রুকইয়াহর আড়ালে চারিত্রিক স্খলন
এর চেয়েও জঘন্য একটি বিষয় হলো—এই ভণ্ড জাদুকর, কবিরাজ ও জিন হুজুররা অতীতে চিকিৎসার নামে মুসলিম মা-বোনদের সঙ্গে যে ধরনের অশালীন ও কুৎসিত আচরণ করত, এখন সেই একই কাজ তারা 'রাক্বী'র পবিত্র লেবাস পরে চালিয়ে যাচ্ছে। তারা রুকইয়াহর নাম ভাঙিয়ে নারীদের সঙ্গে একান্তে সময় কাটায় এবং মা-বোনদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের শারীরিক সম্পর্কের জন্য চাপ তৈরি করে।
ফিতনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে—সম্প্রতি আমাদের নিকট একটি খবর পৌঁছেছে—একজন ভণ্ড জিন হুজুরের সাগরেদ, যে এখন নামের আগে 'রাক্বী' লাগিয়ে ঘুরছে, সে চিকিৎসার নামে এক ব্যক্তির বিবাহিত স্ত্রীকে বশ করার জাদুর মাধ্যমে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে! নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক। এদের এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মনে রুকইয়াহর মতো একটি পবিত্র ও নববী চিকিৎসার প্রতি অনাস্থা ও ঘৃণা তৈরি হচ্ছে। এটি মূলত ইবলিশেরই একটি সূক্ষ্ম চাল—যাতে মানুষ সুন্নাহ চিকিৎসা থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার সেই শিরক ও জাদুর দিকেই ফিরে যায়।
মনে রাখতে হবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গেছেন—কোনো গায়রে-মাহরাম পুরুষ ও নারী কখনো একাকী অবস্থান করতে পারবে না, কারণ তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান (তিরমিজি)। যে কথিত রাক্বী এই মৌলিক বিধানই লঙ্ঘন করে নারী রোগীর সঙ্গে একাকী চিকিৎসা করে, সে যত বড় উপাধিধারীই হোক, সে প্রকৃত রাক্বী নয়—সে একজন বিধান-লঙ্ঘনকারী শয়তান।
ভণ্ডকে চিনবেন যেভাবে
এতদূর পড়ে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে—তাহলে আমি কীভাবে বুঝব আমার সামনের লোকটি ভণ্ড নাকি প্রকৃত রাক্বী? এর উত্তর দীর্ঘ তালিকায় না গিয়ে কয়েকটি স্পষ্ট লক্ষণ মনে রাখলেই চলবে।
যদি কেউ আপনার মায়ের নাম জিজ্ঞেস করে, বুঝবেন—সে ভণ্ড। যদি কেউ তাবিজ-কবচ, নকশাযুক্ত আংটি বা 'বিশেষ মন্ত্রপূত' কিছু ধরিয়ে দিতে চায়, বুঝবেন—সে ভণ্ড। যদি কেউ দাবি করে সে জিনের সঙ্গে কথা বলে আপনার সমস্যার মূল কারণ জেনে ফেলেছে, বুঝবেন—সে ভণ্ড। যদি কেউ আড়ালে গিয়ে কোনো 'গুরু' বা 'হুজুর'কে ফোন করে আপনার তথ্য পাচার করে এবং সেই অনুযায়ী রিপোর্ট দেয়, বুঝবেন—সে ভণ্ড। আর যদি কেউ নারী রোগীর সঙ্গে মাহরাম ছাড়া একাকী রুকইয়াহ করতে চায়—সে যত বড় লেবাসধারীই হোক—বুঝবেন তার থেকে নিজের ঈমান ও ইজ্জত শতহাত দূরে রাখাই উত্তম।
এই কয়েকটি লক্ষণই যথেষ্ট। এর বাইরে গিয়ে প্রতিটি রাক্বীকে ব্যক্তিগতভাবে যাচাই করতে গেলে সাধারণ মানুষের পক্ষে দ্বীনের পথে চলাই কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমাদের পরামর্শ অনেক সরল—যেখানে আস্থা প্রতিষ্ঠিত, সেখানেই যান।
অসুস্থ হলে প্রথম যা করবেন: ঘরোয়া সেল্ফ-রুকইয়াহ
কোনো সমস্যা শুরু হলে দৌড়ে অন্য কারো কাছে যাওয়ার আগে আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে নিজেই ঘরে বসে কুরআনের দিকে ফিরুন। এটি প্রতিটি মুসলমানের সবচেয়ে বড় শক্তি, যা অনেকেই অবহেলায় ভুলে গেছেন।
সুস্থতার নিয়তে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করুন। বিশেষভাবে পাঠ করুন সুরা ফাতিহা, যাকে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "শিফা" বলে আখ্যা দিয়েছেন। আয়াতুল কুরসি পড়ুন, যা শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়। সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬) পড়ুন—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন রাতে এ দুটি আয়াত যথেষ্ট। সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস—এই তিন কুল পড়ুন; নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই অসুস্থতায় এগুলো পড়ে শরীরে ফুঁ দিতেন (সহিহ বুখারি)।
এর পাশাপাশি সুরা ইয়াসিন, সুরা মুলক, সুরা সাফফাত ও সুরা দুখানের শুরুর আয়াতসমূহ আপনি পড়তে পারেন। সঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো মাসনুন দোয়া—"আল্লাহুম্মা রাব্বান্ নাস, আযহিবিল-বা'স, ইশফি আনতাশ্ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা" (সহিহ বুখারি)—নিয়মিত পাঠ করুন।
এই আয়াত ও দোয়াগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। সেই পানি সুস্থতার নিয়তে পান করুন এবং সেই পানি দিয়ে গোসল করুন। অলিভ অয়েলে (Olive Oil—জলপাই তেলে) ফুঁ দিন এবং সেই তেল মাথায়, কপালে, বুকে ও শরীরের ব্যথাযুক্ত স্থানে ব্যবহার করুন। এই পানি দিয়ে ঘরের ফ্লোর মুছুন। স্প্রে বোতলে ভরে এয়ার ফ্রেশনারের (Air Freshener) মতো ঘরের প্রতিটি কোণায় সকাল-সন্ধ্যা এবং রাতে ঘুমানোর আগে স্প্রে করুন। ইনশাআল্লাহ এই আমলগুলো নিয়মিত করে গেলে দেখবেন সাধারণ অধিকাংশ শারীরিক, মানসিক ও প্যারানরমাল সমস্যা ঘরে বসেই দূর হয়ে যাচ্ছে—কোনো সেন্টারে যাওয়ারই দরকার পড়ছে না।
নিশ্চিন্ত ঠিকানা: মাসনুন লাইফ
ঘরোয়া আমলের পরও যদি দেখেন সমস্যা গভীর এবং পেশাদার সাহায্য প্রয়োজন, তখন একদম নির্দ্বিধায়, কোনো সংশয় ছাড়াই 'মাসনুন লাইফ'-এর দরজায় আসুন। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি—মাসনুন লাইফে এসে আপনাকে এই লেখায় উল্লিখিত কোনো ফিতনা, কোনো শিরক, কোনো বিদআত কিংবা কোনো প্রতারণার আশঙ্কাতেই পড়তে হবে না। এই নিশ্চয়তা আমরা শুধু মুখে বলে দিচ্ছি না; আমাদের প্রতিটি পদ্ধতি, প্রতিটি প্রেসক্রিপশন, প্রতিটি রাক্বীর প্রশিক্ষণ—সবকিছুই কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর মাপকাঠিতে যাচাই করে গড়ে তোলা।
নারী রোগীদের জন্য আমাদের রয়েছে পৃথক ও পরিপূর্ণ পর্দা-নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা—কোনো অবস্থাতেই গায়রে-মাহরামের সঙ্গে কোনো বোনকে একাকী রাখা হয় না।
আমাদের প্রতিটি প্রেসক্রিপশন তৈরি হয় হাদিসের সেই অমূল্য মূলনীতির আলোকে—"প্রতিটি রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে।" তাই আমাদের প্রেসক্রিপশনে শুধু কয়েকটি সাধারণ আমল লিখে দায়িত্ব শেষ করা হয় না। আমরা পেশেন্টের সমস্যা ভালোভাবে ডায়াগনোসিস করে সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট কুরআনি রুকইয়াহর প্রোটোকল (Protocol) সাজিয়ে দিই। প্রয়োজনে গভীর কাউন্সিলিং করি যাতে সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা যায়। নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট ও সুন্নাহভিত্তিক খলতা পরামর্শ দিই। পেশেন্টের লাইফস্টাইলকে সুন্নাহসম্মতভাবে ঢেলে সাজানোর জন্য খাদ্য, ঘুম, যিকর, আজকার ও পারিবারিক পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত পথনির্দেশ দিই। আর সবচেয়ে বড় কথা—চিকিৎসার পাশাপাশি আমরা পেশেন্টের ঈমান ও আমল সংশোধনের তরবিয়তও দিই, যাতে রোগ নিরাময়ের পরও সে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে পারে।
আমাদের ফি কাঠামো সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ন্যায্য। এর পাশাপাশি যাদের আর্থিক সংকট রয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে আমাদের ফ্রি গ্রুপ রুকইয়াহ সেশনের ব্যবস্থা। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা প্রতিদিন ১০ জন পুরুষ ও ১০ জন নারীকে আলাদা সেশনে, পৃথক পৃথকভাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি।
সংক্ষেপে বললে—মাসনুন লাইফে আসা মানে আপনি ফিতনার যেকোনো আশঙ্কা থেকে নিরাপদ থেকেই সুন্নাহভিত্তিক সম্পূর্ণ চিকিৎসা পাচ্ছেন। এর জন্য আপনাকে নিজে যাচাই-বাছাই করতে বসতে হবে না, কাউকে দিয়ে খোঁজখবর করানোর প্রয়োজন নেই। আমরা সেই দায়িত্ব আগে থেকেই কাঁধে তুলে নিয়েছি, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের সিদ্ধান্ত ও আহ্বান
আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করছি—রুকইয়াহ সেক্টরকে কলুষিত করা এই ভণ্ড বিশিষ্ট রাক্বী ও মুদাব্বির, জাদুকর, জিন হুজুর ও কবিরাজ-প্রতারকদের ফিতনা নির্মূল করার জন্য ইনশাআল্লাহ আমরা শিগগিরই কয়েকটি কঠোর ও সুসংগঠিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছি। এর মধ্যে থাকবে দেশের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এই ফিতনার বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি ও সচেতনতামূলক প্রচারণা, ভিকটিম রোগীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দলিল-প্রমাণসহ নথিভুক্তির ব্যবস্থা, এবং প্রয়োজনে আইনি কাঠামোর ভেতর থেকে এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ। বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
পরিশেষে সকল ভাই-বোনের প্রতি আকুল আহ্বান—এই পবিত্র সুন্নাহকে ভণ্ডদের হাত থেকে রক্ষা করা একা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার কাজ নয়। আপনারা সচেতন হোন, পরিবার-পরিজনকে সচেতন করুন, এই লেখাটি প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে দিন। নিজের আশপাশে কোনো ভণ্ড রাক্বীর অপতৎপরতা দেখলে চুপ করে থাকবেন না। মনে রাখবেন, যে চুপ থাকে—সে নীরব সমর্থক হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই নব্য ফিতনা থেকে হেফাজত করুন এবং এই পবিত্র সুন্নাহকে ভণ্ডদের হাত থেকে রক্ষা করার তৌফিক দান করুন। আমিন।